শিখে রাখা ভাল।
তোমার শুধু ওই কথা।
বাসন্তী একটু গনগন করতে করতে স্টোভ জ্বেলে চা করল। তারপর চা দিতে এসে হঠাৎ শিহরিত আতঙ্কিত একটা চিকার দিল, ই কী!
চমকে গিয়েছিল হেমাঙ্গ। কাপের চা খানিক চলকে গেল। অবাক হয়ে বলল, কী হয়েছে?
তোমার নখগুলো দেখেছ? এ যে রাক্ষসের নখ হয়ে উঠেছে! মা গো!
হেমাঙ্গ নিজের নখগুলোর দিকে তাকাল। বাস্তবিকই অদ্র রকমের বড় হয়ে গেছে। নেল কাটার নেই বলে কাটা হয়নি। লজ্জিত হয়ে বলল, কাটতে হবে।
আজই কাটবে। ছিঃ, ওরকম নখ নিয়ে কেউ থাকে। এর পর লোকে তোমাকে বলবে, পাগলা।
নেল কাটার নেই বলে কাটা হচ্ছে না।
আহা, কী কথা! নখ-কাটুনি নেই বলে আমরা বুঝি নখ কাটছি না? মদনদাকে খবর দিচ্ছি, এসে নবুন দিয়ে মুড়িয়ে কেটে দিয়ে যাবে।
ননকে হেমাঙ্গর বড় ভয়। যন্ত্রটাকে ছেলেবেলা থেকেই সে সুনজরে দেখে না। তা ছাড়া অন্যের হাতে নখ কাটানোর অভ্যাসও তার নেই। বলল, আচ্ছা, আমি নিজেই কেটে নেবখন। মদনকে ডাকতে হবে না।
আজই কাটবে।
দেখছি। তুই যা তো, রুটি বানা। খিদে পেয়েছে।
বাসন্তী ঘরের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে নিজের নখগুলোর দিকে ফের চেয়ে রইল হেমাঙ্গ। বাস্তবিক নখগুলোর একটা ব্যবস্থা না করলেই নয়। আজকাল ভাতের থালায় হাত দিলে নখের শব্দ হয়। নখের গোড়ায় অস্বাস্থ্যকর নীল ময়লাও জমেছে।
নখ নিয়ে অনেকক্ষণ ভাবল হেমাঙ্গ। তারপর একটা সিদ্ধান্ত নিল।
রুটি বেড়ে এনে বাসন্তী সামনে বসে বলল, হা দাদা, সেই সুন্দর মেয়েছেলেটার সঙ্গে বিয়ে হল না তোমার কেন বলো তো!
কতবার শুনবি?
আবার বলো। তোমার কথাগুলো এমন যে স্পষ্ট করে বোঝা যায় না। বারবার শুনলে বুঝতে পারব।
তুই জন্মেও বুঝবি না।
আচ্ছা, বিয়েটা হল না বলেই কি তুমি বিবাগী হয়ে আছ এখানে?
তাই ধরে নে।
না, স্পষ্ট করে বলো।
হেমাঙ্গ রুটি খেতে খেতে বলল, বিয়ে করে কোন বোকা? বিয়ে তো কয়েদখানা। এই বেশ আছি।
বেশ আছ না ছাই আছ। তোমার মুখচোখ মোটেই ভাল নয় বাপু। সব সময়ে দুঃখ-দুঃখ ভাব করে থাকো।
তাই বুঝি?
আচ্ছা, একটা কথা কইব। বল না। তোর তো কথার শেষ নেই দেখছি।
কথা না কইলে বাপু আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। আমি নাকি ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও রাত বিরেতে জোরে জোরে কথা বলি। সেইজন্য আমাদের বাড়িতে নাকি কখনও চোর ঢেকে না। বলে হি হি করে খুব হাসল বাসন্তী। হ্যাঁ, সেই কথাটা।
বলে ফেল।
আচ্ছা সেই যে রোগামতো মেয়েটা এসেছিল, কী নাম যেন!
আবার তাকে নিয়ে ভাবছিস কেন?
তার সঙ্গে কিন্তু তোমাকে খুব মানায়। নামটা ঝুমকি না কী যেন?
একটু স্তব্ধ হয়ে থাকে হেমাঙ্গ। বুকের অন্তঃস্থলে থিতানো জলে একটু নাড়া পড়ে কি?
হেমাঙ্গ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ও সব ভাবিস না।
কেন, ভাবলে বুঝি দোষ।
বিয়ে করার প্রশ্নই নেই। করলেও শহুরে মেয়ে নয়।
বাসন্তী চোখ বড় বড় করে বলল, তো কি গাঁয়ের মেয়ে?
যদি কখনও বিয়ে করি তবে গায়ের মেয়েকেই করব।
বাসন্তী হঠাৎ হেসে গড়িয়ে পড়ল, বলো কী গো! গায়ের মেয়েরা যে ভীষণ বোকা আর ঝগড়টে হয়। কিন্তু স্টাইল জানে না। তোমার সঙ্গে মানাবে কেন?
আমি স্টাইল-জানা মেয়ে পছন্দ করি তোকে কে বলল?
লেখাপড়া জানে নাকি তোমার মতো?
লেখাপড়া না জানলেই ভাল। লেখাপড়া তো আর একটা আপদবিশেষ।
তোমাকে নিয়ে আর পারি না বাপু। তোমার ঘাড়ে ঠিক ভূত চেপেছে।
দুপুরে খাওয়ার পর হেমাঙ্গ বিনা ভূমিকায় তার ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছিল।
বাসন্তী চেঁচাল, ও কি? কোথায় চললে?
কলকাতায়। নখ কাটতে।
বাসন্তী চোখ বড় করে বলে, নখ কাটতে কলকাতায়।
হেমাঙ্গ একটু হেসে বলে, নেল কাটার ছাড়া হবে না, বুঝলি? এবার যখন আসব যন্ত্রটা নিয়েই আসব। পায়ের নখ এত বড় হয়েছে যে, হোঁচট খেলে এক-আধটা নখ উন্টে যেতে পারে। রক্তারক্তি কাও হবে তখন।
বাসন্তী কপালে হাত দিয়ে বলে, পোড়া কপাল! বাবু নখ কাটতে কলকাতায় চললেন। তাহলে আর তুমি ইহজন্মে গায়ের মানুষ হতে পারবে না। বুঝলে।
বুঝলাম। ঘরদোর দেখে রাখি।
সে তোমাকে বলতে হবে না। কবে আসবে?
চলে আসব। খেয়াল হলেই চলে আসব।
আমি এদিকে পাত্রী দেখতে লেগে যাচ্ছি। কিন্তু।
মাথায় চাটি খাবি। ফাজিল কোথাকার!
বাসন্তী হাসল না। একটু ছিলো ছলো চোখ করে বলল, তুমি চলে গেলেই না। এ জায়গাটা আমার বড্ড ফাঁকা লাগে। কী করি জানো? তোমার ঘরে এসে বসে থাকি। একা একা ভূতের মতো।
হেমাঙ্গর মনটা একটু মেদুর হয়ে গেল। বলল, দেখিস যেন তোকেও আবার ভূতে না পায়।
ঘাট অবধি এগিয়ে দিয়ে গেল বাসন্তী। বলল, তাড়াতাড়ি চলে এসো। কিন্তু।
ভটভটিতে বসে হেমাঙ্গ ছেড়ে-আসা ঘাট আর নদীর ধারে তার ঘরখানার দিকে চেয়ে ছিল। বড় মায়া জনো গেছে। এটা কি ভাল? কলকাতার প্রতি তার কোনও টানই নেই। যেতে হচ্ছে বলে যাওয়া। কতাটা মিথ্যে নয় যে, তার অনুপস্থিতি ক্ৰমে ক্রমে কলকাতায় কিছু অনিশ্চিত শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। তার পার্টনাররা অস্বস্তিতে আছে। উদ্বিগ্ন তার মহাজন ক্লায়েন্টরা। অথচ সে কীই বা করতে পারে?
ফটিক তাকে দেখেই একগাল হাসল, এলেন তাহলে? না এলে কালই আমাকে সেই গায়ে গিয়ে আপনাকে ধরতে হত।
সে কী! কেন?
চারুদিদি খবর পাঠাচ্ছেন বারবার। গতকাল এসে হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে গেলেন। বললেন শুকুরবার গিয়ে যেন আপনাকে ধরে নিয়ে আসি। তাড়াতাড়ি তাকে ফোন করুন। বিডন স্ট্রিটের বাড়ি থেকেও খুব খোঁজ হচ্ছে।
এই খোঁজখবর, উদ্বেগ ইত্যাদি হেমাঙ্গর আর ভাল লাগে না। বিতৃষ্ণায় মনটা ভরে যায়। স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় অন্তরায় এইসব আত্মীয়তা।
