কৃষ্ণজীবন দুঃখিত মুখে বসে রইল। তারপর বলল, বামা গিয়ে আজকাল আমার ফ্ল্যাটে চড়াও হচ্ছে। যখন আমি থাকি না, তখন গিয়ে তার বউদির সঙ্গে বসে নানা খবর দেয়। কেন এসব করে বলো তো! ওর কাজকর্ম নেই? এই যে ইনজাংশন বের করল। এতে ওর লাভটা কী? নিজের পায়ে কেউ কুড়ুল মারে?
বিষ্ণুপদ প্ৰসন্ন গলায় বলে, মানুষ হিংসের জ্বালায় কত কী করতে পারে! বামাচরণ এসব করছে জ্বালায়। বড় লোভী ছেলে। অথচ ছেলেপুলে নেই, ওরটা খাবেই বা কে? নিজের নাক কেটে পরের যাত্ৰাভঙ্গ! গায়ের লোক ডেকে এনে জমায়েত করল, হেকে ডেকে গালাগাল করল আমাদের, তাতে যে ওরাও গৌরববৃদ্ধি হল না, সেটা বুঝবার মতো বুদ্ধিটাও নেই। ওকে টাকা দিতে চাইছো বাবা? তাতে আরও নষ্ট হবে। টাকা দিয়ে কি সব হয়?
কৃষ্ণজীবন কিছুক্ষণ দুঃখিতভাবে বসে রইল। তারপর মেনে নিল।
বামা তবু আশায় আশায় আসছে। রোজ আসছে। শেয়ালের মতো উঁকিঝুঁকি মারছে। বাড়ির গড়ন পেটন দেখছে। বিড়বিড় করছে। মাঝে মাঝে হুংকারও দিচ্ছে, সব শালাকে জেলে পাঠাবো।
আদালতের সেই কাগজখানা ছাড়া বামার পক্ষে এখন আর কেউ নেই। কেউই তার পক্ষ নিচ্ছে না। পুলিশও আসছে না। আদালত থেকে পেয়াদা আনানোর মতো দমও তার নেই। শুধু আক্রেনশটুকুই যা সম্বল। বিষ্ণুপদর একটু মায়াও হয়। ওই আক্রোশের বিষে, হিংসের বিষে তিলে তিলে ক্ষয় পাচ্ছে ছেলেটা।
আজ সকালে বিষ্ণুপদ উঠোনে বসেছে। রোদটা খারাপ লাগছে না। বৃষ্টি-বাদলা ছেড়ে এখন বেশ মোলায়েম আবহাওয়া। গরমটা তেমন নেই।
নয়নতারা এক বাটি মুড়ি মেখে দিয়ে গেল।
খাও।
মুড়ি দিলে নাকি?
হ্যাঁ। সঙ্গে নারকোল কোরা।
বাঃ বেশ। তবে মুড়ি চিবোতে এখন কষ্ট। কষের দাঁত নড়ছে।
জল দিয়ে ভিজিয়ে দেবো?
না। জল ছিটিয়ে ঘটিরা মুড়ি খায়। আমাদের ও অভ্যাস নেই।
তা হলে দুধ দিই একটু? মুড়ি মুখে দিয়ে দুধে চুমুক দিলে মুড়ি নরম হয়ে যাবে।
ও বাবা, না। দুধে অভ্যাস নেই। পেট ছেড়ে দেবে।
তা হলে?
চালিয়ে দেবোখন। চিবোতে একটু সময় লাগবে, এই যা।
নয়নতারা চলে যেতে যেতে ঊর্ধ্বপানে চেয়ে বলল, ও মা গো! গোপালটা কোথায় উঠেছে দেখ। ও রাঙা বউমা, দেখ কাণ্ড! ছেলে পড়ে যাবে যে! হনুমানটা কোথায় উঠে বসে আছে দেখ!
দোতলার একটা জানালার ফাকায় গোপাল পা বুলিয়ে বসা। অবশ্য ভয়ের কিছু নেই। পায়ের নিচে একতলার রেন শেড। সারাদিন দুই ভাই এখন নতুন বাড়িতে বেয়ে বেড়ায়। এটাই তাদের নতুন খেলনা। এরকম আশ্চর্য কাও তারা কখনও দেখেনি। পটলের ইকুলের বন্ধুরা অবধি দল বেঁধে দেখতে আসে।
রাঙা বেরিয়ে এসে গোপালের দিকে হাতছানি দিয়ে ডাকল। গোপাল নাড়ল না। রাঙারও তেমন উদ্বেগ নেই। একটু চেয়ে থেকে ফের রান্নাঘরে চলে গেল।
নয়নতারা বিষ্ণুপদর দিকে চেয়ে বলল, পড়ে যাবে না তো!
বিষ্ণুপদ একটু হাসল। তোমার চোখের আড়ালেও তো কত কী করে। সবসময় কি তুমি সঙ্গে থাকো? পড়বে না। পড়লেও তলায় পা রাখার জায়গা আছে, ভারার বাঁশ আছে, আত্মরক্ষার জৈবী তাগিদ আছে। ভয় পেও না।
তোমার কথা শুনেই বেশি ভয় লাগে। এমন করে বলো!
বিষ্ণুপদ একটু হাসল।
হ্যাঁ গো, তোমাকে বরং একটু চা দিই। চায়ে ভিজিয়ে মুড়ি খাও! তা হলে আর কষ্ট হবে না।
তা দিতে পারো। মাঝে মাঝে চা খেতে খারাপ লাগে না।
মুড়ি খেতে খেতেই চা দিতে এল নয়নতারা। ঊর্ধ্বপানে চেয়ে বলল, হ্যাঁ গো, যা বড় বাড়ি হচ্ছে শেষ হলে একেবারে রাজবাড়ি বলে মনে হবে, না?
মন্দ হচ্ছে না। বিরাট ব্যাপারই হচ্ছে।
যখনই বাড়িটার দিকে চাই বুকখানা ভরে ওঠে। আমাদের বুড়োবুড়ির জন্য এত আয়োজন! গা যেন সিরসির করে।
তা বটে। আমি ভাবি খরচটাও বড্ড বেশিই করে ফেলছে। আর একটু কম করে করলেও পারত।
ওগো, এই বাড়ির দিকে চেয়ে আমি যে কৃষ্ণকেই দেখতে পাই। কৃষ্ণ কি ছোট? সে বড় বলেই তার বাড়িও আমন। সে তো কৃপণ নয়। t
বিষ্ণুপদ এক গাল হাসল, বড় ভাল বলেছে তো। দিব্যি কথা ফুটছে আজকাল। মাঝে মাঝে আমাকে তাক লাগিয়ে দাও।
হ্যাঁ গো, আমরা কি অনেকদিন বাঁচবো?
ও কথা কেন?
বেশি দিন না বাঁচলে ও বাড়ি ভোগ করব কেমন করে?
বিষ্ণুপদ চায়ে একটা পেল্লায় চুমুক দিয়ে বলল, মরার তো দিনক্ষণ নেই; কে কখন কবে কোথায় ঢলে পড়বে; আর সেই জন্যই তো মানুষের এত ভোগ-দখলের জলদিবাজি। তবে আমি বলি কি, ও বাড়িতে দুটো দিন বাস করে মরলেও আমার বুকখানা ভরে থাকবে। বাড়িটা তো কথা নয়, ওই বাড়ির পিছনে যে ছেলেটার টান আছে, সেইটেই অনেক।
ঠিকই বলেছে। উঃ, কী কাণ্ডই হচ্ছে!
আজকাল নয়নতারার মুখখনা সবসময়ে আমল করে আনন্দ, গর্ব। অনেকদিন নয়নতারাকে এত খুশি দেখেনি বিষ্ণুপদ।
মিস্ত্রিরা এল নাটা নাগাদ।
দুড়ুম দুড়ুম শব্দে কাজকর্ম শুরু হয়ে গেল। সারাদিন চলবে। কিছু খারাপ লাগে না বিষ্ণুপদর। বরং বেশ লাগে! শুধু মনটা খারাপ হয়, মুখোমুখি রামজীবনের অক্ষম বাড়িটার দিকে চাইলে।
রামজীবন রিকশা থেকে কয়েক বস্তা সিমেন্ট নামিয়ে বাড়িতে ঢোকাচ্ছে। ঠিকাদারবাবুর সঙ্গে জরুরি কথা সারল। তারপর দোতলায় উঠল কাজ দেখতে।
অনেকক্ষণ বাদে নেমে এসে বিষ্ণুপদর সামনে উঠোনে বসে একটু শুকনো হাসি হেসে বলল, আর মাসখানেকের মধ্যেই কাজ শেষ হয়ে যাবে। গৃহপ্রবেশের দিনটা পুরুতে ডাকিয়ে ঠিক করে ফেলব নাকি বাবা?
তা করতে পারো। বলে আধা-খাওয়া মুড়ির বাটিটা রামজীবনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, খা।
