বামাচরণ একটু রুখে উঠে বলে, আপনার কি ধারণা আমি বেশি চাইছি?
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, না রে, আমার কোনও ধারণাই নেই। বললাম তো। একটা কথা শুনিবি আমার?
বলে ফেলুন।
বউমাকে একবার নিয়ে আয়। তাকে একটু বুঝিয়ে বলি।
সে আসবে না। এ বাড়ির ছায়াও মাড়াবে না। তাকে কী বোঝাতে চান। আপনি? বুঝিয়ে-টুঝিয়ে কিছু হবে না। টাকা দিয়ে দিন, আমাদের সঙ্গে আর সম্পর্ক থাকবে না।
বিষ্ণুপদ মৃদু স্বরে বলল, বামাচরণ, সম্পর্ক ছাড়া আর কিসের জোরে তা হলে সম্পত্তির ভাগ চাইছিস?
তার মানে?
বিষ্ণুপদ একটু ম্লান হেসে বলল, ছেলে তার বাপের সম্পত্তি পায় কিসের জোরে? বাপ-ছেলে সম্পর্কের জোরেই তো। তা হলে সম্পর্ক নেই, সম্পর্ক থাকবে না বলে জোরগলায় বলতে আছে? সম্পর্কই যদি নেই তা হলে উত্তরাধিকার বর্তীয় কিসের জোরে?
বাজে কথা রেখে দিন, ওসব শুনে আমার লাভ নেই।
একটু ঠাণ্ডা হা বাবা, বড্ড মাথা গরম করে এসেছিস আজ। একটু বিবেচনা করে দেখ। আমাদের অবস্থা তো জানিস, নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। তুই যে টাকার কথা বলছিস আমি একসঙ্গে অত টাকা জীবনেও দেখিনি।
তা হলে বাড়িটা বেচে দিন। তারপর টাকা ভাগ করে দিন সকলকে।
বাড়ি বেচলে আমরা যাবো কোথায়?
তার আমি কি জানি?
বিষ্ণুপদ স্তব্ধ হয়ে গেল। বামাচরণ কি পাগল হয়ে গেল নাকি? স্তব্ধ হয়ে সে দেখল, বামাচরণ ফের লেবুগাছের দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে যাচ্ছে একনাগাড়ে। ভাল কথা বলছে না। ভিতর থেকে নানা রাগ, ক্ষোভ, অভিমান দূষিত কথা হয়ে বেরিয়ে আসছে।
পড়ন্ত দুপুর। রাঙা ঘুম ভেঙে উঠে দরজা খুলে বেরিয়ে এসে এদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে গেল একটু। বামাচরণকে দেখে অবাক হয়েছে। তারপর পুকুরের দিকে চলে গেল। বামা অবশ্য ভ্ৰক্ষেপ করল না। শুধু বিড়বিড় করে যেতে লাগল।
নয়নতারা ফিরল যেন এক যুগ পরে। এক হাতে বাতাসার ঠোঙা, অন্য হাতে আমপল্লব, আরও কি যেন।
বিষ্ণুপদ একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলল, এলে? বামা এসে কতক্ষণ বসে আছে দেখ।
বামা! বলে এক গাল হাসল নয়নতারা, বামা এলি? এতদিন পর মনে পড়ল বাবা? এমন ভুলে থাকতে পারিস কি করে? কাল রাতেও তো তোকে স্বপ্ন দেখলাম।
বামা উঠে মাকে তাড়াতাড়ি প্ৰণাম করল। একটু কাণ্ডজ্ঞান যেন এখনও আছে বামাচরণের। বলল, তোমাকে দেখতেই এলাম।
বউমাকে আনিসনি? সে এল না কেন?
তার সময় হয় না।
রাগ করে আছে নাকি এখনও?
বামাচরণকে এই প্রথম হাসতে দেখল বিষ্ণুপদ। হেসে বলল, তা রাগ তো হতেই পারে।
বোস বাবা, বোস। আমি সব রেখে আসি। চা খাবি তো!
বেলাবেলি রওনা হতে হবে। পথ তো কম নয়।
বোস একটু। ভাল করে মুখখানা দেখি।
নয়নতারা ঘরে গিয়ে জিনিসপত্র রেখে বেরিয়ে এসে আঁচলে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বলল, চেহারাটা এমন খারাপ করলি কি করে? এ তো দেখছি ভীষণ শরীর ভেঙে গেছে।
বামাচরণ একটা শ্বাস ফেলে বলে, শরীর ভাল যাচ্ছে না। পেটে অম্বলের ব্যথা হয় খুব।
ইস! অম্বল বড় খারাপ অসুখ। ওষুধ খাস।
বামাচরণ ভাল মানুষের মতো মাথা নেড়ে বলল, খাবো। আমাকে চাট্টি শুকনো মুড়ি দাও তো মা, পেটে কড়ার নিচে ব্যথা হচ্ছে। এই ব্যথাটাই আমাকে মেরে ফেলবে।
বালাই ষাট। আজকাল কত ওষুধ বেরিয়ে গেছে। কত ভাল ভাল ডাক্তার। বলে নয়নতারা ঘরে গিয়ে এক বাটি মুড়ি এনে দিল। বলল, একটু দুধ দিয়ে মেখে খাবি? ভাল দুধ আছে।
না মা। বলে মুড়ি চিবোতে থাকে বামাচরণ।
তা হলে শশা কেটে দেবো?
বামাচরণ এ কথাটার জবাব না দিয়ে হঠাৎ বলে উঠল, আচ্ছা, বাগানের ওপাশে কুয়োর ধারে অত ইট কেন বলো তো! ইট দিয়ে কী হবে?
বিষ্ণুপদ সতর্ক চোখে একবার নয়নতারার দিকে চাইল। কিন্তু নয়নতারার চোখ ছেলের দিকে একগাল হেসে বলল, শুনিসনি বুঝি! কৃষ্ণ যে আমাদের ঘরখানা পাকা করে দিচ্ছে। ইট সিমেন্ট বালি সব এসে গেছে। আর দু-তিন দিনের মধ্যে ভাঙা শুরু হবে।
বামাচরণ হাঁ করে মায়ের দিকে চেয়ে থেকে বেশ একটু বাদে বলল, কে পাকা করে দিচ্ছে?
কৃষ্ণ রে। আর কে দেবে?
বলো কি? এ খবর তো বাবা আমাকে বলেনি!
বিষ্ণুপদ একটা শ্বাস ফেলে বলল, ফুরসত দিলি কই?
বামাচরণ খানিকক্ষণ গুম হয়ে থেকে বলল, পাকা ঘর মানে কি ছাদও ঢালাই হবে?
বিষ্ণুপদ কিছু বলার আগেই নয়নতারা বলে ফেলল, ও মা! ছাদ ঢালাই কী রে? মস্ত দোতলা হবে যে! তিনতলায় ঠাকুরঘর হবে, ছাদ থাকবে।
ওঃ। বলে বামাচরণ কেমন যেন হয়ে গেল। উত্তেজিত, ক্রুদ্ধ! মুড়ির বাটিটা হঠাৎ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল, তাও বাবা বলছে যে টাকা নেই? মিথ্যেবাদী কোথাকার! দালান হাঁকড়াচ্ছে, আর আমার কাটা টাকা ফেলে দিতে হাত কুঁকড়ে যাচ্ছে!
নয়নতারা অবাক হয়ে বলে, কিসের টাকা? কে তোর টাকা নিয়েছে?
বিষ্ণুপদ তাড়াতাড়ি বলল, বামা আজ এ বাড়ির ভাগ বাবদ টাকা চাইতে এসেছে।
নয়নতারা অবাক হয়ে বলে, ভাগ বাবদ টাকা! সেটা আবার কী?
ও তুমি বুঝবে না।
বামাচরণ গলা তুলে বলল, বেশ আছ তোমরা! পায়ের ওপর পা তুলে দোতলা বাড়িতে থাকবে। আর আমার ব্যবস্থা কী হবে? আমার কথা একবারও ভাবলে না?
নয়নতারা বলল, তোর কথা কী ভাবব? তুই কি ভাবনার তোয়াক্কা করিস?
বামাচরণ ক্ষিপ্তের মতো লাফিয়ে উঠে বলল, তোমাদের সব ষড়যন্ত্র এখন বুঝতে পারছি। দাদার সঙ্গে আর রামজীবনের সঙ্গে ঘোঁট পাকিয়ে আমাকে তাড়িয়েছে যাতে বেশ ফাঁদিয়ে বড় বাড়ি তুলতে পারো! সব মতলব আমি বুঝতে পারছি। কী ভেবেছ তোমরা, আমাকে বঞ্চিত করে নিজেরা সব ভোগদখল করবে? আমি আজই উঁকিলের কাছে গিয়ে ইনজাংশন বের করব।
