মানে! মারা গেছে নাকি?
হ্যাঁ, চার পাঁচদিন হল। খবরটা তোমাকে দিতে বলছিল।
বীণা একটু স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। শাশুড়ি! হা, এখনও তো সম্পর্কটা সামাজিকভাবে আছে। কী করবে সে? তার কি কিছু করা উচিত?
কুসুম তার দিকে চেয়েছিল। খবরটা শুনে তার কী প্রতিক্রিয়া হয়, সেটাই দেখছে বোধ হয়।
বীণা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, কি করে হল?
তাতো জানি না। নিমাইদাদা নাকি উত্তম কুস্তম কান্নাকাটি করছে। জল অবধি খাচ্ছে না। ভীষণ অবস্থা। মাকে বড় ভালবাসত, তাই না?
বাসত। খুবই বাসত। নিমাইয়ের কাছে মা-বাপ ছিল দেবতার মতো। বিয়ে হয়ে এসে বীণা অনেক অভাবের কষ্ট সয়েছে, কিন্তু শাশুড়ির মুখনাড়া খায়নি কখনও। বড় নিরীহ মানুষ, বড় বোকাসোকা। অনেকটা তার মায়ের মতোই। আরও নিরীহ। আরও বোকা।
খবরটা কি তোর নিমাইদাদাই দিতে বলেছে আমাকে?
কুসুম একটু ইতস্তত করে বলল, না। তোমাকে সে খবর দিতে বলেনি।
ঠিক জানিস?
কুসুম আবার একটু চুপ করে থেকে বলল, কি জানি বাবা, তোমাকে বলা উচিত হবে কিনা। তুমি যা নিমাইদাদার ওপর রেগে যাও।
কী গোপন করছিস বল তো? এমন কী কথা!
আমার জামাইবাবু তো নিমাইদাদার সঙ্গেই পালপাড়া গিয়েছিল। নিমাইদাদা তাকে বলেছে, খবরটা বীণা যেন না পায়, দেখো। তার সুখের জীবন, এসব খবরে তার আনন্দ মাটি হবে। আমরা তো তার কাছে মুছে গেছি, এ খবরে তার আর দরকার নেই।
বীণা একটু জ্বলে উঠল, বলেছে! তাহলে খবরটা আমাকে দিলি কেন?
কুসুম কাচুমাচু হয়ে বলে, জামাইববু বলল নিমাইদাদা ঠিক কথা বলেনি। শাশুড়ি মরলে তো তোমার অশৌচ হয়। খবরটা না দিলে পাপ হবে।
অশৌচ!
হ্যাঁ, সেটাও তোমাকে বলে দিতে হবে নাকি?
বীণা দাঁতে দাঁত পিষে বলে, অশৌচ হবে কেন? সম্পর্কই যেখানে নেই, সেখানে অশৌচ হবে কেন?
তুমি মানবে না অশৌচ?
কেন মানব?
কুসুম এ জবাবে খুশি হল না। বলল, না মানলে মেনন না। তবে অশৌচ কিন্তু হয়।
বীণা স্তব্ধ হয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, ওসব আমি মানি না। আমার কেউ নেই।
কুসুম খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, অন্তত নিরামিষটা তো খেতে পারো। চুলে তেল-টেল না দিলেই হল।
বীণা একটা শ্বাস ফেলে বলে, তোদের অনেক সংস্কার।
কুসুম মুখটা শুকনো করে বলে, তা যাই বলো, এসব মানতে হয়।
সাহেবরা তো অশৌচ মানে না, তাদের কোন ক্ষতিটা হয়েছে শুনি? দুনিয়াটা তো তারাই চালাচ্ছে। আমরা এত মানছি, তাতে কোন হাত পা গজিয়েছে আমাদের! ধুঁকছি।
কুসুম একটু অবাক হয়ে বলে, সাহেবদের কথা ভেবে কী হবে? তারা আলাদা মানুষ। আমরা তাদের মতো নই। তুমি কেন রেগে যাও বীণাদি? নিমাইদাদা কাছে থাকলে তুমিও কিন্তু মানতে। যাকগে বাবা, যা ভাল বোঝে করো। আমি আর কিছু বলব না।
আমি যাচ্ছি কুসুম। তুই ঘরদোর দেখে রাখিস।
এসো গিয়ে।
বীণা উঠল।
কুসুম হঠাৎ বলল, শোনো, এ খবর শুনলে স্নান করতে হয়।
বীণা বলল, না করে দেখিই না কী হয়।
বীণা শাড়ি পাল্টাল, মুখে একটু পাউডার দিল, সামান্য লিপস্টিক ছোঁয়াল। পাঁচ হাজার টাকা-ভরা ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। খুব তীক্ষ্ণ চোখে আগাগোড়া লক্ষ করল তাকে কুসুম। কুসুম খুশি হচ্ছে না। কুসুম তাকে সমর্থন করছে না।
বীণা বাস স্ট্যান্ডে এসে দুপুরের রোদে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার কান্না পাচ্ছে না, কিন্তু কে জানে কেন মনটা খারাপ লাগছে একটু।
বিষ্টুপুরে যখন পৌঁছলো তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে সে অবাক হয়ে থমকে দাঁড়াল। এ কাদের বাড়ি? সে কি ভুল বাড়িতে ঢুকছে? মা-বাবার ঘরখানা লোপাট। চারদিকে ইট কাঠ টিন স্কুপাকার ছড়ানো। অনেকগুলো মিস্তিরি গোছের লোক ধ্বংসস্তুপের ভিতরে কি সব করছে।
সে ভেঁচিয়ে ডেকে উঠল, মা!
নয়নতারা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে একগাল হেসে বলে, ওমা, তুই এসেছিস? আয়, দ্যাখ কী সব কাণ্ড হচ্ছে।
কী কাণ্ড মা?
কৃষ্ণ আমাদের বাড়ি করে দিচ্ছে যে!
দাদা বাড়ি করে দিচ্ছে। কই আমাকে খবর দাওনি তো!
বড্ড তাড়াতাড়ি সব হয়ে গেল কিনা! আমরা বামার ঘরটায় আছি। যা, গিয়ে ও ঘরে কাপড়-টাপড় ছাড়।
মেজদা নেই?
না। সে চলে গেছে। অনেক কথা। পরে শুনিস।
বীণা অবাক চোখে ভাঙা ঘরের জায়গাটা দেখছিল। ফাঁকা ন্যাড়া অদ্ভুত দেখাচ্ছে। জন্ম থেকেই দেখে-আসা চেনা জায়গাটা কেমন হবে এবার।
কত বড় বাড়ি হবে মা?
ওরে সে মন্ত বাড়ি হবে শুনছি। তিনতলা। বড় বড় ঘর হবে, বারান্দা হবে, দরদালান হবে, বাথরুম হবে, ঠাকুরঘর হবে, কল লাগানো হবে, পাম্প বসবে কুয়োয়।
বলো কী! দাদা এত করবে?
করছে তো।
বীণার মনটা ভিজে গেল। মা-বাবাকে সে চিরকাল কষ্ট করতেই দেখে এসেছে। এত সুখ সইবে তো!
বীণা একটা শ্বাস ফেলে বলল, যাক, তাহলে দাদার এতদিনে সুমতি হল।
ওকথা কেন বলছিস? কৃষ্ণর কি কখনও কুমতি ছিল! ওই খাণ্ডার বউয়ের পাল্লায় পড়ে অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কৃষ্ণর মনটা তো আমি জানি। কষ্ট করে মানুষ হয়েছে, সেই কষ্ট তোরাও করিনি। দুঃখীর ছেলে বলেই সে বরাবর আমাদের দুঃখ বুঝত। কিছু করতে পারত না, তা সেটা তার দোষ নয়।
তুমি তো বরাবর দাদার পক্ষে মা, দাদার এতটুকু নিন্দে সইতে পারে না।
নয়নতারা অহংকারে উজ্জ্বল মুখে বলে, আমার কথার কী দাম বল? কিন্তু আজ যে দুনিয়াসুদ্ধ লোক আমার কৃষ্ণর নামে জয়জোকার দিচ্ছে। দেখতে পাস না আমার কৃষ্ণ কিরকম মাথা-উঁচু মানুষ। আমি কি এমনি এমনি পক্ষ নিই?
