আপনাদের ঘরখানা আমারই পাওয়ার কথা ছিল, মনে আছে?
বিষ্ণুপদ একটু হেসে বলে, আমাদের ঘর আবার কি? আমার বয়স তো চলে গেছে। আর কদিন? পাকাবাড়ি দালান-কোঠা দেখে যেতে পারব কি না তাও ঠিক নেই। যদি বা দেখেও যেতে পারি। তবু ভোগ করব কদিন। যা থাকবে তোদেরই থাকবে। যদি বনিবিনা করে থাকতে পারিস। তবে আর চিন্তা কিসের?
দোতলাটা কে পাবে?
বিষ্ণুপদ একটু চুপ করে থেকে বলল, এটাও একটা ক্যাচালে প্রশ্ন। দোতলা কে পাবে সে তো দূরের কথা। আগে বাড়িটা হোক।
বামাচরণ কেমন যেন হতাশ হয়ে বসে রইল। তারপর বলল, আমাকে রেমো ঢুকতে দেবে না বাড়িতে। পাকাবাড়ি হলে ও সবটাই নেবে। দেখো।
তোর আর কতটাই বা দরকার? যদি আসতে চাস চলে আয়। তোর জন্য আমি আমার ঘরখানাই ছেড়ে দিয়ে যাবোখন। রামজীবন পিতৃভক্ত ছেলে, আমি বললে সে কথার অমান্য করবে না।
বামাচরণ তবু যেন উৎসাহ পেল না। বসে রইল। তারপর বলল, দাদাকে বলো-না, আমার ঘরখানা নিয়ে আমাকে টাকা দিয়ে দিক।
বিষ্ণুপদ তার এই লোভী সন্তানটির দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, সে কি কোটিপতি বলে ভাবিস? সে নামে বড়, টাকায় নয়। বউমাকে না জানিয়ে গোপনে জমানো টাকা দিয়ে বাড়ি করে দিচ্ছে। বলেছে, এ তার প্রায়শ্চিত্ত। এসব একটু বুঝে দেখ বাবা, একটু ভেবে দেখা। শুধু স্বার্থচিন্তা করলে মানুষ বড় ছোট হয়ে যায়।
বামাচরণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর উঠে পড়ল।
০৮৪. লিফটে একাই ছিল চয়ন
লিফটে একাই ছিল চয়ন, দরজা বন্ধ করার সময়ে খুচ করে একটা লোক এসে ঢুকে পড়ল। লোকটার পরনে হাকুচ ময়লা প্যান্ট আর শার্ট, লম্বা রুক্ষ চুল, গালে বিজবিজ করছে দাড়ি। লোকটা অবিরল বিড়বিড় করে কী বকে যাচ্ছে। চেহারাটা একসময়ে খারাপ ছিল না। কিন্তু অযত্নে বা রোগে বা অভাবে শুটিকো মেরে গেছে। এইসব মানুষকে দেখলে চয়ন তার নিজের ভবিষ্যতের চেহারা কল্পনা করে নিতে পারে। সে হয়তো বয়সকালে এরকমই আধপাগলা, ভ্যাবলা, বিড়বিড় করে লোক হয়ে যাবে।
হঠাৎ লোকটা তার দিকে চেয়ে বলল, আচ্ছা কৃষ্ণজীবন বিশ্বাস যেন কোন তলায় থাকে? জানতাম, কিন্তু ভুলে গেছি।
আপনি তার ফ্ল্যাটে যাবেন?
হ্যাঁ, আমার দাদা। কোন তলা জানেন?
জানি। আমিও তাদের ফ্ল্যাটেই যাচ্ছি।
অ। আপনি কে?
আমি মোহিনীকে পড়াই।
লোকটা আর উচ্চবাচ্য করল না। সাততলায় পৌঁছে তার পিছু পিছু নেমে এল। এ লোকটা কৃষ্ণজীবনের ভাই বলে বিশ্বাস করবে কে? বয়সে যেন কৃষ্ণজীবনের চেয়ে বছর দশেকের বড়, আর পোশাক একেবারেই কৃষ্ণজীবনের ভাইয়ের মতো নয়।
ডোরবেল বাজিয়ে অপেক্ষা করার সময় লোকটা ফের জিজ্ঞেস করল, বউদিকে এখন পাওয়া যাবে?
জানি না। সাধারণত এ সময়ে থাকেন।
দরজা খুলল মোহিনী। তার দিকে চেয়ে হেসে লোকটার দিকে চেয়ে অবাক হয়ে গেল। যেন চিনতেই পারল না।
চয়ন তাড়াতাড়ি বলল, তোমার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চান।
লোকটা খুব বিনয়ের গলায় বলল, আমি বামাচরণ। তোমার কাকা হই। চিনতে পারছি না? আগেও বার দুই এসেছি।
বাইরের ঘরে বামাচরণকে বসিয়ে সে তার মাকে খবর দিতে গেল।
কলেজ থেকে ফিরে রিয়া এ সময়ে একটু শুয়ে থাকে। বেশিক্ষণ নয়। আধাঘন্টা। তাকে একজন ডাক্তার বলেছিল, আফটার ডেজ ওয়ার্ক আধাঘন্টা মনটাকে শূন্য রেখে শুয়ে থাকবেন। বালিশ ছাড়া। হেলপস টু ষ্টে ইয়ং। বলতে নেই, রিয়া নিজের শরীরে বয়সের লক্ষণ টের পাচ্ছে। একটু মেদের সঞ্চার ঘটছে। মুখের চামড়া সামান্য শ্লথ। বয়সের ব্যাপারটা তাকে ইদানীং একটু টেনশনে রাখছে। অথচ পাশাপাশি তার স্বামী কৃষ্ণজীবন এখনও কী টগবগে, প্ৰাণবান। ওকে বয়সে পায় না কেন? সবসময়ে তো পড়ছে, লিখছে, দুনিয়া নিয়ে ভাবছে, এ-দেশ সে-দেশ দৌড়ে বেড়াচ্ছে। তবু ওকে বয়সে পায় না কেন? ও কি গোপনে প্রেম করে? কে জানে! অনু প্রায়ই ফোন করে ওকে। একদিন এক্সটেনশন লাইনে ফোন ধরে কিছুক্ষণ শুনে রেগে গিয়েছিল। রিয়া। চেপে ধরেছিল কৃষ্ণজীবনকে, ওইটুকু মেয়ে তোমার সঙ্গে অত পাকা পাকা কথা বলে কেন? কী চায় ও? কৃষ্ণজীবন অবাক হয়ে বলেছিল, পাকা? তা হবে হয়তো। আমি ঠিক বুঝতে পারি না। বেশ করে বকে দিয়েছিল। রিয়া। সেই থেকে অনু মেয়েটাকে দেখতে পারে না সে। তবে জানে, অনুপ্রায়ই কৃষ্ণজীবনকে ফোন করে, বাড়িতে এসে আড্ডা মারে, কোথাও দেখা হলে গা ঘেষে থাকে। ওইটুকু মেয়েকে সন্দেহ করার মানেই হয় না। কিন্তু পাকামি দেখলে গা জ্বলে যায় তার। কালকেও চারুশীলার বাড়িতে নেমন্তন্ন ছিল, এমন ন্যাকামি করছিল কৃষ্ণজীবনের সঙ্গে যে একটা চড় কষাতে ইচ্ছে হয়েছিল তার।
শুয়ে শুয়ে বিষাক্ত মনে অনুর কথাই ভাবছিল সে।
মোহিনী এসে বলল, মা, শিগগির এসো। আমাদের সেই কাকা এসেছে। বামাচরণ না কী যেন নাম! কী নোংরা আর ময়লা, দেখা গিয়ে।
বামাচরণ! বলে অবাক হয়ে চোখ মেলে রিয়া, সে আবার কী চায়?
দেখ না গিয়ে!
উ, এরা জ্বালিয়ে খাবে। টাকা পয়সা চাইতে এসেছে বোধ হয়।
রিয়ার পরনে একটা নাইটি। টোকিও থেকে এনে দিয়েছিল কৃষ্ণজীবন। জাপানি প্রিন্টের দারুণ জিনিস। তবে এটা পরে বাইরের বিশিষ্ট লোকজনের সামনে বেরোয় না। রিয়া। কিন্তু বামাচরণকে অতটা সম্মান দেখানোর প্রয়োজন বোধ করল না সে। উঠে চুলটা বেঁধে নিল এলো খোঁপায়। বাথরুমে গেল। তার পর শ্লথ পায়ে এসে ড্রয়িং রুমের পর্দা সরিয়ে যে দৃশ্যটা দেখল তাতে মনটা বিরক্তিতে আরও ভরে গেল তার। একটা হাড়-হাভাতে ভিখিরির মতো পোশাকে বামাচরণ সোফায় বসে আছে গ্যাট হয়ে। বসে আপনমনে বিড়বিড় করছে আর বাতাসে আঙুল দিয়ে আঁকিবুকি কাটছে। দেখলেই বোঝা যায়, মেন্টাল পেশেন্ট।
