হেমাঙ্গ আগে তার হাত আর পায়ের নখ কাটল। কফি খেল। বসে বসে অনেকক্ষণ ভাবল। সন্ধে সাড়ে সাতটার বাংলা খবর শুনল টিভিতে। যদিও খবর তাকে স্পর্শও করল না।
বিডন স্ট্রিটে প্রথম ফোনটা করল মাকে।
মা প্রথম কথাই বলল, তুই ভেবেছিসটা কী?
একটু? একে একটু বলে?
শরীরটা একটু সারিয়ে এলাম।
তোর যে কী চেহারার ছিরি হয়েছে তা আমি জানি। টকটকে ফরসা রংটাকে জ্বলিয়ে দিয়েছিস। তারপর ওখানে নাকি নৌকো বাইছিস, জাল ফেলছিস, চাষ করছিস। এই এতক্ষণ সব বলে গেল বাঁকা মিঞা। তোকে আর গড়চার বাড়িতে থাকতে হবে না। কালকেই চলে আসবি। আমি তোর বাবাকে বলেছি ও বাড়ি বিক্রি করে দিতে।
হেমাঙ্গ আতঙ্কিত হয়ে বলল, শোনো মা, শোনো। আমি আর না হয় এরকম করব না।
না বাপু, এসব পাগলামিকে আমি সহ্য করব না। তোর বাবাই ভুলটা করেছেন। ও বাড়িতে তোকে পাঠানোটাই সব সর্বনাশের মূল। মায়ের কোলছাড়া হয়ে থেকে তোর এখন নানা বাই দেখা দিচ্ছে। এখন থেকে তোকে আমি নিজের কাছে রাখব।
শোনো মা, এটা কোনও পাগলামি নয়। কলকাতার ভিড় ছেড়ে ফাকায় যেতে ইচ্ছে করে না বলো! ঠিক আছে, সামনের শনিবার চলো, তোমাকে আর বাবাকে নিয়ে গিয়ে আমার গাঁয়ের বাড়িটা দেখিয়ে আনি। দেখলেই তোমার মত যাবে।
রক্ষে করো বাপু, আমার আর ওই ধাপধারা গোবিন্দপুরে গিয়ে কাজ নেই। তোর যাওয়াও আমি বন্ধ করব। বিয়ে না দিয়ে আমি আর তোকে বিডন স্ট্রিটের বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে দেব না। ফটিককে খবর পাঠাচ্ছি। সে আজই জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখুক। কাল ট্রাক গিয়ে সব নিয়ে আসবে।
মা, আর একটা মাস সময় দাও।
এক মাস! এক মাসে কোন হাত-পা গজাবে তোর? বাঁকা মিঞাকেও বলে দিয়েছি। খদের দেখতে। গায়ের বাড়িটাও বিক্রি করে দিবি।
সর্বনাশ!
কিসের সর্বনাশ? ওই গা-ই তো তোকে খেল। বিয়েটা হয়ে থাকলে একটু নিশ্চিন্তি ছিল। সাধা লক্ষ্মী পায়ে ঠেললি! আমন মেয়ে কি পড়ে থাকে? এই তো কেমন বিয়ের ঠিকঠাক হয়ে গেল।
কার কথা বলছি মা?
আবার কার কথা? রশ্মি কেমন বুদ্ধিমতী মেয়ে দেখ তো! বিলেতে-বিদেশে একা থাকবে না বলে কেমন বর জুটিয়ে ফেলেছে। আর তুই হাঁ করে গায়ে বসে আকাশ গিলছিস।
হেমাঙ্গ একটু স্তব্ধ হয়ে থেকে বলল, এ খবর কে দিল?
খবর কি আর চাপা থাকে? সে নিজেই খবর দিয়েছে চারুকে। চারু আমাদের বলেছে। অমন চার চৌকো মেয়ে তোর বউ হলে সব দিক দিয়ে ভাল হত।
হেমাঙ্গর হাত-পা শিথিল লাগছিল। কেন যেন একটু অপমানও বোধ করছিল সে। বলল, মা, আমি কালকেই তোমার কাছে যাব, অফিসের পর। সব বুঝিয়ে বলব। এক মাস সময় দাও আমাকে। তাড়াহুড়ো কেরো না।
অফিসেও তোর কাজ পড়ে আছে। পার্টনাররা তোর বাবাকে জানিয়েছে, তোর নাকি কোথায় কোথায় যাওয়ার কথা ছিল, যাসনি। তারা হয়রান হচ্ছে। এ সব কী পাগলামি বল তো?
আচ্ছা মা, কাল গিয়ে সব বলব।
কাল রাতে এখানেই খাবি। মনে থাকে যেন।
আচ্ছা মা।
হেমাঙ্গ ফোন রেখে স্তম্ভিত মাথায় বসে রইল। কিছুক্ষণ।
এ কি সত্যি হতে পারে? এত তাড়াতাড়ি তার স্মৃতিকে মুছে ফেলে দিতে পারে রশ্মি? ঠিক কথা, হৃদয়াবেগ নিয়ে থাকার দিন চলে গেছে। কিন্তু তা বলে একটুখানি আবেগও কি থাকবে না? সামান্য সেন্টিমেন্ট?
ফোনটা আবার তুলে নিল হেমাঙ্গ।
চারুদি, কেমন আছিস?
কেমন আছি? তা দিয়ে তোর কি দরকার? আমাদের থাকা বা না-থাকায় তোর কী আসে যায়?
আমার খোঁজ করেছিলি কেন?
চারুশীলা একটু চুপ করে থেকে বলল, এখন আটটা বাজে। আসতে পারবি?
টায়ার্ড লাগছে। কেন যেতে বলছিস বল তো!
কথা আছে।
কুমুদ একটু হেসে বলল, বিলিত বৃত্তান্ত নাকি? ওটা মায়ের কাছে শুনলাম।
শুনাল?
চারুশীলা দুঃখিত গলায় বলে, বলতে বারণ করেছিল।
গোপন করার বিষয় তো নয়। বলে ভালই করেছিস।
তুই কি একটু দুঃখ পেলি?
না। দুঃখ পাওয়ার কথাই তো নয়। আমিই রিফিউজ করেছিলাম, সুতরাং আমার তো কোনও দাবি থাকতে পারে না।
ওকে বাধ্য হয়ে করতে হচ্ছে। ইংল্যান্ডে এখন একা থাকা যে কোনও মেয়ের পক্ষেই খারাপ । ও ভয় পাচ্ছে।
আমি জানি। ইটস এ গুড ডিসিশন।
কাল আসবি?
কাল হবে না। মা ক্ষেপে গেছে। এ বাড়ি বিক্রি করে দিতে চাইছে। আমাকে পুনর্মুষিক হয়ে বিডন স্ট্রিটে ফিরে যেতে বলছে।
যাবি?
সেটা বুঝিয়ে বলতেই কাল মায়ের কাছে যাব।
তাহলে আজই চলে আয়। এমন কিছু রাত হয়নি। কাছেই তো। ফটিককে রান্না চাপাতে বারণ করে আয়।
হেমাঙ্গ একটু ভেবে অনিচ্ছার সঙ্গে বলল, আচ্ছা।
গাড়িতে পাঁচ মিনিটের পথ। পৌঁছে গিয়ে হেমাঙ্গ দেখল। আজও চারুশীলার বাড়িতে অতিথি সমাগম। অতিথি ছাড়া ও থাকতেই পারে না।
চিনতে পারছেন তো! বলে মানি প্ল্যান্টের পাশ থেকে একটি হাসিমুখ এগিয়ে এল।
একটু চমকে উঠল কি হেমাঙ্গ? একটা বিট মিস করল তার হার্ট। একটু অবরুদ্ধ গলায় সে বলল, পারছি।
০৮৮. টাকা জিনিসটার যে কী মহিমা
টাকা জিনিসটার যে কী মহিমা তাই বসে বসে দেখে বিষ্ণুপদ। টাকা যেন ফু। সেই ফুয়ে বাড়িটা যেন বেলুনের মতো ফুলে-ফোঁপে উঠছে। দেখ-না-দেখ একতলা ঢালাই হয়ে গিয়ে দোতলার দেওয়াল উঠে গেল। লিনটেল অবধি। পরশু থেকে শাটারিং-এর কাজ। সামনের সপ্তাহে দোতলারও ঢালাই।
মুখোমুখি আজও রামজীবনের আধখ্যাচড়া বাড়িটা। তবে আজকাল আর মুখ ভ্যাংচায় না, যেন ম্লান চোখে সামনের বুক ফোলানো দোতলা বাড়িটার দিকে চেয়ে থাকে জ্বলজুল করে। গায়ে এখনও ভারার মই একটা রয়েছে, তাতে শ্যাওলা ধরেছে। ইটগুলো কালো হয়ে এসেছে। ছাদহীন পাকা দেওয়ালগুলো ফাঁকা দাঁড়িয়ে হাহাকার করছে শুধু। দুটো বাড়ির মধ্যে এই রেষারেষিটা-আর কেউ নয়-বিষ্ণুপদ টের পায়।
