রিয়া খুব নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বামাচরণকে দেখে নিল। তারপর গলাটা সংযত করেই বলল, বামাচরণ, কেমন আছ?
বামাচরণ টপ করে উঠে এসে পদধূলি নিয়ে হেঁ-হেঁ করে হেসে বলল, বউদি, ভাল আছ?
শত হলেও আপন দেওর, একে তাড়ানো যায় না। রিয়া বলল, বোসো, তোমার খবর কী?
আর খবর! আমাকে তো বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, জানো না?
রিয়া অবাক হয়ে বলে, না তো! কি করে জানব? কেউ তো খবর দেয় না!
অনেকদিন যাও না দেশে। আমরা গরিব বলে?
রিয়া মুখটা গভীর করে বলে, নিয়ে গেলে যেতে পারি। কিন্তু তোমার দাদারই তো সময় হয় না।
দাদা। তবু মাঝে মাঝে যায়।
জানি। কিন্তু আমাকে তো নিয়ে যায় না।
বামাচরণ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে বলল, তোমাকে একটা খবর দিতে এলাম বউদি।
খবর!
হ্যাঁ। দাদা তো দেশে তিনতলা বাড়ি করছে। জানো?
রিয়া অবাক হয়ে বলে, না তো! তিনতলা বাড়ি?
হ্যাঁ। দারুণ ব্যাপার। ইট সিমেন্ট সব এসে গেছে। আমি তো ওখানে এখন থাকি না। রামজীবন শুণ্ডা লাগিয়ে আমাকে মেরে ধরে তাড়িয়ে দিয়েছে। দিন কুড়ি আগে হঠাৎ গিয়ে পড়েছিলাম। তখন দেখি, এই কাণ্ড। এলাহি ব্যাপার হচ্ছে।
কই, আমাকে বলেনি তো!
বামাচরণ মুচকি হেসে বলল, তোমাকে গোপন করেই হচ্ছে বলে শুনলাম।
গোপন করার কী আছে?
তা তো জানি না। কিন্তু অন্যায়টা দেখ। আমাকে ভিটে থেকে তাড়িয়ে তবে সব হচ্ছে।
রিয়ার মুখচোখ লাল হয়ে যাচ্ছিল রাগে। সে বলল, বাড়ি কার জন্য হচ্ছে?
মা আর বাবার জন্য। রামজীবনেরও ভাগ আছে।
বাঃ, বেশ কথা তো! অদ্ভুত ব্যাপার।
সবার জন্যই হচ্ছে, শুধু আমি বঞ্চিত। অবিচারটা দেখ।
রিয়া মুখ গভীর করে বসে রইল। তারপর বলল, চা খাবে?
তা খেতে পারি। দাদা কোথায়?
তার ফিরতে রাত হবে।
আমি যে খবরটা দিয়েছি তা দাদাকে বোলো না।
কেন, দাদাকে ভয় পাও?
কী দরকার বলে? আমার ওপর রাগ করবে।
ঠিক আছে, বলব না। কিন্তু খবরটা সত্যি তো?
বিশ্বাস না হয়। কালকেই আমার সঙ্গে বিষ্টুপুর চলো, দেখে আসবে। ঠিকাদার দু-চারদিনের মধ্যেই কাজ শুরু করে দেবে।
তোমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে বলছিলে, তা তুমি এখন কোথায় আছ?
বামাচরণ দুঃখের গলায় বলল, কোথায় আর থাকব? প্রথমটায় শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে উঠেছিলাম। তা সেখানে সুবিধে হল না। একটা ভাড়াবাড়িতে আছি।
সেটা কি বিষ্টুপুর থেকে দূরে?
তিন চারটে গ্রামের তফাতে।
তাড়াল কেন?
সে অনেক কথা। তবে আমাকে তাড়িয়ে সব গাপ করে নিল ওই রামজীবন।
সে তো শুনি মদটদ খায়।
সব দোষ আছে বউদি। গুণের অন্ত নেই।
ছিঃ ছিঃ। বলে চুপ করে থাকল রিয়া। মনটা বিরক্তি আর রাগে খিচড়ে গেল। উঠে গিয়ে কাজের মেয়েটাকে চা করতে বলে ফের এসে মুখোমুখি বসে বলল, তোমার দাদা সব টাকা পয়সা দিয়ে ফেলেছে বুঝি বাড়ি করার জন্য?
তা জানি না। তবে ঠিকাদার লাগিয়েছে। বাড়ি করাটা যদি আটকাতে পারো। তবে বড় ভাল হয়। বাড়ির ভাগ আমিও পাবো না, দাদার তো কথাই নেই।
তোমার দাদা তো বলেন রিটায়ার করে দেশে গিয়েই থাকবেন।
আর থেকেছে! তুমিও যেমন। দাদা এখন একজন ডাকসাইটে লোক। সে গিয়ে ওই ধাপধাড়া গোবিন্দপুরে থাকে কখনও? টাকাটা জলে দিচ্ছে। আটকাতে পারবে না বউদি ঃ
রিয়া রাগ-রাগ মুখ করে বলে, আটকানো হয়তো সহজ হবে না। টাকা হয়তো দিয়ে ফেলেছে। কিন্তু আমরা বড়লোক নই বামাচরণ। আমার মেয়ের বিয়ে বাকি। ছেলের পড়ার খরচ আছে। দোলনও তো বড় হচ্ছে। তোমার দাদা কোন আক্কেলে যে বাড়ির টাকা দিতে গেল তা বুঝতে পারছি না।
আমিও সেই কথাই বলি। এ বাজারে এতগুলো টাকা! না হোক দেড় দুলাখ তো খসবেই।
আমি যদি বিষ্টুপুর যেতে চাই নিয়ে যেতে পারবে?
কবে যাবে বলো, আমি এসে নিয়ে যাবো।
সামনের রবিবার তোমার সময় হবে?
খুব হবে। মাঝখানে তো দুটো দিন।
সকালের দিকে চলে এসো। আমি যাবো।
ঠিক আছে।
বসে বসে আরাম করে চা খেল বামাচরণ। বিকুট খেল চায়ে ভিজিয়ে।
আর কিছু খাবে?
ক্যাবলার মতো একটু হাসল বামাচরণ। খুব সংকোচের সঙ্গে বলল, সকাল থেকে আজ তেমন কিছু খাওয়া হয়নি।
তা হলে বোসো। বলে রিয়া উঠে গেল। ফ্রিজ থেকে মাখা ময়দা আর তরকারি বের করে কাজের মেয়েটাকে পরোটা ভেজে দিতে বলে এল। তার মাথাটা উত্তেজিত। এইসব লোককে আত্মীয় বলে স্বীকার করা বা পরিচয় দেওয়াটাই এক লজ্জার ব্যাপার। কৃষ্ণজীবনের মতো একজন বিশিষ্ট এবং বিখ্যাত লোকের ভাই বলে একে কে বিশ্বাস করবে? কৃষ্ণজীবন ছাড়া তার ভাইবোন বা বাপ-মাও ভদ্র শ্রেণীর মধ্যেই আসে না। গরিব বলে কথা নয়, কোনও কালচার বা শিক্ষাও তো নেই এদের। একজনও কোনও ভদ্র পেশায় নিযুক্ত নেই। জীবন থেকে, মন থেকে এদের সম্পূর্ণ বর্জন করে দিয়েছিল। রিয়া। কৃষ্ণজীবনকেও চেয়েছিল ওদের সঙ্গে সম্পর্করহিত করে দিতে। এ কাজটা পেরে ওঠেনি। সে। কৃষ্ণজীবন তাকে না জানিয়ে মাঝেমাঝে বিষ্ণপুর যায়। রিয়া ধরে ফেলেছিল, কৃষ্ণজীবনের ছাড়া শার্টের বুক পকেটে ট্রেনের টিকিট পেয়ে। এখন দেখা যাচ্ছে, শুধু সম্পর্ক নয়, দায়দায়িত্বও ঘাড়ে নিচ্ছে এইসব আপোগণ্ডদের।
তোমার বউয়ের নাম না?
হ্যাঁ। তোমার মনে আছে?
আছে। সে কেমন মেয়ে?
গায়ের মেয়ে, যেমন হয়। আর কি।
বিয়ের সময় দেখেছিলাম। একবার, ভাল করে আলাপ হয়নি।
চাও তো নিয়ে আসবখন একদিন।
প্ৰমাদ গুনাল রিয়া। এ সব লোকের সঙ্গে সম্পর্ক প্ৰলম্বিত করার কোনও ইচ্ছেই। তার নেই। সে বলল, এখনই এনো না। আমরা সব সময়ে তো থাকি না। উনি বোধ হয়। কয়েক বছরের জন্য আমেরিকায় চলে যাবেন। আমরাও যাবো।
