রামজীবন উচ্ছিষ্ট বাটিটা কপালে ঠেকিয়ে নিল। বলল, ব্যাপারটা জম্পেশই হচ্ছে বাবা। টাকা থাকলে কত তাড়াতাড়ি কত বড় কাণ্ড করা যায়!
তা বটে। বলে চুপ করে রইল বিষ্ণুপদ।
কী ভাবছেন বাবা?
বিষ্ণুপদ একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তোর বাড়িটা কি ওরকমই থাকবে? কিছু করবি না?
রামজীবন উদাস মুখে বলল, আমি তো পারলাম না বাবা। ঠেকে গেল। দাদা আমাকে নতুন বাড়ির একতলাটা ছেড়ে দিচ্ছে। তাই ভাবছি ও বাড়ি দিয়ে আর হবেটাই বা কি? থাক পড়ে।
পড়ে থাকলে কি ভাল দেখাবে?
কী করব বাবা?
এ বাড়ি হওয়ার পর ইট সিমেন্ট কিছু বাঁচবে না?
ঠিকাদার কন্ট্রাক্টে কাজ করছে। জিনিস সব তার। আমরা তো কিনো দিইনি। জিনিস বাঁচলে সে নিয়ে যাবে।
আমি ভাবছিলাম, বাড়তি জিনিস দিয়ে ও বাড়িটা শেষ করা যায়। কিনা। এই মজুররাই করে দিত।
আপনি কি মেজদার কথা ভাবছেন বাবা? মেজদাকে এনে ও বাড়িতে বসত করাবেন? সে হবে না। মেজদা আসবে না। তার টাকার দরকার। বাড়ি নয়।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, বামার জন্য নয়। ভাবছিলাম, নতুন একটা বাড়ির মুখোমুখি ও বাড়িটা ভাল দেখাচ্ছে না। ওর মধ্যে যে আমি তোকে দেখতে পাই। কত কষ্ট করে বুকের রক্ত তুলে করতে চেয়েছিলি। পারলি না, সে তো তোর দোষ নয়। কিন্তু ওটার দিকে চাইলে আমার কষ্ট হয়।
তা হলে ভেঙে দিই বাবা।
তা কেন? ভাঙবি কেন? গড়ছিলি যখন, শেষ কর।
আরও কিছু টাকা লাগবে।
তা লাগুক। চেষ্টা রাখতে হয়।
কিছুক্ষণ মুড়ি চিবিয়ে রামজীবন বলল, আপনার আশীৰ্বাদ থাকলে হয়ে যাবে।
ওই যে বললাম, ওটাই আশীৰ্বাদ। লেগে থাক।
যদি করে উঠতে পারি তা হলে ও বাড়িতে কী হবে বাবা?
হয়ে হোক। আমার একটা সাত্ত্বিনা রইল যে, রামজীবনও পেরেছিল।
রামজীবন হাসল, তাই হবে বাবা। করব।
বিষ্ণুপদ একটু হাসল।
বামাচরণ আর শ্যামলী এল বেলার দিকে। যখন বিষ্ণুপদ স্নানে যাবে যাবে করছে। দুজনেরই উস্কোখুস্কো চেহারা। বামাচরণের চেহারা আরও একটু উদভ্ৰান্ত।
বামাচরণ বলল, আপনার কাছে আসা বাবা।
বস তোরা। দাওয়ায় মাদুর আছে। পেতে বাস।
শ্যামলী মাদুরটা নিয়ে এসে পাতল। দুজনে বসল।
কৃষ্ণুর গলা থাকার দিয়ে বলল, একটা কথা শুনে ছুটে এলাম।
কী কথা?
আমাদের তো ধনেপ্ৰাণে মারলেন। শুনছি। নাকি দাদা আমার ভাগের টাকাটা দিতে চেয়েছিল। আপনি আর মা বাগড়া দিয়েছেন।
বিষ্ণুপদ একটু অস্বস্তি বোধ করল। হাসবার একটা বৃথা চেষ্টা করে বলল, টাকাটা সে দিতে চাইলেও তোর নেওয়ার হকটা কোথায় তা একটু বুঝিয়ে বলবি?
তার মানে?
কৃষ্ণ তোকে কী বাবদে টাকাটা দিতে চাইছে?
বাঃ, আমার সম্পত্তির ভাগ!
সম্পত্তি কি ভাগ হয়েছে? আইন মোতাবেক কি স্থির হয়েছে কার কতটা ভাগ?
তা না-ই বা হল!
তা যদি না-ই হয়ে থাকে তা হলে তোর পাওনাগণ্ডার কথা উঠছে কি করে?
বামাচরণ হঠাৎ লাফিয়ে উঠে বলল, শুয়োরের বাচ্চা বুড়ো, তুমি শালা বসে বসে শকুনির মতো মতলব আঁটছো? জুতিয়ে তোমার মুখ ছিঁড়ে দিতে হয়!
বিষ্ণুপদ স্তম্ভিত হল বটে, কিন্তু হার্টফেল হল না। এরকম হতে পারে বলে তার একটা আন্দাজ ছিল। সে শুধু বামার দিকে চেয়ে রইল।
নয়নতারা আর রাঙা বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে। পটল আর গোপাল দৌড়ে নেমে এল ওপর থেকে। মিন্ত্রিরা কাজ বন্ধ করে মজা দেখছে।
পদ তাড়াতাড়ি দেখে নিল, রামজীবন ধারে কাছে আছে কিনা! এ বাড়িতে বামার রক্তপাত হোক তা আর সে চায় না। রামজীবন নেই। বাঁচোয়া।
শ্যামলী তাড়াতাড়ি বামাচরণকে টেনে বসিয়ে একটা ধাক্কা মেরে বলল, তোমার আক্কেল নেই! কাকে কী বলছো? ছিঃ ছিঃ! কথা বলতে যখন জানো না, চুপ করে থাকলেই হয়। বাবা, আপনি ওর কথায় কিছু মনে করবেন না, ওর মাথার ঠিক নেই।
বিষ্ণুপদর একটু হাঁফধরা গোছের ভাব হচ্ছিল। মুখে কথা এল না। শুধু মাথা নেড়ে বোঝানোর চেষ্টা করল, সে বুঝতে পেরেছে।
শ্যামলী বলল, বাড়ির চিন্তাতেই ওর মাথা এত গরম। দেখুন, যদি সত্যিকারের বিচার করে দেখেন তা হলে এ বাড়িতে আমরাই কেবল বঞ্চিত হচ্ছি। আমাদের ওপর খুব অবিচার করছেন। আপনারা। দাদা এত টাকা খরচ করতে পারছেন আর আমাদের সামান্য কিছু টাকা ওঁকে দিতে দিচ্ছেন না। আপনারা, এটা কেমন কথা?
নয়নতারা এগিয়ে এসে বলল, তাই ঝগড়া করে টাকা আদায় করতে এসেছো?
বামাচরণ তার মায়ের দিকে চেয়ে বলল, ওই আর এক বদমাশ মাগী!
শ্যামলী তাকে ফের একটা ধমক দিল, ফের মুখ খারাপ করছো?
নয়নতারা শ্যামলীর দিকে চেয়ে বলল, ওর আর বলতে কিছু বাকি নেই। সব বলা হয়ে গেছে। আমাদের আর নতুন করে অপমান হবে না। নতুন শুধু বাপকে গালাগাল দেওয়া। তা সেটাও তো হয়ে গেল। আমি বলি এবার ওকে নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে যাও। রেমো এলে অক্ষত ফিরতে পারবে না। যাও।
বামাচরণ লাফিয়ে উঠে বলল, কেন যাবো? কাকে ভয় খাই? রেমো শালা আমার এইটা করবে।
বলে এমন একটা কুৎসিত ভঙ্গি করল যে, নয়নতারা আর রাঙা চোখ ফিরিয়ে নিল।
ও শালার গুষ্টির তুষ্টি করে ছাড়ব। নির্বংশ করে দেবো।
শ্যামলী হঠাৎ উঠে বামাচরণের চুলের মুঠি ধরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বসিয়ে দিল। বলল, ফের ওরকম করলে কিন্তু মুশকিল আছে।
নয়নতারা বলল, বসছে কেন? বসে কিছু লাভ হবে না। তাড়াতাড়ি চলে যাও। পটল দৌড়ে গেল বোধ হয় বোপকে খবর দিতে। কাজটা ভাল করোনি এসে। ও তো পাগল, কিন্তু তোমার তো আর মাথার গোলমাল হয়নি। ওকে নিয়ে এসেছোই বা কেন?
শ্যামলী হঠাৎ শাশুড়ির দিকে চেয়ে বলল, বাড়ি কি একা আপনার? আমাদের নয়? বে-আইনিভাবে বাড়ি তুলছেন, আবার বড় বড় কথা!
