নয়নতারা বলল, যা বলছি শোনো। বাড়ি যাও। এখানে আর থেকে না। বামা তার ব্যাপকে গালগাল দিয়েছে, রেমোর কানো গেলে আস্ত রাখবে না। যাও।
শ্যামলী উঠল। বলল, যাচ্ছি। কিন্তু আমাদের পাওনাগণ্ডা মিটিয়ে না দিলে কিন্তু বিপদে পড়বেন। বলে দিচ্ছি।
বামাচরণের হাত ধরে টেনে বেরিয়ে গেল।
বিষ্ণুপদ তার জলচৌকি ছেড়ে উঠতে যাচ্ছিল। পারল না। হঠাৎ হাঁটু ভেঙে গোটা শরীরের ভার নিয়ে পুরনো বাড়ির মতো ভেঙে পড়ল উঠোনে।
০৮৯. তার ভিজিটিং কার্ড নেই
তার ভিজিটিং কার্ড নেই, দেওয়ার মতো পরিচয় নেই, জানানোর মতো ডিগ্রি নেই, ভরসা কৃষ্ণজীবনের চিঠিটা। রিসেপশনিস্ট মেয়েটির হাতে একটু নার্ভাস হাতে সেইটেই সমৰ্পণ করল চয়ন। বলল, দয়া করে যদি এটা মিস্টার সেনের কাছে পাঠিয়ে দেন।
মেয়েটা বেয়ারা ডেকে চিঠিটা পাঠিয়ে দিয়ে তাকে একবার দেখল। চয়ন আজ যথাসাধ্য সাজগোজ করে এসেছে। পরিষ্কার ইস্তিরি করা প্যান্ট, হাওয়াই শার্ট, আজ সে দাড়ি কামিয়েছে। এর চেয়ে বেশি আর কি সে করতে পারে? ব্যক্তিত্ব বলে একটা জিনিস আছে, যেটা সাজগোজকে টেক্কা মেরে যায়, আর স্মার্টনেস বলেও আর একটা জিনিস আছে যা এ যুগের পৃথিবীতে খুব বিকোয়। কিন্তু চয়নের ও দুটো নেই। মেধা? মেধা আছে কিনা তা সে ঠিক বোঝে না। সে ইংরেজি আর অঙ্কটা ভালই জানে, অন্তত ছাত্রছাত্রীদের পড়াতে যে-টুকুর দরকার হয়। সেই মেধা এই আধুনিক বাণিজ্য সংস্থার কাজে লাগবে কিনা সেটাই প্রশ্ন। নিজেকে এত ঐশ্বৰ্যহীন, এত বিত্তহীন, গুণহীন মনে হয় তার যে জড়সড় হয়ে গদি-আঁটা নরম চেয়ারে বসে সে তীক্ষ্ণ একটা হতাশায়ঃ বিদ্ধ হতে লাগল বারবার। হবে না। সে জানে।
চয়ন শুনেছে, সেন বিদেশ থেকে এক কাঁড়ি টাকা আর নো-হাউ নিয়ে ফিরে প্রথম কিছুদিন চাকরি করে বাজারটা বুঝে নিয়েছিলেন। এখন বোম্বাইয়ের কাছে একটা আধুনিক কারখানা খুলেছেন। কিসের কারখানা তা ভাল জানে না চয়ন; তবে সেনের অবস্থা যে খুব ভাল, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। মাসে মাত্র দিন দশেকের জন্য কলকাতায় আসেন, বাকি দিন ভাগ করা আছে দিল্লি ও বোম্বাইয়ের জন্য। এগুলো মূলত সেলস অফিস। সেন প্রায়ই বিদেশে যান। একটা মানুষ অনেক মানুষকে ছাড়িয়ে কি করে যে এত উঁচুতে উঠে যায় সেটাই ভেবে পায় না চয়ন। এসব অচেনা, রূপকথার জগতের মানুষের কাছে যেতে তার ভয় ভয় করে। আর একটা অনুভূতি হয়, নিজের জন্য লজ্জা।
আধা ঘণ্টা বসে থাকতে হল চয়নকে। তারপর একজন ছিমছাম বেয়ারা এসে তাকে নিয়ে গেল ভিতরে; শেকসপিয়র সরণির এই ফ্ল্যাটের ভাড়া কত তার কোনও আন্দাজ নেই চয়নের। শুনলে সে হয়তো অজ্ঞান হয়ে যাবে।
অফিসটা যে খুব বড় তা নয়। এক বা দেড় হাজার স্কোয়ার ফুটের একটা ফ্ল্যাট। হলঘরটা পার্টিশন দিয়ে সামনে রিসেপশন। পিছনে ছোট অফিস। সব মিলিয়ে জনা সাত-আট লোক কাজ করছে। দুটো কম্পিউটার আছে। হলঘর, পেরিয়ে বাঁ দিকে একটা ঘরের দরজা ঠেলে তাকে ঢুকিয়ে দিল বেয়ারা।
ভিতরটা বেশ সাজানো। সবুজ কার্পেট, দেয়ালে হালকা সবুজ রং। বেশ বড় একটা আধুনিক টেবিলের ওপাশে সেন সাহেব বসে। বয়স মধ্য ত্রিশ। চল্লিশের কাছাকাছিও হতে পারে। ফরসা, ভাল চেহারা। মাথায় বড় বড় চুল। মুখখানা লম্বাটে, নাকটা প্রবল, ঠোঁট দুটোয় একটা নিষ্ঠুর ভাব আছে। চোখ দুটো তীক্ষ্ণ এবং স্বপ্নহীন।
ভদ্রলোক খুবই ভদ্র গলায় বললেন, মিস্টার বিশ্বাস আপনাকে পাঠিয়েছেন? কিন্তু…
এই কিন্তুটাকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পায় চয়ন। কতবার কিন্তু এসে তার পথ আটকে দিয়েছে। সে কিছু বলল না, শুধু ভয়ার্ত চোখে সেন সাহেব নামক অতি-সফল লোকটির দিকে চেয়ে রইল।
সেন চিঠিটা আর একবার দেখে বলল, বসুন।
নরম গদির চমৎকার চেয়ারে সে প্রায় ড়ুবে গোল বটে, কিন্তু শরীরের আরামটা তাকে প্রভাবিত করল না। সে খরগোশের মতো সচকিত ভঙ্গিতে বসে একটা-দুটো-তিনটে শুকনো টোক গিলতে লাগল।
সেন সাহেব সামান্য একটা হাসির রেখা মুখে ফুটিয়ে তুলে বললেন, বিশ্বাস স্যার আমার খুবই শ্রদ্ধেয় মাস্টারমশাই। নাউ হি ইজ এ বিগ অ্যান্ড রিনাউনড় ম্যান। তিনি যখন পাঠিয়েছেন তখন আপনার জন্য আমার একটু চেষ্টা করা উচিত। আচ্ছা, আপনি কি একটু স্পেসিফিক্যালি বলতে পারেন, ঠিক কী ধরনের জব আপনি করতে পারবেন?
চয়ন আকাশপাতাল ভেবেও এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে পেল না। সে বিচ্ছিন্নভাবে অনেক কিছুই জানে। ডারউইন তত্ত্ব থেকে মার্কসবাদ, সে জানে ইংরেজি গ্রামার বা সাহিত্যের ইতিহাস, যে জানে অঙ্ক, ফিজিক্স-কেমিস্ট্রি, কিন্তু বিশেষজ্ঞের মুন ভূ কোনও বিষয়েই নেই। নিজেকে উপস্থাপন করা বড় কঠিন মনে হচ্ছিল তার। সে খুব ক্ষীণ গলায় বলল, আমি তো জানি না।
সেন সাহেব কি একটু অবাক হলেন? কপালে বিস্ময়ের ভাঁজ-গম্ভীর মুখে বললে, যদি অফিস ওযার্ক হয়, যাকে ক্লারিক্যাল জব বলে, তাহলে কিন্তু কলকাতায় কোনও ভ্যাকান্সি নেই। যদি ওরকম সাদামাটা চাকরি করতে চান তাহলে আপনাকে বোম্বাই যেতে হবে। পারবেন? আমরা যা মাইনে দিই তাতে বোম্বাইতে বাসা ভাড়া করে থাকা বা সংসার চালানো খুব শক্ত ব্যাপার।
চয়ন দাঁতে ঠোঁট কামড়াল। তার কাছে কলকাতাও যা, বোম্বাইও তা। কিন্তু বোম্বাই গিয়ে তার কিছু লাভ হবে বলে মনে হল না। সে একটু ভদ্রলোকের দিকে চিন্তিতভাবে চেয়ে থেকে বলল, ও। তাহলে—
