বীণা মুখটা চুপ করে বলে, হা মা, দাদা আজ অনেক বড়, আমাদের নাগালের বাইরে। দাদা বলে ভাবতেও ভয় করে। পরিচয় দিলে লোকে বিশ্বাস করে না।
বীণা ধীর পায়ে ঘরে এল। কাপড় ছাড়ল। তারপর শুয়ে রইল একটু চুপচাপ। কী করবে সে এখন? কী করা উচিত। শাশুড়ির মরার খবরটা পেয়ে অবধি তার মৃদু একটা অস্বস্তি হচ্ছে। মন থেকে তাড়াতে পারছে না অস্বস্তিটাকে।
বাবা কোথায় গিয়েছিল। গরমে ঘেমে ফিরে এসে তাকে দেখে বলল, কখন এলি?
একটু আগে। তোমরা বেশ সুখে আছো, না বাবা? পাকা বাড়িতে থাকবে।
বিষ্ণুপদ জামাটা ছেড়ে রেখে বসল। তারপর বলল, সংসারে সুখ বড় একটা নির্ভেজাল হয় না। তারমধ্যেও কত চোরা টান, কত শত্ৰুতা থাকে। বামা তো শুনছি আইন আদালত করবে। বাড়ির কাজ না বন্ধ হয়ে যায়।
কেন, বাড়ি হলে মেজদার ক্ষতি কী?
সেটা সে-ই জানে। গত রোববার সে বড় বউমাকে নিয়ে এসেছিল। বড় বউমা এসে মিষ্টি মিষ্টি করে অনেক কথা শুনিয়ে গেল। মনটা তাই ভাল নয়।
বউদি কথা শুনিয়ে গেল? কেন বাবা?
বিষ্ণুপদ অসহায় ভাবে ডাইনে বায়ে মাথা নেড়ে বলে, সে সব বুঝবার মতো মাথা কি আমার আছে? তোর মাও বোকা মানুষ।
কী বলছিল?
সে শিক্ষিতা মেয়ে, পাপষ্টি তো ঝগড়া করে না। নানারকম কথা বলল। ইংরেজিতেও অনেক কথা। সব কি বুঝি? তবে জানিয়ে গেল এ কাজটা ভাল হচ্ছে না।
এ বাড়িতে এল, ভাতটাত খেয়েছে তো?
না। খেয়ে এসেছিল। চা-টুকু খেয়েছিল। সেটাই ভাগ্যি। তবে তার দোষ নেই। কৃষ্ণ খরচটাও তো কম করছে না। বউমার সেটা ভাল না লাগতে পারে। আমি সেই থেকে ভাবছি, এ বাড়ি কি আনন্দের বাড়ি হবে? বামা ক্ষেপে আছে, বড় বউমা খুশি নয়, এই দালানে থাকতে কাটা কাটা লাগবে না একটু?
তা কেন বাবা? টাকা তো বউদির নয়, দাদার।
হা কৃষ্ণ পরদিন এসে সে কথাই বলল। বউমা যে কথা শোনাতে আসবে তা জানা ছিল তার। তাই পরদিনই এসে হাজির। আমাদের মন খারাপ দেখে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে গেল। তোর মুখটা অমন শুকনো কেন বল তো?
রোদে এলাম তো! তাই হবে।
বীণা বারবার আনমনা হয়ে যাচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছে। অশৌচ! হঠাৎ হঠাৎ মনে হচ্ছে, পালপাড়া। মাঝে মাঝে বুকটা ধক করে উঠছে।
খাওয়ার সময় সে ইচ্ছে করেই জিজ্ঞেস করল, মাছ নেই মা?
নয়নতারা বলল, মাছ তো বোজ আসে না। মাঝে মাঝে। তাও এখন ঘর ভাঙাঙির গণ্ডগোলে আমাদের খাওয়াদাওয়া সব মাথায় উঠেছে।
রাঙা বলল, আজ রাতে তোমাকে ভাল মাছ খাওয়াবো।
রাতে! বলে একটু থমকাল বীণা। তারপর বলল, আজ রাতে আমি থাকব না তো!
ওমা! কেন? গোপাল যে তোমাকে দেখে কত লাফালাফি করল! পটল তো বলছে, সাতদিন রেখে দেবে তোমায়।
না বউদি। আজ যেতে হবে।
এত অল্প সময়ের জন্য কেউ আসে?
পরে এসে থাকব। দালানও উঠে যাবে ততদিনে। কী বলো?
০৮৬. গ্যারেজের ওপর একখানা ঘর
গ্যারেজের ওপর একখানা ঘর, কাঠের পার্টিশন করা। সামনে রিসেপশন। ভিতরের ঘরে দুটো কম্পিউটার। এই ঘরেই একটা এয়ারকুলার চলে। ঝুমকির নতুন অফিস। মাইনে তিনশো টাকা। কনফার্মড হলে বানরাশ হওয়ার প্রতিশ্রুতি আছে। কিন্তু অফিসে প্রথম দিনেই ঝুমকি বুঝতে পারছিল, প্রতিশ্রুতি বোধহয় শেষ অবধি রক্ষা করবে না এরা। কারণ একটা লোগা মেয়ে বাসবী তাকে চুপি চুপি বলল, আমি দু বছর আছি। মোটে চারশ টাকা পাই।
তবে আছে কেন?
এক্সপিরিয়েন্স গ্যাদার করছি। কিছুদিনের মধ্যেই চাকরি পেয়ে যাবো।
পার্মানেন্ট হওনি এখনও।
ওটা হচ্ছে খুড়োর কল। পার্মানেন্টও হব না, মাইনেও বারোশ টাকায় পৌঁছবে না। দরকার কি বলো? তিনশচারশতেই তো আমাদের মতো ছেলেমেয়েদের পেয়ে যাচ্ছে। চলে গেলে সঙ্গে সঙ্গে অন্য একজন ঢুকে পড়ছে। চাকরির বাজার তো জানো।
তুমি চারশতেই দু বছর আছো?
আছি। টাকার দরকার ছিল, তাই খুব খাটতম প্রথম প্রথম। ভাবতাম বুঝি কাজ দেখে খুশি হয়ে তাড়াতাড়ি পার্মানেন্ট করে দেবে। শেষে দেখলাম, খেটেই মরছি, এদের গা নেই।
এক্সপিরিয়েন্স হয়েছে?
কিছুটা। সব সময়ে তো আর মেশিন অপারেট করতে দেয় না, রিসেপশনে বসিয়ে রাখে বা অন্য সব অফিসে লেগ ওয়ার্ক করতে পাঠায়। ছাত্র-ছাত্রীও তো বেশি হয় না। তিনটে শিফটে মেরেকেটে জনা পনেরো। জায়গাও তো নেই।
একটু দমে গেল ঝুমকি। এই চাকরির জন্য সে বাবার সঙ্গে কত ঝগড়া করেছে। বাবা কিছুতেই তাকে চাকরি করতে দিতে চায়নি। সেও করবেই। তাও মাইনের কথা বাবা জানে না। জানলে বোধহয় বাবার আবার হার্ট অ্যাটাক হবে।
কে যে মালিক তা বোঝা মুশকিল। একজন চটপটে স্মার্ট ছোকরা তার ইন্টারভিউ নিয়েছিল। কিন্তু তাকে দেখতে পাচ্ছে না। একজন পেটমোটা যুবক বসে আছে সামনের ঘরে। হেলাফেলার ভাব। তাকে দেখে নড়লও না। জয়েন করতে এসেছে শুনে বলল, বৈঠ যাইয়ে।
পরে কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী এল, তাদের মধ্যে দুজন বেশ বয়স্ক লোকও আছে। কিছুটা শেখাল তাদের বাসবী। প্রথম দিন ঝুমকিকে মেশিন দেওয়া হল না। মেশিনে ছিল আর দুজন পুরুষ ট্রেনার। একজনের নাম শুভ, অন্যজন দেবদত্ত। দেবদত্ত গোমড়ামুখখা, কথা-টথা বলে না। শুভ আলাপী না হলেও কথা-টথা বলল। জিজ্ঞেস করল, আপনি কি নীডি?
হ্যাঁ, অবশ্যই।
তা হলে এখানে সুবিধে নেই। অবশ্য আপনাকে দেখে নীডি মনে হয় না।
কেন বলুন তো!
এই তো মুশকিলে ফেললেন। চেহারা-টেহারা দেখে আন্দাজ করছি।
ঝুমকি একটু হাসল। বলল, আমার নীডটা আর কদিন পরেই দেখা দেবে। আপনাকেও কি এরা কম মাইনে দেয়।
