বিষ্ণুপদ বলল, মাথাটা একটু ঠাণ্ডা কর বাবা। একটু ঠাণ্ডা হয়ে বোস। ওরকম লাফালাফি করিস না। যা ভাবছিস তা নয়।
বামাচরণ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, আমি কিছু শুনতে চাই না। আমার টাকা দিয়ে দিন। আপনারা তিনতলা বাড়িতে থাকুন, আমি অন্য জায়গায় আমার ঘর তুলে নেবো। দিন টাকা।
কেন যে টাক-টাকা করছিস! টাকা-পয়সা আমাদের কাছে থাকে না। কৃষ্ণ ঠিকাদার দিয়ে কাজ করিয়ে দিচ্ছে। ঠিকাদারের সঙ্গে তার বন্দোবস্ত। এর মধ্যে আমরা নেই।
মিথ্যে কথা বলছেন! আপনাদের আমি খুব চিনি। বদমাইসের ধাড়ি আপনারা। টাকা না দিলে বাড়ি আমি কিছুতেই করতে দেবো না।
কোথাও কিছু নয়, হঠাৎ শান্ত নয়নতারা রুখে উঠে বলল, এই মুখপোড়া, চেঁচাচ্ছিস যে বড়, তোর লজ্জা হয় না?
লজ্জা! কিসের লজ্জা?
তোর যদি মনুষ্যত্ব থাকত তা হলে চোঁচামেছি। করে মা-বাপের সঙ্গে বীরত্ব না দেখিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকতি। কৃষ্ণ আমার আর একটা ছেলে, তোরই ভাই, নিজের টাকা দিয়ে দুঃখী মা-বাবার জন্য বাড়ি করে দিচ্ছে। আর তুইও আমাদের আর একটা ছেলে, সারা জীবন কী করেছিস বল তো আমাদের জন্য? দু টাকার মিষ্টিও সুশ ও কিনে এনেছিস হাতে করে? রামজীবন মাতাল-বদমাস যাই হোক, যত বদনামই করিস, সেও বুক দিয়ে মা-বাপের জন্য করে। এসব দেখে তোর লজ্জা হয় না? মুখ লুকোতে ইচ্ছে করে না?
বামাচরণ কেমন একটু থিতামত খেয়ে গেল। তবু একটু তেজ দেখিয়ে বলল, আমার টাকা থাকলে আমিও করতাম।
টাকা থাকলে করার লোক তুই? বউয়ের আঁচল ধরে এ বাড়ি থেকে বিদেয় হয়েছিস, ফের বউয়ের হুকুমেই এসেছিস ফন্দি করে টাকা আদায় করতে। তোর লজ্জাশরাম থাকলে করতিস এরকমটা? বাপকে হুমকি দিচ্ছিাস, সে নিরীহ লোক বলে। পারবি রেমোকে হুমকি দিতে? বিষদাঁত ভেঙে দেবে।
বামাচরণ তবু একবার তড়পানোর চেষ্টা করে, তা হলে তোমরা সবাই একজোট হয়েছ? সবাই মিলে আমাকে ফাঁকি দিয়ে দিব্যি আরামে থাকবে? এই তোমাদের মনে ছিল তা হলে?
কে তোকে ফাঁকি দিয়েছে? তোর ঘর ওই তো পড়ে আছে। কেউ ঢোকেওনি, দখলও করেনি। ইচ্ছে হলে ফিরে আসতে পারিস। তা কি আর তুই আসবি? সম্পত্তি সম্পত্তি করে হেদিয়ে মরছিস, কলাখ টাকার সম্পত্তি আমাদের? তোর বাবা উদয়াস্ত পরিশ্রম করে, ধারকজ করে এই কখানা ঘর তুলেছিল অনেকদিনের চেষ্টায়। তুই বাপের জন্য কিছু করিাসনি, মায়ের কথা ভাবিসনি, সম্পত্তির ভাগের বেলায় খুব তো বুঝ আছে!
নয়নতারার এই তেজ বহুকাল দেখেনি বিষ্ণুপদ। ছেলেমেয়েদের কাছে ভয়ে কেঁচো হয়ে থাকাই তার স্বভাব। আজ হঠাৎ এই তেজী ভাব দেখে বিষ্ণুপদ খুব অবাক হল। কিন্তু এই বয়সে উত্তেজনা ভাল নয়। রেগে গেলে প্ৰেশার চড়ে বসবে।
বিষ্ণুপদ বলল, ওগো, আর নয়। এবার চুপ করো। তোমার মুখ খুব লাল হয়ে গেছে। ঠাণ্ডা হও তো।
নয়নতারা বলল, ঠাণ্ডা হবো? ওর লজ্জা করে না তোমাকে না হোক অপমান করে যেতে? এই সংসারের জন্য, মাবাপের জন্য, ভাইবোনের জন্য ও কোনও কালে কিছু করেছে? যা, তোর বউকে গিয়ে বল আমরা পয়সাকড়ি দিতে পারব না, যা পারে করুক।
নয়নতারা আর বিষ্ণুপদ বরাবর একতরফা কথা শুনে যায়। কোনও দিন প্রতিবাদও করে না। আজ হঠাৎ নয়নতারার এই সাজাতিক রূপ দেখে বামাচরণ ঘাবড়ে গেল। শরীরও বোধ হয় যুতের নয়। ধাপ করে দাওয়ার মেঝের ওপর বসে পড়ল। কিছুক্ষণ বসে দুহাতে মুখ ঢেকে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে রইল চুপচাপ।
বিষ্ণুপদ নয়নতারার দিকে চেয়ে বলল, তুমি বরং একটা পান খাও।
আঁচলে মুখের ঘাম মুছে বলল, সংসার না নরক। সাধ্যি থাকলে বুড়োবুড়ি কাশীবাসী হতাম।
বিষ্ণুপদ একটু হেসে বলল, এও কাশী। এই কাশীতে পাপক্ষয় হবে তাড়াতাড়ি। একটু পান মুখে দাও।
রাঙা তাদের দাওয়ায় এসে দাঁড়িয়ে খর চক্ষুতে এদিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ। অবস্থাটা জরিপ করল। এতক্ষণ। আশেপাশে থেকে সবই শুনেছে। চেয়ে থেকে তারপর ঘরে চলে গেল।
বিষ্ণুপদ জানে, কৃষ্ণজীবন যে দোতলা বাড়ি করে দিচ্ছে এটা কেউ ভাল চোখে দেখবে না। রামজীবনকে টেক্কা দিয়ে দিল কৃষ্ণজীবন। রামজীবনের পাকা ঘর এখনও শেষ হয়নি। ছান্দ-ঢালাইয়ের মুখে গিয়ে থেমে আছে। টাকা নেই। কৃষ্ণজীবন বাড়ি করে দিচ্ছে শুনে সেও প্রথমটায় রেগে গিয়ে বলেছিল, এ তো জুতো মেরে গরু দান। ওর বাড়িতে তোমরা থাকবে কেন?
বিষ্ণুপদ বলেছে, সে আমাদের কোনও কালে অপমান করেনি, অনাদর করেনি। বরং তাকেই এখান থেকে তাড়ানো হয়েছিল। তার বাড়িতে থাকতে বাধা কী? আদর করে দিচ্ছে। তোর পাকা ঘর হোক, তোরাও তো দরকার।
রামজীবন খুশি হয়নি। তবে মেনেও নিয়েছে।
নয়নতারা বলেছে, কৃষ্ণ যখন দোতলা বাড়িই করে দিচ্ছে তখন তুই-ই বা আলাদা ঘরে থাকবি কেন? নিচের তলায় তুই থাকবি, ওপরতলায় আমরা। আর বুড়োবুড়ি মরলে সবটাই তোর হবে।
রামজীবন এ কথাটা ভেবে দেখেছে। বলেছে, দাদার টাকা হয়েছে, করে দিচ্ছে। আমার টাকা নেই মা, কিন্তু আমার কলজেটা আছে।
জানি বাবা, খুব জানি। তোর মতো কলজে কটা ছেলের থাকে? কৃষ্ণকে ভুল বুঝিসনি বাবা, সে বড় ভাল ছেলে।
এইভাবেই মীমাংসা হয়েছে। কিন্তু বামাচরণ আবার উৎপাত শুরু করল আজ।
বামাচরণ অনেকক্ষণ বাদে যখন মুখ তুলল। তখন আর সেই তেজটা নেই। দুর্বল গলায় বলল, তা হলে আমার কী হবে বাবা?
বিষ্ণুপদ বলল, তোর আবার কী হবে? বউমাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিয়ে আয়। এখানেই থাক। সব দিক বজায় থাকবে তা হলে।
