তুমি দায়ী? তুমি কেন দায়ী হবে?
কৃষ্ণজীবন দুহাতে মুখ ঢাকা দিল। তারপর অস্ফুট একটা গোঙানির শব্দ করে মাথা নেড়ে বলল, আজ আর কিছু বোলো না রিয়া। আর বোলো না।
আমি কিছু বলতে চাইও না। আমি শুধু চাই, বাড়িটা তুমি করবে না। শুনেছি ইট আর সিমেন্ট কেনা হয়ে গেছে। গেছে যাক। এবার ওরা যা করার করুক। তুমি আর একটা পয়সা দিতে পারবে না। পয়সা তোমার এল কোত্থেকে?
কৃষ্ণজীবন মুখ ঢেকে রেখেই বলল, শোনো রিয়া, এটা আমার প্রায়শ্চিত্ত। আমার যে কাজ করা উচিত ছিল তা আমি করিনি। আমি টেনে তুলিনি আমার ভাইবোনদের। তারা নষ্ট হয়ে গেছে অবস্থার চাপে। আমি পারতাম, করিনি। এখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে।
আমি তা মানি না। তুমি ওদের জন্য কী করতে?
কৃষ্ণজীবন মুখের ঢাকাটা খুলল না বলে ভৌতিক শোনাল তার গলা, তুমি জানো না রিয়া, আমার ভাইবোনরা কতটা আমার মুখাপেক্ষী হয়ে ছিল। কতটা আশাভরসা করত। বামা, রেমো, বীণা, সরস্বতী এরা তো কেউ খারাপ ছিল না। কেউ না। আমি মন দিলেই, চেষ্টা করলেই ওদের দাড় করাতে পারতাম। চেষ্টাই করলাম না। বিয়ে করে আলাদা হয়ে এলাম।
দোষটা কি বিয়ের? তার মানে কি আমাকেই ইনডাইরেক্টলি দায়ী করতে চাও? ভুলে যেও না, ওরা তোমাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল।
মাথা নেড়ে কৃষ্ণজীবন বলল, তুমি বুঝবে না, ওই তাড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে রাগ নয়, ছিল অভিমান। বড় ভেঙে পড়েছিল ওরা।
আহা, কী কথা! একটা মানুষ চলে এল বলে সংসারের বাকি সবাই নষ্ট হয়ে যাবে? তুমি কি কল্কি অবতার নাকি?
না। তবে ওদের কাছে আমি যে কতটা সেটা কি তুমি বুঝতে পারবে?
বুঝবার দরকার নেই। তুমিও বোঝোনি। তোমার মাথায় ওরা কাঁঠাল ভাঙছে। তোমার বোধ বুদ্ধি নেই বলেই গলা বাড়িয়ে দিচ্ছি। কত টাকা দিয়েছ বলো তো! টাকাটা এল কোথা থেকে?
টাকাটা আমেরিকা থেকে এসেছে। বইয়ের রয়্যালটি।
সে কি অনেক টাকা! কই আমাকে তো বলোনি?
কৃষ্ণজীবন কী বলবে ভেবে পেল না। এ কথা সত্যি যে পাবলিশারের দেওয়া বেশ কয়েক লক্ষ টাকার কথা সে রিয়ার কাছে প্ৰকাশ করেনি। জানে, রিয়া জানতে পারলেই টাকাটার ওপর একটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে। কিছু টাকা হিসেবের বাইরে রাখা দরকার ছিল।
কত টাকা পেয়েছ?
আপাতত পনেরো লাখ। তার মধ্যে ইনকাম ট্যাক্স যাবে।
বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রিয়া বলল, পনেরো লাখ? অথচ আমাকে বলোনি!
বলতাম। একটু সময় নিচ্ছিলাম।
কবে থেকে গোপন করা শিখলে?
কৃষ্ণজীবন এ কথারও জবাব জানে না। মুখ ঢেকে সে বসে রইল চুপ করে।
রিয়া অবিশ্বাসের গলায় আপনমনে কয়েকবার আওড়াল, পনেরো লাখ! প-নে-রো লা-খ!
জীবন একা শ্বাস ফেলে বলল, টাকাটা একটু আন এক্সপেক্টেড। তাই মা-বাবার জন্য বাড়িটা করে দিচ্ছি রিয়া।
রিয়া শক্ত হয়ে বলল, না। শুধু একটা ঘর পাকা করে দিতে পারো। আর কিছু নয়। রবিবার আমি বিষ্টুপুর যাচ্ছি। কৃষ্ণজীবন চমকে ওঠে, বিষ্টুপুর যাচ্ছ?
হ্যাঁ। তাদের একটু শিক্ষা হওয়ার দরকার।
» ০৮৫. বীণা এত অবাক হল
বীণা এত অবাক হল যে, প্রথমটায় মনে করল স্বপ্ন দেখছে। তারপর অবিশ্বাসের গলায় বলল, পাঁচ হাজার টাকা? এত টাকা আমাকে দিচ্ছে কেন গো কাকা? s
কাকা শান্ত গলায় বলল, দিচ্ছি, রেখে দাও। তোমাকে তো খুব বেশী কিছু দিতে পারি না। তোমার গুণের কদর হল কই?
তা বলে হঠাৎ এত টাকা! এ তো অনেক টাকা গো!
বীণা, মানুষ আর কতটুকু দিতে পারে? দেনেওয়ালা ভগবান। তাঁর দান হিসেবেই নাও।
বীণা অবাক হয়ে বলল, আবার জল ঘোলা করলে যে—তুমি দিচ্ছে, না ভগবান দিচ্ছে?
কাকা একটু শুকনো হেসে বলল, ভগবানই দিচ্ছে বীণা।
এটা কিসের টাকা? বোনাস?
তাই ধরে নাও।
বোনাস হলে তো সবাই পাবে।
তার কোনও মানে নেই। আমি বলি কি, টাকা ডবল করার অনেক কিম হয়েছে আজকাল, সেরকমই একটা স্কিমে টাকাটা ফেলে রাখো। খরচ কোর না।
উদাস গলায় বীণা বলে, আমার আর খরচ কি? দু মুঠো খাওয়া আর পরনের কাপড়। ফুর্তি তো আর করব না। কী ইচ্ছে করছে জানো? আমার মা-বাবা তো গরিব, এ টাকা থেকে তাদের কিছু দিই।
সেতো ভাল কথা। তাই দাও।
বীণা একটু ভাবল। না, সেটা ভাল হবে না। তার ডলার আর পাউন্ডের কথা বাবা জানে। বাবা হয়তো সন্দেহ করবে এটা সেই ডলার বেচা টাকা। বাবার অ্যাটাং নেই, কিন্তু ঠ্যাটাং আছে। ঊাকে পয়সা নেই, ওদিকে যুধিষ্ঠির। নিমাইয়েব সঙ্গে খুব স্বভাবের মিল। আর সেইজন্যই বোধ হয় হাড় হাভাতে সচ্চরিত্রটাকে ধরে এনে গলায় ঝুলিয়ে দিল তার। না, বীণা এক পয়সাও দেবে না বাবাকে।
কী ভাবছো বীণা? পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে ভাবছো? এ বাজারে ও টাকার আর কী-ই বা দাম বলো! অত ভেবো না।
আমার কাছে এ অনেক টাকা কাকা। কেন দিলে বলবে না? যা বলছে তা যেন আলগা-আলগা কথা। তোমার মুখটা বড় গম্ভীরও।
না বীণা, মুখ গম্ভীর হবে কেন? এই তো হাসছি।
বীণা হঠাৎ একটু ধরা গলায় বলল, টাকা-টাকা করে আমাদের জীবনটা কিভাবে কাটে বলো তো? কটা টাকার জন্য আমাদের কত হা-পিত্যেশ! এই যে এত টাকা হাতে এল, আমার এত আনন্দ হচ্ছে, কিন্তু কী যে করব টাকা দিয়ে তাই ঠিক করতে পারছি না। মাথাটা গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।
বাড়ি যাও বীণা। ওই টাকাটা থেকে পাঁচ টাকার একটা পুজো দিও।
পুজো দেবো? কিসের পুজো?
আমি তার কী জানি। পুজোআচ্চা তো মেয়েরাই করে। তোমার কোনও ঠাকুর নেই? লক্ষ্মী হোক সরস্বতী হোক, কালী বা শিব হোক?
