না গো, আমার কি ঠাকুর দেবতার কথা মনে থাকে? সারাদিন যাত্রাপালা নিয়ে ভাবছি।
ঠাকুর দেবতার কথাও বোধহয় একটু ভাবা ভাল।
টাকার কথা কি গোপন রাখব সকলের কাছে?
হ্যাঁ, খুব গোপন রেখে।
আমিও তাই ভাবছিলাম। আমাকে হঠাৎ এত টাকা বকশিশ দিয়েছো জানতে পারলে সবাই তোমাকে ছিঁড়ে খাবে।
বকশিশ! ছিঃ, কী যে বলো বীণা। ওটা বকশিশ হবে কেন? বরং ভগবানের আশীর্বাদ বলে জেনো।
তোমাকে আজ ভগবানে পেয়েছে গো।
কাকা ম্লান হেসে বলে, ভগবানে পাওয়া ভাল। ভূতে পাওয়া ভাল নয়।
বীণা একটু স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার মনের মধ্যে নানা আবেগ, নানা ঢেউ। এই পাঁচ হাজার টাকাকে সে সহজভাবে নিতে পারছে না। কত কী মনে হচ্ছে।
আচ্ছা কাকা, তুমি কি একটা কথা জানো?
কী কথা?
কোরাকাঠিতে পালার পর তুমি আমাকে আংটি দিয়েছিলে, মনে আছে?
কেন থাকবে না? খুব মনে আছে। আংটি তুমি নাওনি।
কিন্তু সেই ঘটনা থেকে কী রটেছিল জানো?
কাকা ফের ম্লান একটু হেসে বলল, জানি বীণা। মানুষ তোমাকে আর আমাকে জড়িয়ে গল্প ফেঁদেছিল। হঠাৎ কথাটা তুললে কেন? পাঁচ হাজার টাকা দিলাম বলে কোনও সন্দেহ করছ নাকি?
বীণা জিব কেটে বলে, ছিঃ ছিঃ, তুমি দেবতার মতো মানুষ। কোনওদিন পাপচক্ষুতে আমার দিকে তাকাওনি পর্যন্ত। পুরুষের চোখ তো আমি চিনি।
কাকা হাসল, চেনো? সত্যিই চেনো?
খুব চিনি কাকা।
কাকা একটু চিন্তিত হয়ে বলল, তোমার সঙ্গে ছিল একজন ভারী ডাল লোক। নিমাই। তাকে চিনেছিলে?
বীণা অবাক হয়ে বলল, হঠাৎ তার কথা কেন কাকা?
কাকা মাথা নেড়ে বলে, কি জানি কেন, নিমাইয়ের কথা আমার খুব মনে হয়।
ওর কথা ভাবলে তো আমার গা জ্বালা করে।
তা অনেকবার বলেছো। দোষঘাট ছিল না বলছি না, কিন্তু লোকটা তো সাচ্চা।
সাচ্চা ধুয়ে কি জল খাবো? অপদার্থ।
কাকা একটু হেসে বলল, নিমাইয়ের কোনও খোঁজ রাখো?
জানি। কাঁচরাপাড়ায় দোকান দিয়েছে। সে দোকান নাকি ভালই চলে। ভাল থাকুক, আমার তাতে কী?
সে তো বটেই। তবে তার হিল্পে হয়েছে শুনে আমার কিন্তু মনটা ভাল লাগে। কলিযুগে ওসব লোকের তো কোনও দাম নেই। কিন্তু তবু নিমাই যে নিজের জোরে সততা বজায় রেখে টিকে আছে এটা কিন্তু আমাদের মতো পাপী-তাপীদের কাছেও ভরসার কথা। চন্দ্ৰ সূৰ্য কাদের জন্য ওঠে জানো? ওইসব মানুষের জন্য, তাদের ভাগ্যে আমরাও চন্দ্ৰ সূর্যের ভাগ পাই। নইলে পেতাম না।
বড় যে গদ্গদ ভাব দেখছি তোমার।
লোকটাকে ফিরিয়ে নিতে পারোনা বীণা?
তোমার কি মাথা খারাপ হল?
কাকা একটু চুপ করে রইল বিমর্ষ ভাবে। তারপর বলল, সজল কী বলছে?
বীণা ভ্ৰূকুটি করে বলে, কী বলবে?
কোনও প্রস্তাব করেনি?
ও আমাকে বিয়ে করতে চায়।
আর তুমি?
বীণা খিলখিল করে হেসে বলে, দুদিন রোসো। পুরুষ মানুষের প্রেম হঠাৎ উথলে ওঠে, আবার মিইয়ে যায়।
ওটা কথা হল না বীণা। সজল ভাল ছেলে, অনেক গুণ। তাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারা কি সহজ কাজ। শুনেছি ও নাকি নিমাইয়ের কাছে গিয়েছিল।
কে বলল তোমাকে?
জানি।
বীণা ভ্রূকুটি করে বলে, সেটাই বা কোন অপরাধ হয়েছে?
কাকা মাথা নেড়ে বলল, ওর অপরাধ নয়। তোমারও অপরাধ নয়। ভাবছি, নিমাই ব্যাপারটা টের পেল কিনা!
পেলে পাবে। অত ভয় কিসের? শোনো কাকা, আমার জীবনটা আমারই। এটা কাউকে দাসখৎ লিখে দানপত্র করে দিইনি। একবার বিয়ে হয়েছিল বলে যে চিরদিনের জন্য এক খোটায় বাধা থাকতে হবে, তেমন নিয়ম আমি মানি না।
কাকা তার দিকে চেয়ে হাসছিল, বলল, তোমার নেত্রী হওয়া উচিত ছিল। বেশ গুছিয়ে বলতে পারে বটে। কিন্তু আমাদের জীবনটা তো গোছানো নয় বীণাপাণি। সব বেগোছ। যাকগে, আমাকে আবার শত্ৰু মনে কোরো না।
বীণাপাণি একটু গোঁজ হয়ে থেকে বলল, কেন যে তোমরা সবাই ওই লোকটার পক্ষ নাও, তা বুঝি না।
কাকা অবাক হয়ে বলে, কে পক্ষ নিয়েছে? আমি মমাটেই নিমাইয়ের পক্ষ নিইনি। নিমাইয়ের কথা খুব মনে হয়, সে কথাই বলছিলাম।
জানি গো জানি।
পাঁচ হাজার টাকা ভ্যানিটি ব্যাগে ভরে নিয়ে যখন বাড়ি ফিরে এল বীণাপাণি তখন তার মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন, অনেক দোলাচল। সে বোকা নয়। কাকা হঠাৎ তাকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে ফেলল কেন সেইটে নিয়ে সে আগাপাশতলা ভেবে দেখতে লাগল। এ টাকা কি তার কোনও ভাবে পাওনা হয়? টাকাটা দিতে অনেক ভূমিকা করে নিয়েছিল কাকা। কাল রিহার্সালের পর বলল, আগামী কাল সকাল দশটার সময় আমার কাছে একবার এসো বীণা। কথা আছে। ওই সময়টায় আমি একটু ফাঁকা থাকি। খুবই কঁকা ছিল কাকা। দরজা বন্ধ করো টাকাটা দিল। বীণা বুঝতে পারছে না, হঠাৎ এত বদান্যতা কেন! দুখের দিনে কাকা তার জন্য অনেক করেছে। এখনও যাত্রার জন্য, হিসেব রাখার জন্য দুটো খাতে কাকা তাকে মাসে হাজার টাকার ওপরেই দেয়। সেও অনেক টাকা। তবে আবার বাড়তি পাঁচ হাজার দিল কেন?
কুসুম আজকাল রোজই আসে। রান্না করে, ঘরের কাজ করে দিয়ে যায়। এমনি করে। কুসুম তো তার কাজের মেয়ে নয়। ভালবেসে করে। আজ কুসুম আসতেই বীণা বলল, হা রে, আজ একবার বিষ্টুপুর যাব ভাবছি। রাতটা থেকে আসবো। তুই আমার বাড়ি পাহারা দিবি আজ?
কুসুম ঘাড় নেড়ে বলে, দেশে! যাও না। মা-বাবাকে দেখে এসে গিয়ে। অনেকদিন তো যাওনি।
বীণা গড়িমসি করে উঠতে যাচ্ছিল, কুসুম হঠাৎ বলল, একটা খবর আছে বীণাদি।
কী খবর?
আমার কাঁচরাপাড়ার জামাইবাবু এসেছে। বলল, পালপাড়ায় তোমার শাশুড়ি ঠাকরুন গত হয়েছে।
