রামজীবন কি হেরে গেল? একেই কি হেরে যাওয়া বলে? প্ৰাণপাত চেষ্টা করে মা-বাপের জন্য পাকা ঘর তুলতে গিয়েছিল। পেরে ওঠেনি। সেইটেই কি তার পরাজয়?
কে জানে কি! তবে রামজীবনের আধখ্যাচড়া বাড়িটার ভিতর থেকে বাতাস যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে আসে।
তবে রামজীবন শুকনো মুখে নতুন বাড়ির তদারকি করে যাচ্ছে। খুব ব্যস্ত। মাঝে মাঝে কলকাতা থেকে কৃষ্ণ আসছে দেখাশুনো করতে। আসছে বামাচরণও। তবে তার মতলব আলাদা।
আদালত থেকে কী একটা ইনজাংশন বেরও করেছিল বামা। একদিন সেই কাগজ নিয়ে এসে হাজির। গায়ের মাতব্বর মুরুব্বিদেরও জড়ো করেছিল। চেঁচিয়ে-মেচিয়ে একখানা নাটক জমিয়েছিল, দেখুন। আপনারা, বামাচরণের বুকের ওপর বাড়ি হাঁকড়াচ্ছে এরা। ওই বুড়ো ভাম নিজের মুখে কবুল করেছিল, এ ঘরখানা আমায় দেবে। দেখুন। অবিচার। আমাকে মেরে ধরে তাড়িয়ে সেই জায়গায় বাড়ি তোলা হচ্ছে। এই দেখুন আদালতের অর্ডার। বাড়ির কাজ বন্ধ করতে হবে। নইলে জেল, জরিমানা সব ব্যবস্থা করে এসেছি। আপনারা আমাকে সাহায্য করুন। \OVoVe
কিন্তু বক্তৃতায় বিশেষ কাজ হয়নি। আদালতের হাত এই প্রত্যন্ত গায়ে বিশেষ পৌঁছয় না। আদালতের কাগজে কী লেখা আছে তাও কেউ জানিবার জন্য আগ্রহী নয়।
পঞ্চায়েত ষষ্ঠীপদ বলল, মা-বাপের জন্য ছেলে বাড়ি করে দিচ্ছে, তাতে তোমার এত আপত্তি হচ্ছে কেন হে বামাচরণ? সম্পত্তি তো আর বাপ-মা সঙ্গে নিয়ে যাবে না!–
আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ওই শালা শুয়োরের বাচ্চা রামজীবন গুণ্ডা লাগিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে। পাছে মা-বাপের বাড়ির ওয়ারিশ হিসেবে আমি দাবি করে বসি। আপনারা ষড়যন্ত্র বুঝতে পারছেন না? আমাকে বঞ্চিত করা হচ্ছে যে!
খুব তুমুল বাচসা হল দু পক্ষে। কোনও ফয়সালা হল না। তার ভাগ্য ভাল যে, রামজীবন টু শব্দটিও করেনি। গালাগাল খেয়েও নয়।
করেছে, এ কী কাণ্ড গো? এ যে পুকুরচুরি…
বাড়ির সবাই তটস্থ হয়ে রইল।
শ্যামলী শাপ শাপান্ত বাপ বাপান্ত করে হেদিয়ে পড়ল।
পরদিন তারা থানা থেকে পুলিশ নিয়ে এল। একজন সেপাই আর বোধহয় একজন সাব-ইন্সপেক্টর। তারা এসে চারদিক দেখেশুনে বিষ্ণুপদকে বলল,এ কাজ তো ঠিক হচ্ছে না। বাড়ি তৈরির কাজ বন্ধ করতে হবে। কোর্টের অর্ডার।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, আমাকে বলে কোনও লাভ নেই। বাড়ি করছে কৃষ্ণজীবন, আমার বড় ছেলে। সে কলকাতায় থাকে। আদালতের অর্ডারের কথা সে বোধ হয় শোনেনি। তাকেই খবর পাঠাচ্ছি, যা হয় সে করবে।
সাব-ইন্সপেক্টর মুখে একটু তম্বি করল; বলল, ঠিকাদারকে বারণ করে দেবেন। আর যেন কাজে হাত না দেয়।
বামাচরণকে চলে যেতে বলে সাব-ইন্সপেক্টরটি রয়ে গেল একটু। বামাচরণ সেপাইটির সঙ্গে হাসিমুখে চলে যাওয়ার পর সাব-ইন্সপেক্টর এসে বিষ্ণুপদর পাশে বসে বলল, জ্যাঠামশাই, কৃষ্ণ আর আমি এক ক্লাসে পড়েছি। বামাচরণ আমাকে চেনে না। বামার মাথাটাও একটু গোলমাল মনে হচ্ছে। ওর ওসব কথায় কান দেবেন না। বাড়িটা তাড়াতাড়ি তুলে ফেলুন। কিছু হবে না।
আদালতের অর্ডার আছে নাকি?
আছে। তবে ওসব সাজানো ব্যাপার। উকিলরা কত কী পারে!
কৃষ্ণ পরের রবিবার এসে সব শুনল। তারপর বলে গেল বামার দুঃখের কারণ নেই। চায় তো ওর ঘরটাও পাকা করে দেওয়া যাবে।
শুনে হাঁ হয়ে গেল বিষ্ণুপদ।
নয়নতারা বলল, কেন, তোর টাকা কি সস্তা হয়েছে? যে কাণ্ড বামা করে বেড়াচ্ছে ওর বউকে সঙ্গে জুটিয়ে, তাতে ওকে দানছত্র করতে আছে? এক নম্বরের নেমকহারাম।
কৃষ্ণ মৃদু হেসে বলল, ঘুষ দিতে চাইছি মা, যাতে তোমাদের আর জ্বালাতন না করে।
ও যা ছেলে, চিরকাল জ্বালাবে বাবা। ঘর পাকা করে দিলে তো বাঘের ঘরে ঘোগের বাসাই হল। শান্তি থাকবে না। বরং যদি পারিস ওর মাথার চিকিৎসা করা।
মাথার চিকিৎসার দরকার নেই মা । ও করতে গেলে আরও সন্দেহ করবে। শুনলাম তোমাদের কাছে বাড়ির ভাগ বাবদ টাকা চাইতে এসেছিল?
হ্যাঁ বাবা, সে কী রাগ!
কত টাকা চায়?
সে অনেক টাকা। ত্ৰিশ পঁয়ত্ৰিশ হাজার।
সেটা পেলে কী করবে?
ও—ই জানে! পিছনে থেকে বউ বুদ্ধি দিচ্ছে। ও কি আর ভেবেচিন্তে বলেছে?
ধরো সেই টাকাটা দিয়ে যদি লিখিয়ে নিই?
না বাবা। ওসব করতে যাস না। ওর লোভের শেষ নেই। টাকা নিয়ে আবার একটা ফ্যাকড়া তুলবে। ওকে চিনি।
তা হলে থাক। বাবা, আপনি কি বলেন?
বিষ্ণুপদ তার কৃতী ছেলেটির দিকে চেয়ে তটস্থ হয়ে বলল, আমি আর কী বলব?
বামার উৎপাত তো বন্ধ করা দরকার।
উৎপাত আছে থাক, গায়ে না মাখলেই হল।
আপনার চিরকাল ওই কথা বাবা, কোনওদিনই কিছু গায়ে মাখেন না। কিন্তু আমি চাই শেষ জীবনটা অন্তত আপনারা একটু শান্তিতে থাকুন।
বিষ্ণুপদ খুব হাসল। মাথা নেড়ে নিজের পণ্ডিত এবং আহাম্মক ছেলেটির দিকে চেয়ে বলল, তোমারও বাস্তববুদ্ধি বলে কিছু নেই। টাকার ব্যবহারও শেখনি। আমার মতোই।
টাকাই তো চাইছে, টাকা দিলে যদি ঠাণ্ডা হয়।
নয়নতারা পাশ থেকে বলে উঠল, খবৰ্দার না। এখানে এক কাড়ি খরচ হচ্ছে বাড়ির পিছনে, ফের যদি আমার পিছনে টাকা ঢালিস তা হলে বউমা কুরুক্ষেত্র করবে।
সে জানবে না, মা।
তোকে বলেছে! বামাই গিয়ে বলে দিয়ে আসবে।
তা হলে কী করা?
বিষ্ণুপদ বলল, আমি বলি কি, তুই অত ভেবে মরিস না। বামার সঙ্গে তো চিরটা কাল আছি। সব সয়ে গেছে। নতুন উৎপাত নয়। বাবা। তবে আগে এত মাথা-গরম ছিল না, আজকাল বায়ু বেড়েছে।
