ভাল মেয়ে অনেক পাবে।
রশ্মির মতো তো আর পাবো না।
বেশ ছিল। যাই বলো বাপু, আমার আবার তত ভাল লাগত না।
কেন রে?
কী জানি! রশ্মির সব বেশি বেশি।
পড়ে তো থাকবে না। শুনছি তো তারও একটা হিল্পে হচ্ছে।
কী বলছো?
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চারুশীলা বলল, কাল ফোন করেছিল। সেরকমই একটা আভাস দিল যেন।
কী বলল বলো তো?
কাল বলব। আসবি কিন্তু। তোর মাকে ফোনটা দে। নেমন্তন্নটা আমারই করা উচিত।
ঝুমকির বুক কেন কাঁপছিল? মায়ের হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিয়ে সে নিজের ঘরে এসে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। তার যেন ঘাম দিয়ে একটা জ্বর ছেড়ে যাচ্ছে। হাত-পা অবশ লাগছে। রিলিফ। কিন্তু কেন?
পরদিন সন্ধেবেলা চারুশীলার বাড়িতে একগাদা অতিথি দেখে অবাক হল ঝুমকি? পারেও খরচ করতে মানুষটা।
এত আয়োজন কেন মাসি? বোলো না যে আমার চাকরির অনারে।
চাকরির অনারে না হোক, তোর অনারে।
আমার অনারেই বা কেন?
আমার তো জানিস একটা ছুতো দরকার হয়। আমি আসলে মানুষ ভালবাসি।
সে জানি।
অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাতে একটু ব্যস্ত হয়ে পড়ল চারুশীলা। ঘুরে ঘুরে হলঘরে সকলের মুখ দেখছিল ঝুমকি। যারা চারুশীলার বাড়ির নেমন্তন্ন প্রায়ই আসে তারা সবাই আছে। বাদ শুধু হেমাঙ্গ। একটু অদ্ভুত ব্যাপারটা।
চারুশীলা একটু বাদে এসে বলল, চল কোথাও বসি। একটা ঠাণ্ডা পাবি?
না। আমার টনসিলটা বেড়েছে বোধহয়। অফিসের কুলারটা সহ্য হচ্ছে না।
ছেড়ে দে।
কুলারে আমার অভ্যাস আছে। যেখানে শিখতাম সেখানেও কুলার ছিল। কিন্তু এই অফিসের কুলারটা বড় ঠাণ্ডা।
চাকরি করিস না ঝুমকি।
এবার বলো তো, রশ্মি কী বলছে?
চারুশীলা একটু দ্বিধা করল। বলল, বলাটা কি ঠিক হবে। আমাকে প্রাইভেটলি বলেছে। হেমাঙ্গকে বলতে বারণ করেছে এখন।
আহা, বলো না!
কাউকে বলিস না।
বলব না মাসি। বলো।
একটা বাঙালি ছেলের সঙ্গে ওর একটু আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে। ছেলেটা লন্ডনের একটা বড় ব্যাঙ্কে মস্ত চাকরি করে।
আন্ডারস্ট্যান্ডিং মানে?
তুই কি আন্ডারস্ট্যান্ডিং মানেও ভুলে গেলি?
কিরকম আন্ডারস্ট্যান্ডিং?
বলল, একা থাকা এখন বেশ বিপজ্জনক। ভাল লাগছে না। তাই ও শিগগিরই একটা ডিসিশন নিতে চায়।
বিয়ে করবে।
ভাবছে।
এত ভাবার কী আছে?
আছে রে আছে। বিয়ে সাঙ্ঘাতিক জিনিস।
তা জানি। কিন্তু বেশি ভাবতে গেলে আবার কেঁচে যাবে।
চারুশীলা হাসল। বলল, না, কাঁচবে না। রশ্মি খুব প্র্যাকটিক্যাল মেয়ে। সে বিয়ে করবে বিয়ের প্র্যাকটিক্যাল প্রয়োজনের জন্যই। ভাবাবেগ থেকে নয়।
রশ্মি সম্পর্কে আমার এ কথাটাই তোমাকে বলার ছিল মাসি। রশি বড্ড বেশি প্র্যাকটিক্যাল, সহজ, বাস্তববাদী। সে আমাদের মতো নয়।
চিন্তিতভাবে তার মুখের দিকে চেয়ে চারুশীলা বলল, সেটা কি আমি জানি না। হেমাঙ্গর সঙ্গে ওই একটা জায়গায় ওর মেলে না। কিন্তু হেমাঙ্গ যে বড্ড বেশি স্বপ্নবিলাসী, বড় ভাবাবেগ! উদাসী ধরনের ছেলে। ভেবেছিলাম, রশিই ওকে। চালিয়ে নিতে পারবে।
ঝুমিক একটু হাসল।
চারুশীলা একটা শ্বাস ফেলে বলল, এই এক পাগলকে নিয়ে কি করি বল তো। কাল রাতে ফোন করেছিলাম। ওর চাকর বলল, দাদাবাবু নাকি কাল বিকেলেই তার গায়ের বাড়িতে চলে গেছে।
ও। বলে ঝুমকি বুকের মধ্যে একটা পতনের শব্দ পেল কি?
চারুশীলা আবার অতিথি অভ্যর্থনায় এগিয়ে গেল।
ঝুমকি সরে এল একটা কোণের দিকে। একা। তার বেশি কথা বলতে ভাল লাগছে না। মেলামেশা ভাল লাগছে না।
রাত্রিবেলা যখন নিজের ঘরে একা হল ঝুমকি, অন্ধকারে জেগে থেকে তখন নিজের সামনে অকপট নিজেকে দাঁড় করাল সে। প্রশ্ন করল, সত্য বলে।
ঝুমকি বলল, তাই।
তাই? ঠিক জানো?
ঝুমকি বলল, মনে তো হচ্ছে। ঠিক হল কাজটা?
কে জানে!
ভাবো। আরও ভাল করে ভাবো।
ভাবছি। দিনরাত ভাবছি।
কোনও ভুল নেই?
হয়তো ভুলই হচ্ছে। ভীষণ ভুল।
তার কথা কি গোপন রাখব সকলের কাছে?
০৮৭. আর কী বাকি রাখলেন
আর কী বাকি রাখলেন বলুন তো! নৌকো বাওয়া শিখলেন, মাছের জাল ফেলা শিখলেন, হাল চাষ শিখলেন। লেখাপড়া যা শিখেছিলেন সব তো ভুলে মেরে দেবেন এর পর।
শিখলাম আর কই? শুধু কায়দাটা শিখলেই কি হল? অভ্যাস করতে হবে না? নৌকো বাইতে বাইতে আর হাল চাষ করতে করতে যখন হাতে কড়া পড়বে, লোহার মতো শক্ত হয়ে যাবে তখন বুঝব যে শিখেছি।
আর লেখাপড়া যা শিখলেন তার গতি কী হবে? এই হাল চালানো, নৌকো বাওয়া বা মাছ ধরা এসব কি আপনার কাজ? এ শিখে কী হবে?
হেমাঙ্গ একটু হেসে বলে, এ শেখাটা তোমার কাছে কিছু নয় বুঝি?
এ তো সবাই পারে। কিন্তু মাথার কাজ তো সকলকে দিয়ে হয় না।
বাঁকা মিঞা, এ শেখার দাম তোমার কাছে না থাক, আমার কাছে অনেক। আগে বিচি দেখে গাছ চিনতে পারতাম না, কত বোকা আর অশিক্ষিত ছিলাম বলো তো? জীবনটাকে সাপটে ধরতে হলে এসবও দরকার হে।
আপনার দরকার আপনি বুঝবেন। কিন্তু বিডন স্ট্রিটের বাড়িতে গেলে মা ঠাকরুন আমাকেই ধরে পড়বেন, ও বাঁকা, তোমার পাল্লায় পড়েই আমার এ ছেলেটা গোল্লায় গেল।
গোল্লায় আগে ভাগ করে যাই তবে তো!
যেতে আর বাকিটা কী? গত সাত দিন কলকাতায় যাননি। কত কাজকর্ম বকেয়া পড়ে আছে ভাবুন তো!
সেসব আমার পার্টনাররা সামলে নেবে বাকা, ভেবো না। জীবনের একটা দিক আমার একদম অচেনা থেকে গিয়েছিল, সেইটে ভাল করে চেনা দরকার।
বাঁকা মিঞা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, এ আবার চেনাচেনির কী আছে? চাষাভুযো, জেলে, মাঝির জীবনে কিছুই নেই। পেট আছে আর পেটের চিন্তা আছে। গতর বাটিয়ে চাট্টি খাওয়া। এর মধ্যে কোন মধু আছে।
