উরিব্বাস! আমেরিকা!
এখনও ঠিক হয়নি। তোমার দাদা তো দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চান না। কিন্তু ও সব দেশে না গেলে উন্নতিই বা করবে কি করে!
আরও উন্নতি? দাদা তো শুনি এখন একজন মস্ত মানুষ।
হওয়ার কি শেষ আছে? তোমার দাদার যা কোয়ালিফিকেশন, যা ক্ষমতা তার কতটুকু দাম এ দেশে পায় বলো? সাহেবরা খাতির করে বলেই যা দাম।
এ সব উঁচু উঁচু কথার খেই ধরতে পারে না বামাচরণ। সবেগে মাথা নেড়ে বলে, তা বটে। আমেরিকা গেলে এ ফ্ল্যাটটা কি করবে?
কি করব মানে? আমরা তো পার্মানেন্টলি যাচ্ছি না। কয়েক বছরের জন্য। এই ফ্ল্যাট থাকবে।
যেন একটু হতাশ হয়ে বামাচরণ বলল, অ।
গরম পরোটা আর তরকারি এসে যাওয়ার পর লোভীর মতো ক্ষুধার্ত বামাচরণ বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে খেতে লাগল। খাওয়ার মধ্যেও কোনও কালচারের প্রকাশ নেই। হাপুস হুপুস শব্দ করছে। খাওয়ার আগে নোংরা হাতটা ধুয়েও নিল না। ঘেন্নায় মুখ কোঁচকাল রিয়া।
খেয়েদেয়ে উঠে পড়ল বামাচরণ, আজ তা হলে আসি বিউদি।
এসো।
সামনের রবিবার আমি সকালের দিকেই চলে আসবো।
ঠিক আছে।
আবার একটা প্ৰণাম করে বামাচরণ চলে গেল। রিয়া দরজাটা বন্ধ করার আগে দেখল, বামাচরণ লিফটের চেষ্টা করল না। সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রিয়া। এই একটা আনকালচার্ড, গেয়ো অসভ্য পরিবারের সঙ্গে তার আত্মীয়তার সম্পর্কটাই তার জীবনের একটা কলঙ্ক হয়ে থাকবে চিরকাল।
ঘরে এসে আর একবার শুলো বটে রিয়া, কিন্তু বিশ্রামটা আর হল না। মন অস্থির, উত্তেজিত থাকলে শরীরের বিশ্রামও হতে চায় না।
রাত দশটার পর কৃষ্ণজীবন ফিরে এল। হাতে মস্ত ফুলের বোকে। রিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ধরে।
রিয়া ফুলটা নিয়ে ক্যাবিনেটের অভ্যস্ত জায়গায় রাখল। রাখতে রাখতে তার মনে হল, কৃষ্ণজীবনের বয়স কত হল? এ বাড়িতে কৃষ্ণজীবনের জন্মদিন পালন করার রেওয়াজ নেই। ছেলেমেয়েদের একটু শখ হয় বটে, কিন্তু কৃষ্ণজীবন তাতে জল ঢেলে দেয়। রিয়ার হিসেব থাকে না, কিন্তু আন্দাজ পয়তাল্লিশ ছাড়িয়ে গেছে। তবু আদ্যন্ত যুবক চেহারার অক্লান্ত এই মানুষটির নাগাল বয়স বা সময় আজও পায়নি। সারা দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেও দিনান্তে সে যখন ফেরে তখন কোনওদিনই তাকে শ্ৰান্ত-ক্লান্ত মনে হয় না। কোন ধাতুতে গড়া ও?
রাতের খাওয়া-দাওয়া পর্যন্ত নির্বিঘ্নে পার হতে দিল রিয়া। দোলনকে ঘুম পাড়োল। বড় দুই ছেলেমেয়ে নিজেদের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ কৃষ্ণজীবনের ঘরে হানা দিল রিয়া। কৃষ্ণজীবন রাত জেগে রোজই কাজ করে। পড়ে, লেখে। মার্কিন দেশ থেকে তার আরও একটা বই বেরোনোর প্রস্তুতি চলছে।
শোনো, তোমার সঙ্গে কথা আছে।
ভীষণ অন্যমনস্ক, দূরলগ্ন দুটি চোখ তুলে তার দিকে চেয়ে কৃষ্ণজীবন যেন প্রথমটায় চিনতেই পারল না। তারপর একটু সন্ত্রস্ত হয়ে বলল, এসো, বোসো। কিছু বলবে?
হ্যাঁ। একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই।
কৃষ্ণজীবন কী বুঝল কে জানে, হঠাৎ একটু হেসে বলল, তোমার মুড দেখে মনে হচ্ছে প্রশ্নটা খুব প্যালেটেবল নয়।
কী জিজ্ঞেস করবে?
আমি শুনলাম, তুমি বিষ্টুপুরে তিনতলা বাড়ি করে দিচ্ছ ওদের। সত্যি নাকি?
কৃষ্ণজীবনের হাসিটা হারিয়ে গেল। বলল, কে বলেছে?
সেটা অবান্তর কথা। খবর চাপা থাকে না।
কৃষ্ণজীবন হাতের বইটা একটা মার্কার দিয়ে বন্ধ করে রাখল। তারপর তার ধীর স্বভাবসিদ্ধ গলায় বলল, হ্যাঁ। মাবাবা খুব কষ্ট করে থাকে। বর্ষায় ঘর জলে ভেসে যায়। পোকামাকড়ের উৎপাত। সাপও ঢোকে শুনেছি।
তোমার টাকা খুব সস্তা হয়েছে? তিনতলা বাড়ি মানে এক কাঁড়ি টাকা। আমাদের কি এত বাড়তি টাকা আছে উড়িয়ে দেওয়ার মতো?
উড়িয়ে দেওয়া কি একেই বলে?
তা ছাড়া কী?
আমার তো মনে হয় টাকা দিয়ে এর চেয়ে ভাল কাজ আমি আর অল্পই করেছি।
এটা ভাল কাজ? তোমার মা-বাবার জন্য তিনতলা বাড়ির কোনও দরকার ছিল কি? বুড়োবুড়ি থাকবেন, তার জন্য একখানা পাকা ঘরা হলেই তো যথেষ্ট। সামান্য টাকায় হয়ে যেত। তিনতলা বাড়ি ওদের কোন কাজে লাগবে? শেষ অবধি তো বাড়ি ভোগ করবে ওই মাতাল আর লম্পট রামজীবন।
কথার যৌক্তিকতায় একটু মিইয়ে গেল কৃষ্ণজীবন। কথাটা মিথ্যে নয়। সে এ কথার জবাব খুঁজে পেল না। একটু উদাস থেকে বলল, ভেবেছিলাম। একটা ভাল বাড়ি করলে কখনও-সখনও আমরাও গিয়ে থাকতে পারব।
তোমার মাথা খারাপ হয়েছে? আমি বিষ্টুপুরে গিয়ে থাকব?
আমি আউটিং-এর কথা বলছি।
আউটিং-এর জন্য অনেক সুন্দর জায়গা আছে। বিষ্টুপুরে মরতে আউটিং-এ যাবো কেন?
কৃষ্ণজীবন একটা অসহায় শ্বাস মোচন করে বলল, ছেলেমেয়েরা মাঝে মাঝে বলে ওরা বিষ্টুপুর যেতে চায়। বিশেষ করে দোলন।
ওদের আমি যেতে দেবো না।
তা হলে আর কী করা যাবে! তোমরা কেউ না গেলেও আমি তো যাবো। তারা তোমাদের কেউ না হলেও, আমার তো আপনজন!
সেটা নিয়েও আমার কিছু কথা আছে। ওদের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা রাখছি কেন?
কৃষ্ণজীবন একটু অবাক হয়ে বলে, তার মানে কি রিয়া?
তোমার হয়তো আত্মসম্মান বোধ একেবারেই নেই, কিন্তু আমার আছে। তোমার এক ভাই মাতাল, আর একটার পাগলামির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বোন যাত্ৰাদলের নটী। সম্পর্ক রাখার মতো মানুষ কি ওরা?
কৃষ্ণজীবন যেন ঘুষি খেয়ে কুঁকড়ে গেল। ছোট হয়ে গেল। মুখে একটা ব্যথাতুর বিষণ্ণতা ফুটে উঠল। হঠাৎ। হাফ-ধরা গলায় সে বলল, আমার পাপ বড় কম নয় রিয়া, তাদের জন্য আমিই দায়ী।
