সে তুমি বুঝবে না।
বুঝবে না বলে তো আমাকে ঠেকালেন, শেষে দায়টাও আমার ওপর পড়বে।
তা দায় তোমারও একটু আছে। এমন সুন্দর জায়গাটায় এনে ফেললে, যে আমার যেতেই ইচ্ছে করে না।
মাঝে মাঝে না গেলে চলবে কেন? তা সেই যার সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছিল তিনি কি চলে গেলেন।
হুঁ।
বিয়েটা হলে আপনার একটু ঘরমুখখা ভাব হত।
হেমাঙ্গ হাসল, বিয়ের দরকার নেই বাঁকা মিঞা। বউ এসে আমার জীবনটাকে ছোট ফ্রেমে বাঁধিয়ে নেবে। তখন কি আর ইচ্ছেমতো চলে আসতে পারব? এই যে সাত দিন ধরে এক মুক্ত জীবন ভোগ করছি এ আর পারব।
আমারও তত সেই কথা। এ সব করার দরকারই বা কী?
হেমাঙ্গ মাথা নেড়ে বলল, তুমি কিছুতেই সেটা বুঝতে পারবে না। আচ্ছা বলো তো, এই জায়গাটাকে তুমি কি সুন্দর দেখ?
মুশকিলে ফেললেন। এখানেই আমার জন্ম।
আমারও জন্ম। আমি এখানে নতুন করে জন্মেছি। তুমি জন্মেছো বটে, কিন্তু এ জায়গা রোজ দেখেও দেখনি। তোমার চোখই যে পুরনো।
বাঁকা মিঞা মাথা নেড়ে বলে, নাঃ, আপনার রোগের চিকিৎসা নেই।
কথা হচ্ছিল দাওয়ায় বসে। একখানা মোড়ার ওপর বাঁকা মিঞা, আর জলচৌকিতে হেমাঙ্গ। বর্ষার পরে শরতের আসি-আসি ভাবটা চারদিকে খুব টের পাওয়া যাচ্ছে। হেমাঙ্গর শিউলি গাছ দুটোয় দুটো চারটে ফুল হয় আজকাল। আকাশে মাঝে মাঝে মেঘের সঞ্চার হয়, হুড়মুড় করে বৃষ্টি নামে, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘ কেটে গিয়ে এক আশ্চর্য রোদুরে ঝলমল করতে থাকে চারদিক। কাশফুল ফোটে কাছেপিঠেই, নৌকো বেয়ে গিয়ে সেই কাশফুলের শোভা প্রায়ই দেখে আসে হেমাঙ্গ। স্পষ্টভাবে নয়, কিন্তু অস্পষ্টভাবে হেমাঙ্গ আজকাল এই জগতের সঙ্গে এই মহাবিশ্বের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের একটা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সূত্ৰকে টের পাচ্ছে। বাঁকা মিঞা সেই গভীর আবিষ্কারের খবর রাখে না। বাঁকা মিঞার কাছে তার এইসব আচার-আচরণ একটা মহাপতন, এক সাংঘাতিক সর্বনাশ।
তুমি আমাকে নিয়ে এত ভাবছ কেন বাঁকা?
ভাবছি, তার কারণ আছে। আজ কলকাতায় যাব। বিডন স্ট্রিটে আপনাদের বাড়িতেও একবার যেতে হবে। মাঠাকরুন সুন্দরবনের মধু চেয়েছিলেন। তা, তার জোগাড় হয়েছে সেইটে নিয়েই যাব। গেলে পর আপনাকে নিয়ে কথা উঠবে। কী বলব তাই ভাবছি।
হেমাঙ্গ হাসল, আমাকে কি তুমি জোর করে ধরেবেঁধে রেখেছ এইখানে? আমি তো নিজের ইচ্ছেয় আছি।
সে তো ঠিকই। কিন্তু ইচ্ছেরও তো নানারকম ব্যাখ্যা হয়। দাড়ি লম্বা হচ্ছে, চুলে জট ধরছে, গায়ের রং তামাটে মেরে এল—এ তো ভাল লক্ষণ নয়। কিছু একটা হয়েছে আপনার, মুখে বলছেন না।
তা তো হয়েছেই। কী মনে হচ্ছে জানো? এই দুনিয়ায় জন্মে এতকাল দুনিয়াটাকে চিনবার চেষ্টাই করিনি, দুনিয়াটার ভাল-মন্দ নিয়ে ভাবিওনি কিছু, এত যে মানুষজন তাদের সঙ্গে সম্পর্কও তৈরি করিনি। অনেক বকেয়া পড়ে গছে। দুনিয়াটাকে এখন নানাভাবে চিনবার চেষ্টা করছি।
বাঁকা মিঞা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে পড়ল। বলল, কলকাতা থেকে ফিরে কাল সকালে খবর দিয়ে যাবখন।
খবর! না, কলকাতার খবরে আর দরকার কি আমার?
বাঁকা মিঞা অবাক হয়ে বলে, মা-বাপ কেমন আছে সেটাও কি জানতে ইচ্ছে করে না আপনার?
ভালই আছে বাঁকা, তারা ভালই আছে।
বড় চিন্তায় ফেলে দিচ্ছেন।
সকালের নরম রোদে উঠোন ভরে আছে। বাঁকা চলে যাওয়ার পর তার ছোট উঠোনে রোদের লালচে নরম আলো আর গাছের চিকরিমিকরি ছায়ার কাপন চোখ ভরে দেখছিল হেমাঙ্গ। কত পোকামাকড় আসে। কত অদ্ভুত ধরনের তাদের ওড়াওড়ি, ঘোরাঘুরি। আকাশের মেঘে কত আকার। আজকাল তার প্রকৃতিমুগ্ধতা এসে গেছে।
কী গো দাদা, বসে বসে হাঁ করে কী ভাবছ? চা খাওনি এখনও?
হেমাঙ্গ বাসন্তীর দিকে চেয়ে বলল, হা রে, চা খাওয়ার এখন কী দরকার? ছেড়ে দিলেই তো হয়।
ওমা! ছাড়বে কেন? তোমার চা করতে গিয়ে আমিও যে একটু করে খাই।
হেমাঙ্গ হেসে বলল, তাহলে কর।
আজকাল বড় আনমনা থাকো। কী হয়েছে বলো তো!
হেমাঙ্গ একটু বিরক্ত হয়ে বলে, তুইও কি বাঁকা মিঞার মতো হলি! সব সময়ে কী হয়েছে, কী হয়েছে। মানুষ মাঝে মাঝে একটু একা থাকতে চায়, একটু ভাবনাচিন্তা করতে চায়। সেটা কি দোষের?
বাসন্তী আগে একটু সমীহ করত হেমাঙ্গকে। আজকাল আর একদম করে না। ঝংকার দিয়ে বলল, আহা, কী হয়েছে জানতে চাইলে বুঝি দোষ হয়? তোমার ভাল-মন্দ নিয়ে ভাবব না তো আর কে ভাববে? বাঁকা চাচা কি সাধে বলে বাবুর। ঘাড়ে ভূত চেপেছে?
চোখ পাকিয়ে হেমাঙ্গ বলল, বলেছে?
হ্যাঁ বলেছে। তাতে হয়েছেটা কী? বাঁকা চাচা তোমাকে কত ভালবাসে জানো?
তোদের ভালবাসার জ্বালায় না আমাকে এ গা ছাড়তে হয়।
ছেড়েই দেখ না। কলকাতায় গিয়ে ফের ধরে নিয়ে আসব।
তুই রাখতে চাস, আর বাঁকা তাড়াতে চায়। তার ধারণা হয়েছে আমি কলকাতায় না গেলে দুনিয়া অচল হয়ে যাবে। তোদের দুটিকে নিয়ে যে কী করি।
আর কিছু করতে হবে না, শুধু গোমড়া মুখে থেকে না। একটু কথাটথা কয়য়া। আজ সকালেও নাকি আফজলের সঙ্গে নৌকো বাইতে গিয়েছিলে?
হ্যাঁ তো। জাল ফেললাম।
মাছ পেয়েছ?
পেয়েছিলাম। আফজলকে দিয়ে দিয়েছি।
ওমা! কেন?
মাছে আজকাল আঁশটে গন্ধ পাই। আফজল নিয়ে গেল, কিছু খাবে, কিছু বেচে দুটো পয়সা পাবে।
বাসন্তী অসন্তোষের গলায় বলে, এই করে করে তোমার সব যাবে। মাছ আনলে আজ মাছের ঝাল করে তোমাকেও খাওয়াতাম।
ডাল ভাত তরকারিই তো পেট ভরে যাচ্ছি।
তবে ধরারই বা কী দরকার? নাই যদি খাবে তবে মাছ ধরা শিখছ কেন?
