খুবই বিস্ময়ের কথা, এই পৃথিবীকে প্রগাঢ় ভালবাসে কৃষ্ণজীবন। অন্য কারও সঙ্গে তার তেমন সম্পর্ক রচিত হয় না বটে। কিন্তু এই অদ্ভুত প্রাণময় গ্রহটির প্রতি হয়।
দোলন তার সরু গলায় খুব সাবধানে ডাকল, বাবা।
উঁ! গভীর আনমনা কৃষ্ণজীবন জবাব দিল।
কী ভাবছো বাবা?
কৃষ্ণজীবন মাথাটা সামান্য নত করে বলে, আমরা যখন ছোটো ছিলাম তখন আমাদের গায়ে অনেক গাছপালা ছিল।
তুমি কেন শুধু গাছপালার কথা ভাবছো বাবা?
কেন ভাবছি! তোমাকে যে এই পৃথিবীতে রেখে যেতে হবে আমাকে। মানুষ যে কেন তার সন্তানের কথা ভাবে না।
আমি গাছ কাটব না বাবা। আমি কখনও পৃথিবীর দাড়ি কামিয়ে দেবো না।
০০৮. মেঘলা দিনের কালো আলো
মেঘলা দিনের কালো আলোয় ঘরের মধ্যে দুটি ছাইরঙা মানুষ দুজনের দিকে চেয়ে আছে। বাইরে সরু সরু অজস্র সাদা সুতোর মতো ঝুলে আছে বৃষ্টি। টিনের চালে ঝিমঝিম নেশাড় শব্দ। কথা নেই। বীণাপাণি আর নিমাই।
সেদিন অনেকক্ষণ পগার আচমকা মৃত্যুসংবাদটা ভাল করে বসছিল না বীণাপাণির মাথায়। কাঁদবে, না হোঃ হোঃ করে লটারি জেতার মতো আনন্দে হেসে উঠবে, সেটা তার ভিতরে তখনও স্থির হয়নি। আর ওই উজবুক লোকটা, পাঁচ ফুটিয়া, রোগাভোগা, ভীতু আর ধার্মিক লোকটা, চোখ তুলে ভাল করে বীণার দিকে যে তাকাতেই পারল না আজ অবধি, সেই লোকটা কেমন যেন চোখা চোখে চেয়ে ছিল তার চোখে। লোকটার সামনে গোছানো সুটকেস। একটু বাদেই চৌকাঠ পার হবে। তারপর হয়তো আর কোনওদিনই উল্টোবাগে চৌকাঠ পেরিয়ে এসে ঢুকবে না বীণাপাণির ঘরে।
বীণাপাণি এরকম অদ্ভুত অবস্থায় আর জীবনে পড়েনি। শোক, আনন্দ, উত্তেজনা, রাগ, ঘেন্না সব একসঙ্গে উথলে উঠছে ভিতরে। ঠিক এই সময়ে যদি চৌকির তলা থেকে তার পোষা বেড়াল কুঁচকি বেরিয়ে এসে তার কোলে না উঠে পড়ত, তাহলে কী যে করত বীণাপাণি কে জানে? কুঁচকিই সব কাটিয়ে দিল একটা আদুরে মিয়াও শব্দ তুলে। তার খিদে পেয়েছে।
বীণাপাণি বেড়ালটাকে বুকে চেপে ধরল। তার বুদ্ধি এখন স্থির নেই। মাথার ভিতরটা পাগল-পাগল। বুকটায় বড় দাপাদাপি। কী বলতে কী বলবে, কী করতে কী করে বসবে, কে জানে বাবা! আর ওই আহাম্মক লোটা তাকে কেন যে ওরকম করে দেখতে লেগেছে! বীণাপাণির কি একটু কাঁদা উচিত? বাড়াবাড়ি হবে না তো!
কদল না, তবে কাঁদার মতো একটা অবস্থায় সে থেমে রইল। চোখ ভরে উঠল জলে, কিন্তু গড়িয়ে পড়ল না। স্থির হয়ে জানালা দিয়ে বাইরের অজস্র সুতোর বুনটের মতো একঘেয়ে বৃষ্টির দিকে চেয়ে রইল।
নিমাই এ সময়ে একটা গলা খাকারি দিল। তারপর তার সরু নরম মেয়েলি গলায় জিজ্ঞেস করল, ছেলেটা কি পগার খবর দিয়ে গেল?
বীণা জবাব দিল না।
নিমাই জবাবের জন্য অপেক্ষা করল একটু। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, এরকম সব কাণ্ড হয় বলেই তোমায় বারণ করেছিলাম।
বীণা চুপ করে যেমন চেয়েছিল তেমনি চেয়ে রইল। বাইরে চুপ বটে, কিন্তু তার ভিতরে এ সময়ে একটা কথা কাটাকাটি হচ্ছিল। ঠিক এরকম একটা গোলমেলে ব্যাপারের মধ্যে নিমাই চলে গেলে তার কি হবে? ওকে চলে যেতে দেওয়া কি ঠিক হবে? রাগের মাথায়, কেঁকের মাথায় যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। কিন্তু এখন তো সেই অবস্থাটা নেই। তাকে বুদ্ধি দেবে কে? বুদ্ধি চাইলে অনেকেই মাথা ধার দিতে আসবে, কিন্তু বীণাপাণির ভাল-মন্দ বুঝে কথা কইবে কি কেউ? তার বন্ধু অনেক, কিন্তু আত্মীয় তো এই একজনই। মাদামারা, পান্তাভাত, সব ঠিক। তবু নিমাই তো লোভী নয়, পাজি নয়, ধান্দাবাজ নয়। বকাঝকা-অত্যাচার ওর ওপর কম করে না বীণা! তবু নির্ভর করে। ওকে চলে যেতে দেওয়া কি উচিত কাজ হবে! আটকানোই বা যায় কি করে?
নিমাই উঠবার মতো একটু ভাব করে ফের বসে পড়ল উবু হয়ে, তারপর খুব সংকোচের সঙ্গে বলল, একটা কথা জিজ্ঞেস করি। এ কথাটার জবাব অন্তত মাথা নেড়ে হলেও দাও। পা কি কাল রাতে টাকা পয়সা কিছু তোমার কাছে
গচ্ছিত রেখে গেছে?
এই প্রশ্নটাকেই ভয় পাচ্ছিল বীণা। পগা এসেছিল সন্ধের মুখে। খুব তাড়া ছিল। বৃষ্টি হচ্ছিল তুমুল। নিমাই কোথায় বেরিয়েছে। খুব হাওয়া। হ্যারিকেনের আলোয় একখানা একসারসাইজ খাতা খুলে পরশমণি নামে একটা নতুন নাটকের পার্ট মুখস্থ করছিল বীণাপাণি। দরজায় ধাক্কা আর ডাকাডাকিতে উঠে দরজা খুলে দেখল, বর্ষাতি গায়ে পগা। জলে সপসপ করছে। মুখে একগাল হাসি। ফোম লেদারের ব্যাগ থেকে পলিথিনে মোড়া একটা প্যাকেট বের করে বীণার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, কাল সকালে নিয়ে যাবো।
বেশ ভারী প্যাকেট। এরা যে তাকে বিশ্বাস করে, ভালবেসে এসব রেখে যায় তা নয়। এরা জানে এদের টাকা পয়সা মেরে দিয়ে বীণাপাণি পার পাবে না। সীমান্ত জুড়ে এদের জাল বিছিয়ে রাখা আছে। সেই জাল কেটে বীণাপাণি কত দূর যারে? যতদিন মাথা নিচু করে চলবে ততদিন ঠিক আছে। গড়বড় করলে রেহাই নেই।
বীণা বাধ্য মেয়ের মতো প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বলল, ঠিক আছে।
পগা আবার অন্ধকারে বাতাস-বৃষ্টির মধ্যে মিলিয়ে গেল। দরজা এঁটে বীণাপাণি প্যাকেটটা তেরঙ্গে রেখে তালা দিয়েছিল। এ সব প্যাকেটে কী থাকে তা তার জানতে নেই। জানতে চায়ও না সে। শুধু হেরোইন-টেরোইন না থাকলেই হল। পগা অবশ্য ও কারবার করে না। সে ডলার পাউন্ড আর টাকার লেনদেন করে।
কেউ দেখেনি। কেউ জানে না।
বীণাপাণির অভিনয়ের প্রতিভা এখন কাজে লাগল। সে অকপটে নিমাইয়ের দিকে চেয়ে কঠিন দৃঢ় গলায় বলে না। পগা রোজ আমার কাছে টাকা-পয়সা রেখে যায় না।
