বামা শানের ওপরেই বসে পড়ল। বিষ্ণুপদ লক্ষ করল, বামার জামাকাপড়ের অবস্থাও ভাল নয়। ময়লা হাকুচ একটা হাওয়াই শার্ট আর তেলচিাটে একটা প্যান্ট। এত ময়লা যে রঙ বোঝা যায় না। চটিজোড়াও লক্ষ করল বিষ্ণুপদ। সিঁড়িতে ছেড়ে রাখা একজোড়া হাওয়াই। তলা ক্ষয়ে গেছে। বামার ছেলে।পুলে নেই। পিওন বা আর্দলিগোছের চাকরি করলেও সরকারি পাকা চাকরি। তার এমন দুরবস্থা হওয়ার কথা নয়।
কি খবর রে?
এই এলাম। গলায় যেন জোর নেই বামার।
কোথায় আছিস এখন?
শ্বশুরবাড়িতেই ছিলাম। এতদিন। এখন একটা ঘর ভাড়া করতে হয়েছে। শ্বশুরবাড়িতে খুব অশান্তি হচ্ছিল।
কিসের অশান্তি?
সম্বন্ধী আর তার বউ অশান্তি করছে। থাকতে দিচ্ছে না।
একটা শ্বাস ফেলে বিষ্ণুপদ বলল, তা কষ্ট করে থাকার দরকারটা কি? তোর ঘর তো ফাঁকা পড়েই আছে। এখানে। তোর মায়েরও ইচ্ছে।
কিন্তু শ্যামলী চাইছে না। কী করব বলুন তো!
বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বল। বউমার এখানে অসুবিধে কি?
এখানে আসতে চায় না। বলছে তার ভাগের সম্পত্তি বাবদ যা টাকা পাওনা হয় তা দিয়ে দিতে। সেই জন্যই আসা।
বিষ্ণুপদ একটু চুপ করে থেকে বলে, টাকা! টাকাটা দেবে কে? তোর ভাগের অংশটা যদি কেউ কেনে তবে হয়তো হয়। কিন্তু সে তো অবাস্তব কথা। এ হল দখলের জমি, সেই পার্টিশনের পর কিছু মাতব্বর মুরুব্বি এসব জায়গায় আমাদের বসিয়ে দেয়। দলিরপত্রের কারবার ছিল না। এখানকার বসতবাড়ির ভাগ। কিনবেই বা কে!
রামজীবনকে বলুন, সে কিনে নিক।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলল, তোরা কি রামজীবনের অবস্থা জানিস না নাকি? সে টাকা কোথায় পাবে? কিনবেই বা কেন? ওসব বুদ্ধি করে লাভ নেই। এখানে বসবাস করতে পারিস, সেটাই সোজা।
বামাচরণ মাথা নেড়ে বলল, আমি কিছু জানি না। আমার টাকার দরকার।
বামাচরণের গলার আওয়াজটা হঠাৎ যেন একটু কেমন-কেমন ঠেকল বিষ্ণুপদার। বামাচরণ যেন আগের মতো নেই। অন্যরকম হয়ে গেছে। সেটা ভাল মনে হচ্ছে না তার।
বিষ্ণুপদ বলল, টাকার দরকার কার নয়? কিন্তু ব্যবস্থা কি করে হবে তাই ভাবছি। তুই বরং আজকের দিনটা থেকে যা। রামজীবনেরর সঙ্গে কথা বলে দেখি ।
বামা একটু রুক্ষ গলায় বলে, ওর সঙ্গে কথা বলতে যাবো কিসের জন্য? আমি ওসব পারব না বাবা। ব্যবস্থা যা করার আপনিই করে দিন।
বিষ্ণুপদ অবাক হয়ে বলে, আমি! আমার টাকা কোথায় দেখলি তুই? আমি টাকা দেবো কোত্থেকে?
বামাচরণ যে তা জানে না তা নয়। খুব ভাল করেই জানে। তবু কেমন অসহিষ্ণু গলায় বলল, তা আমি জানি না।
গতিকটা ভাল ঠেকছে না বিষ্ণুদার। নয়নতারা বাড়িতে থাকলে একটু সুবিধে হত বিষ্ণুপদর। কিন্তু আজ বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীর জন্য বাতাসা আনতে দোকানে গেছে। একবার বেরোলে নয়নতারা চট করে ফেরে না, পাঁচ বাড়ি ঘুরে গল্পসল্প করে আসে।
বিষ্ণুপদ গলাখ্যাকারি দিয়ে অস্বস্তিটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করে বলল, ঠাণ্ডা হয়ে বোস। তোর মা একটু বেরিয়েছে, আসুক।
বামাচরণ বসে বসে অন্য দিকে চেয়ে হঠাৎ বিড়বিড় করতে লাগল আপনমনে। এরকম আগে দেখেনি ওকে বিষ্ণুপদ। আগে তো এসব ছিল না! কী বিড়বিড় করছে তা শোনার জন্য বিষ্ণুপদ একটু ঝাকল। তার কানটা গেছে। ইদানীং কানে একটু যেন কম শুনতে পায়। তবু দু-চারটে কথা কানে এল তার। বামাচরণ বলছে, চালাকি হচ্ছে? অ্যাঁ! চালাকি হচ্ছে? বাপের নাম ভুলিয়ে দেবো…শুয়োরের বাচ্চা…
একটা ফেলে বিষ্ণুপদ ফের সোজা হয়ে বসল। নিজের ওপর কি বামার বশ নেই? লক্ষণ তো ভাল নয়!
এ কথা ঠিক যে সব মানুষেরই ভিতরে নানা উল্টোপাল্টা কথা প্ৰায় সব সময়েই ভুরিভুরি কাটে। সব মানুষই ভিতরে ভিতরে অল্পবিস্তর পাগল। পাগল ভিতরটাকে চেপে ঢেকে রেখেই মানুষকে চলতে হয়। যখন মানুষ নিজের ওপর বশ হারিয়ে ফেলে তখন বিড়বিড় করে, একা একা কথা কয়। বামার হলটা কী?
বিষ্ণুপদ সস্নেহে ডাকল, বামা!
বামাচরণের বিড়বিড় থামল। স্বাভাবিক গলায় বলল, কি বলছেন?
তিন-চার মাস কোনও খবর দিলি না। কেমন ছিলিটিলি সব খুলে বলবি তো!
বামাচরণ তিক্ত গলায় বলল, আমার খবর জেনে আপনাদের কী হবে? আমি যে আপনার ছেলে সেটাই তো আপনারা স্বীকার করেন না। মেরে-ধরে বাড়ির বার করে দিলেন। এখন আর খবর জেনে কী হবে? দাদাকেও এইভাবে তাড়িয়েছিলেন। তাতে দাদার কাচকলা হল। সে এখন সাততলায় থাকে, মোটা মাইনে পায়, এরোপ্লেনে ঘোরে।
বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কৃষ্ণকে বড় অপমান করা হয়েছিল, সে ঠিক কথা। অপমান যারা করেছিল তার মধ্যে তো তুইও ছিলি বাবা। ভুলে গেছিস সব? তোদের ঠাণ্ডা করতে আমি তোদের হাতে-পায়ে অবধি ধরেছিলাম।
বামাচরণ চট করে কথা পাল্টে ফেলে বলল, ওসব পুরনো ঘেটে কী হবে? ওসব ছাড়ন। আমাকে যখন তাড়িয়েই দিয়েছেন তখন আমার ন্যায্য পাওনাগণ্ডা মিটিয়ে দিন। আর কখনও আপনাদের মুখদর্শন করব না।
বিষ্ণু স্কুরে বলল, তোকে কেউ তাড়ায়নি। তুই নিজে থেকেই গেছিল। অগড়ার্কটি সব সংসারেই আছে। অত গায়ে মাখতে নেই।
ওসব উপদেশ দিয়ে লাভ হবে না। বাবা। আমি ভাগের টাকা চাই। হিসেব করে দেখেছি আমার যা ভাগ আছে তাতে আমার ত্রিশ-পঁয়ত্ৰিশ হাজার টাকা পাওনা হয়।
কত বললি?
ত্রিশ-পঁয়ত্ৰিশ হাজার। কম করেই ধরেছি। টাকাটা ফেলে দিন, আর আসব না।
বিষ্ণুপদ অসহায়ভাবে মাথা নেড়ে বলে, এ সম্পত্তির কত দাম তার কোনও আন্দোজই নেই। আমার। হিসেব শুনে কী হবে? তবে টাকাটা অনেক টাকা বটে।
