পার্টটা চমৎকার হল।
নিমাই চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল, তাহলেই রক্ষে। নইলে বিপদ ছিল।
কিসের বিপদ?
নিমাই মাথাটা একটু নেড়ে বলে, তা কি জানি? বিপদ ওদের সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে।
বিপদ থাকলে আমার ছিল, তোমার তো আর নয়। তুমি তো বাক্সপ্যাটরা নিয়ে চৌকাঠ ডিঙিয়ে পগারপার হবে। আমি পড়ে থাকব, একা মেয়েমানুষ।
নিমাই কি একটু তটস্থ হল? নড়েচড়ে বসল। তারপর স্তিমিত গলায় বলল, বিপদ তো তোমারও ছিল না। মেশামেশিটা বড় করে ফেললে যে ওদের সঙ্গে। ভদ্রলোকের বউ-ঝিরা কি ওরকম করে?
বীণাপাণি নিজেকে সামলাতে পারল না। থমকানো চোখের জলটা এবার নেমে পড়ল গাল বেয়ে। টপটপ করে নামতে লাগল। গালে ছাকা দিয়ে নামতে লাগল। বীণাপাণি একটু ফুঁপিয়ে উঠে বলল, আগে বলো, আমরা কবে ভদ্রলোক ছিলাম। কবে দ্রলোকের মতো ছিলাম? কেউ মানে আমাকে দ্রলোকের মেয়ে বলে? বলো, মানে কেউ? গোনে কেউ? সেই চোখে দেখে কেউ?
নিমাই কথাটা স্বীকার করল না। ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল, ওটা কথাই নয়। কথা হল তুমি মানো কিনা। তোমার বাবা মাস্টারমশাই ছিলেন। তোমার দাদা অত বড় বিদ্বান লোক।
বীণাপাণি কান্নার মধ্যেও ছিছিক্কার করে উঠল, তাই বুঝি আজ এই দশা আমার! বনগাঁয়ে যাত্ৰাদলে সঙ সাজতে হচ্ছে। রাস্তায় মুখখামুখি দেখা হলে আমার মায়ের পেটের দাদা আমাকে চিনতে চাইবে? আর বাবা! এ যাবৎ খোঁজ করেছে একবারও, মেয়েটা বেঁচে আছে না মরেছে?
আজ মাথাটা বড় গরম তোমার।
লোকে যখন আমাকে ভাল ভাল কথা বলে তখন আমার মুখে থুথু আসে, বুঝেছো? আর তুমি! তুমিই বা কোন দ্রলোটা শুনি! দাদার কথা বলছে, অমন মানুষের বোনকে বিয়ে করার সুবোদ কি তোমার ছিল? বাবা আহাম্মক বলেই না দিল বুলিয়ে!
নিমাই মাথা নিচু করেই বসে রইল। বড় অপরাধী ভাব।
আর বীণা জ্বলতে জ্বলতে ভিজতে লাগল চোখের জলে। বুঁচকি খিদে চেপে চুপ করে বসে রইল তার কোলে।
নিমাই অনেকক্ষণ বাদে গলা খাকারি দিয়ে বলল, একটা কথাই কই। কথাটা বাড়িয়ে বলছি না। বিয়ের কথাটা যখন উঠল তখন তোমার বাবাকে আমি কিন্তু বলেছিলাম, কাজটা আপনি ঠিক করছেন না মশাই। জাতে-কাটে এক হলেও, আমরা ঠিক সমান সমান নই। তা উনিও একটু বোকাসোকা মানুষ, লোক চিনতে পারেন না। বললেন, তোমার একদিন খুব উন্নতি হবে। এ আমি দিব্যচোখে দেখতে পাচ্ছি।
বীণাপাণি নাটক করে বলেই নিজের ওপর রাশ টেনে রাখতে পারে। দমকা কান্নাটা সামলে চুপ করে বসে রইল।
নিমাই খুব ভীতুভাবে আরও একবার গলা খাকারি দিয়ে বলে, কাজটা ঠিক হয়নি, জানি। আমি বড় নিচুতলার মানুষ। বড় পতিত। পড়েও ছিলুম কোন আঘাটায়। তোমার বাবাই কুড়িয়ে নিলেন। তা বলে সেই বুড়ো মানুষটার ওপর রেগে গিয়েও লাভ নেই। উনিও তাঁর কর্মের ফল ভোগ করছেন।
বীণাপাণি নিমাইয়ের দিকে অসুরবধের সময় মা দুৰ্গার মতো চেয়ে থেকে বলে, আর আমি কার কর্মফলটা ভোগ করছি শুনি! আমি কার পাকা ধানে মই দিয়ে এসেছি? দুনিয়াটা বুঝে শুনে উঠবার আগেই আহাম্মক বাপ আর একটা আহাম্মকের গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে কন্যাদায় মিটিয়ে হাত ধুয়ে বসে রইল। একবার ভাবল না মেয়েটা খাবে পরবে কি। শুধু শুনেছিলাম ছেলের নাকি স্বভাবচরিত্ৰ ভাল। ওঃ ভাল চরিত্র ধুয়ে তো জল খাবো কিনা! এর চেয়ে যে স্মাগলাররাও অনেক ভাল। তারা তবু পুরুষমানুষ, ডাকাবুকো। এমন মেনীমুখখ তো নয়!
নিমাই ফের অপোবদন। এই বিদায় নেওয়ার মুহূর্তটা আরও একটু অন্যরকম হতে পারত বোধ হয়। সে তো চলেই যাচ্ছে। তবে আর এই বাক্যবাণ কেন? স্যুটকেসটার দিকে হাত বাড়িয়ে নিমাই ফের গলা খাকারি দিয়ে বলে, পাপমুখে একটা কথা আসছে। বলব?
বীণা জবাব দিল না।
নিমাই মাথাটা নিচু রেখেই বলে, আজকাল সবই হচ্ছে-টচ্ছে দেখছি চারদিকে। সেইসব দেখেই সাহস করে বলছি। বিয়ে ব্যাপারটা আগে যেমন পাকা ব্যাপার ছিল, আজকাল তেমনধারা নেই। ওসব অংবং মন্ত্রের কী-ই বা দাম। পুবুতরা তো দক্ষিণাটি পেলেই গড়গড় করে মন্ত্ৰ পড়ে চারহাত মিলিয়ে দেয়। কেউ মানছে না ওসব। আমি বলি কি, তোমারই বা মানবার কি দরকার?
বীণা বুঁচকিকে এত জোরে চেপে ধরল যে বেড়ালটা হাঁচোড় পাঁচোড় করে উঠল। বীণা বলল, কী বলতে চাইছ?
বিয়েটা তোমায় মানতে হবে না। আমরা বড় নিচুতলার লোক, আমরা যাই করি, আমাদের নিয়ে সমাজে কথা ওঠে না। কেউ ভাল করে নজরই করে না আমাদের। তাই বলি কি, এখনও সময় আছে তোমার। নামডাক হয়েছে। দু-পাঁচটা টাকাও আসছে। কাউকে পছন্দ হলে বিয়ে করা।
কথাটা নতুন নয়। আগেও ঠারেঠোরে বলেছে নিমাই। বীণাপাণি দাঁতে দাঁত পিষে বলে, কথাটা বলতে লজ্জা হল না। জিব খসে পড়ল না তোমার?
নিমাই মাথাটা নেড়ে বলে, আমি যদি একটা মানুষের মতো মানুষ হতাম তবে কি বলতে পারতাম। দখল রাখা এখন বড় শক্ত কাজ। জোরালো লোক না হলে কিছুর ওপর দখল থাকে না আজকাল। অনেক ভেবে দেখেছি, বিয়েটাও মাঝে মাঝে একটা জুলুম ছাড়া কিছু নয়। যেখানে বনে না সেখানেও ধরে বেঁধে আটকে রাখা! কাজটা অন্যায়। ছোটোলোকদের তো দেখছ! পেটে এক মুখে আর এক নয়। পাঁচু রিকশাওলা এই তো মাসটাক আগে টোপর পরে বিয়ে করে এল। সঙ্গে বাদ্যি-বাজনা, হ্যাজাকের আলো। মাস না ঘুরতেই বউ হাওয়া হয়েছে। পাঁচুও দিব্যি হাসিমুখে রিকশা চালাচ্ছে। যেন কিছুই হয়নি। আমার বেশ লাগল ব্যাপারটা। চাপান নেই, বাঁধন নেই। বেশ তো!
