এখানে ম্যাক্সিমাম মাইনে পাই আমি আর দেবদত্ত। তাও ঝুলোবুলি করে পাঁচশো।
কবছর আছেন?
প্রথম থেকে। সাড়ে তিন বছর।
মাত্র পাঁচশো টাকায়?
কী করব বলুন। কম্পিউটারের বাজারটাও স্যাচুরেটেড হয়ে যাচ্ছে। আমরা যা শিখেছি তা যথেষ্ট নয়। হায়ার ট্রেনিং থাকলে ভাল হত।
এখানে ও লেভেল কোর্স আছে?
শুভ হাসল, তাই তো বলে। কিন্তু ওই নামেই ও লেভেল। আপনি তো এসব না জানেন এমন নয়।
ঝুমকি এখনও অনেক কিছু জানে না। সে বলল, মেশিন তো মাত্র দুটো, আমাকে তা হলে কী করতে দেবে এরা?
শুভ হাসল, ঝুলঝাড়নি বা ঝাটাও ধরিয়ে দিতে পারে। রাগ করবেন না, প্রথম প্রথম আমাকে আর দেবদত্তকে তাও করতে হয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম এরা আমাদের আন্তরিকতার দাম দেবে। দেয়নি।
ঝুমকি বলল, এরা আসলে কারা? মালিক কে বলুন তো!
মধ্যপ্রদেশের লোক। যে আপনার ইন্টারভিউ নিয়েছিল সে হল মালিকের ছেলে। নবীন প্রসাদ। আর এখন যে বসে আছে সে হল নবীনের ভাই যমনা।
লোক কেমন?
যেরকম দেখছেন সেরকমই। যত তাড়াতাড়ি পারে টাকা কামিয়ে নেওয়ার ধান্দা ছাড়া এরা আর কিছু বোঝে না।
ভারাক্রান্ত মনে সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরল ঝুমকি।
বাবা জিজ্ঞেস করল, কী হল?
ঝুমকি একটু হাসবার চেষ্টা করে বলল, কী আবার হবে? চাকরি করে এলাম।
মনীশ ড্র কুঁচকে বলল, আমি জিজ্ঞেস করছি কনসার্নটা কেমন বুঝলে।
প্রথম দিনেই কি বোঝা যায়? ভালই।
মাইনে কত?
এখনও ঠিক হয়নি। এক মাস যাক তো।
তার মানে কি ওরা মাইনেটা কমিট করছে না? না কি তুই চেপে যাচ্ছিস।
আচ্ছা বাবা, অভিজ্ঞতারও তো একটা প্রয়োজন আছে। প্যাক্টিসে না থাকলে যে সব ভুলে যাবো। পয়সা খরচ করে শেখাটাই বৃথা হবে।
এটা শেখারও তোর কোন দরকার ছিল না। এম এ পাশ করতে পারতি।
লাভ কী বলো!
কিসের লাভ? চাকরির কথা ভেবে পড়াশুনো যারা করে তাদের পড়াশুনোটাও বৃথা। জানার জন্য যদি পড়তি তা হলে তার একটা দাম হত।
আজকাল তো কেউ জানার জন্য পড়ে না বাবা, চাকরির জন্যই পড়ে। জানার দাম আছে ঠিকই। কিন্তু দাম তো কেউ দেয় না।
মনীশ বলল, তোর জন্য আমার টেনশন হচ্ছে। এরা কেমন লোক জানি না, তুই একটা বয়সের মেয়ে, বিপদ হবে না তো!
কেন ভাবছো বাবা? বিপদ এত সহজ নয়। ওখানে আর একটা মেয়ে আছে। জমজমাট অফিস।
মনীশ চুপ করে গেল। মুখে একটুও হাসি নেই।
আজ বাবার সঙ্গে খুনসুটি করল না ঝুমকি, যা সে রোজই একটু করে। আজ সে সোজা নিজের ঘরে চলে গেল এবং ভাবতে বসল। চাকরিটা তার ভাল লাগছে না।
চারুমাসির ফোনটা এল রাত আটটা নাগাদ।
এই ঝুমকি, চাকরিতে জয়েন করলি আজ?
হ্যাঁ মাসি।
যাক বাবা, বাঁচা গেল।
কেন মাসি?
ভাবছি তোর চাকরির অনারে কাল ডিনার খাওয়াবো।
তার চেয়ে বেড়ালের বিয়ে দাও না। আগের দিনের বড়লোকরা তো এসব ছুতোয় টাকা ওড়াত।
ইয়ার্কি করছিস?
যা চাকরি এর অনারে ডিনার দিলে যে আমার লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করবে।
শোন, কাল শনিবার। তোর মা বাবা অনুবুবকা সবাইকে নিয়ে চলে আয় সন্ধেবেলা।
প্লীজ মাসি, এতটা কোরো না। আমার লজ্জা করছে।
যাঃ, লজ্জা কিসের?
তুমি সব সময়েই কেবল বাড়িটাকে একটা নেমন্তন্ন বাড়ি করে রাখো! তোমার বুঝি অকেশনেরও দরকার হয় না।
এটাই তো জীবন। শোন, সামনের মাসের শেষ দিকে আমি লম্বা ট্যুরে বাইরে চলে যাচ্ছি। অন্তত ছমাস। নন্দকে হয়তো ওর বাবা আমেরিকার একটা স্কুলে ভর্তি করে দিয়ে আসবে এবার।
ওমা! কেন? ওইটুকু মেয়েকে?
ওর বাবা খুব চায় মেয়েটা আমেরিকায় পড়ুক। অবশ্য এখনও সব ঠিক হয়ে যায়নি। আমার ইচ্ছেও নেই। যা সব শুনি আমেরিকার হালচাল তাতে ভয় করে। বারো-তেরো বছর বয়স থেকেই নাকি সেক্স শুরু হয়। ভাব তো একবার কী কাণ্ড!
তুমি রাজি হয়োনা মাসি।
এখনও হইনি। তা ছাড়া এখন ছাত্র-ছাত্রীদের নিতেও চাইছে না আমেরিকা। সুব্রত খুব চেষ্টা করছে অবশ্য। আসল কথাটা হল, ছমাস তো আমি থাকব না, তাই এই কদিন একটু মেলামেশা করে নেবো সকলের সঙ্গে।
তুমি না থাকলে ছমাস যে আমারই কি করে কাটবে! খুব খারাপ লাগবে আমার।
কেন, চাকরি তো করছি। ব্যস্ত থাকবি।
ছাই। আজ জয়েন করে মন এত খারাপ হয়ে গেল!
কেন রে? ওরা ভাল নয়।
একদম বাজে।
তা হলে ছেড়ে দে।
দিয়ে? কিছু তো করতে হবে।
আচ্ছা মুশকিল। করতেই হবে কেন? ভাল না লাগলে ছেড়ে দিবি।
অত সোজা নয় মাসি। বাড়িতে আমার প্রেস্টিজ বলে কিছু আর থাকবে না।
আচ্ছা, তুই কাল সবাইকে নিয়ে আয় তো। দেখা যাবে।
কী দেখবে মাসি।
কিছু একটা করতেই হবে তার জন্য। আচ্ছা, আমার পি.সি-তেই তো তুই এক্সপিরিয়েন্স গ্যাদার করতে পারিস। চাকরির কী দরকার?
একা একা হয় না মাসি। দেখানোর লোক চাই। আমি এমন কিছু বেশি তো শিখিনি।
আচ্ছা, আয়। আমি সুব্রতর সঙ্গে কথা বলছি।
আবার আমার জন্য ওঁকে কেন জ্বালাতন করবে?
করব, আমার ইচ্ছে। ও হয়তো ইচ্ছে করলে পারে।
একজনকে তো যথেষ্ট জ্বালাতন করেছে। আবার আর একজনকে কেন?
কাকে জ্বালাতন করেছি। হেমাঙ্গর কথা বলছিস? ও একদম কোনও কাজের নয়। এখন তো বলছে কাজকর্ম সব বন্ধ করে পৃথিবীকে দূষণমুক্ত করার কাজে লাগবে।
সে কী? এটা কবে থেকে?
কৃষ্ণজীবনবাবুর একটা বই বেরিয়েছে জানিস।
জানি তো।
সেটা পড়ে ওর মাথা গরম হয়েছে। একদম পাগল।
জোর করে একটা বিয়ে দিয়ে দাও। পাগলামি সেরে যাবে।
বিয়ের কথা আর বলিস না। রশ্মিকে নিয়ে কী বিশ্রী কাণ্ড করল বল তো। অত ভাল মেয়েটা।
