হেমাঙ্গ বিব্রত হয়ে বলল, উনি তো মোটে একবারই আমাকে অ্যাপ্রোচ করেছিলেন, তারপর আর কখনও বলেননি। আমি ধরে নিয়েছিলাম হয়। উনি চাকরি পেয়ে গেছেন, নয়তো দরকার নেই।
ঝুমকি নিজের যোগ্যতাতেই একটা চাকরি পেয়ে গেছে। সামনের মাসে জয়েন করবে। খুব ভাল চাকরি। অবশ্য নয়। মাইনে খুব কম। তবে পরে বাড়াবে।
হেমাঙ্গ র দিকে একঝলক চেয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে কফির কাপে মুখ দিতে দিতে বলল, ভালই তো। তবে আজকাল চাকরির বকলমে নানারকম এক্সপ্লয়টেশন হয়। সেটা সম্পর্কে একটু কেয়ারফুল থাকবেন।
ঝুমকি বলল, কিরকম এক্সপ্লয়টেশন?
এক্সপ্লয়টেশনের ভ্যারাইটি এবং ম্যাগ্লিচুড এত বেশি যে স্পেসিফাই করা মুশকিল। কখনও সূক্ষ্ম, কখনও স্থূল।
চারুশীলা একটা ধমক দিল, ওর কথা শুনিস না তো ঝুমকি! নিজে একটা চাকরি দিতে পারেনি, এখন জ্যাঠামশাইয়ের মতো উপদেশ দিতে লেগেছে।
হেমাঙ্গ একটু দম নিয়ে বলল, সেটা ওঁর ইচ্ছে। তবে তুই এত সুখের মধ্যে থেকে তো ওয়ার্কিং গার্লদের সমস্যা বুঝতে পারবি না। গোলাপি চশমা দিয়ে দুনিয়া দেখছিস।
আমার বর যদি আমাকে সুখে রেখে থাকে তাতে তোর হিংসে হয় কেন রে? বেশ করব গোলাপি চশমা দিয়ে দুনিয়া দেখব।
যত খুশি দেখ, কিন্তু ওঁকে গোলাপি চশমাটা পরানোর চেষ্টা না করাই ভাল।
ঝুমকি এবার মৃদুস্বরে বলল, হেমাঙ্গবাবু ঠিকই বলেছেন মাসি। দেয়ার আর প্রবলেমস। তবে আমি এত ভয় পাই না। আমাকে সহজে এক্সপ্রয়েট করা যাবে না।
হেমাঙ্গ জানে, সব মেয়েই এরকম ভাবে। কিন্তু চারদিকে এত সূক্ষ্ম জাল আর ফাঁদ থাকে যে, শেষ অবধি সামাল দিতে পারে না। কিন্তু সে আর এ নিয়ে কথা বলল না। চুপ করে রইল।
চারুশীলা কোনও মুডই বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে না। হঠাৎ বলল, এই, তুই আমন গোমড়া মুখ করে আছিস কেন রে? দুচক্ষে গোমড়া মুখ দেখতে পারি না। আজ মাছের রোস্ট হচ্ছে, একটু খেয়ে যা।
আমার খিদে নেই।
ডায়েটিং করছিস নাকি? চেহারা তো হাড়গিলের মতো হচ্ছে।
চেহারা! চেহারা নিয়ে তারাই ভাবতে পারে যাদের হাতে অঢেল সময় আছে। আমাদের ফালতু সময় নেই।
জানা আছে। বেশি বকিস না। যখন সুন্দরবনে গিয়ে বিরহী যক্ষের মতো বসে থাকতি তখন সময় হয়েছিল কি করে?
সেটা অন্য ব্যাপার।
কাওয়ার্ড কোথাকার! সাধা লক্ষ্মী পায়ে ঠেললি। এখন দাড়ি রেখে দেবদাস সাজছে।
হেমাঙ্গ হেসে ফেলল। বলল, দেবদাস দাড়ি রাখত নাকি?
তা কে জানে! তোর ওপর এত রাগ আমার!
সন্ধে সাতটার দিল্লি ফ্লাইটে প্লেনের আইল সিটে বসে হেমাঙ্গ খুব আনমনে এক কাপ কফি খেল। খাবারটা নিলেই না! কেন কে জানে আজ নিজেকে সে ঠিক বুঝতে পারছে না। যেন একই শরীরে দুজন বসে আছে। চেনা হেমাঙ্গ আর অচেনা হেমাঙ্গ।
দিল্লিতে নেমে ট্যাক্সি নিয়ে পাঁচতারা ঝলমলে হোটেলে পৌঁছনো, পাঁচতলায় ওঠা, ঘরে ঢোকা, জামাকাপড় পাল্টানো, ক্লায়েন্টকে ফোন করে পৌঁছ-সংবাদ দেওয়া সবই যেন ঘটছিল একটা ঘোরের মধ্যে। এই হোটেলের ভাড়া, ডিনার-লাঞ্চব্রেকফাস্টের পয়সা সবই দেবে তার ক্লায়েন্ট। তবু ডিনারটা সে খেল না। ফ্রিজ থেকে একটা কোন্ড ড্রিং বের করে খুব আস্তে আস্তে খানিকটা খেল। তারপর বাতি নিবিয়ে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকল সে।
মনটা বিষণ্ণ।
কখন ঘুমিয়ে পড়ল, টেরও পেল না সে।
রবিবার সকালের ফ্লাইটে তার ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সে ফিরে এল শনিবার রাতেই। তার মনের মধ্যে একটা ভীষণ তাড়াহুড়ো, একটা তীব্র অস্থিরতা। যেন সময় বয়ে যাচ্ছে, যেন এখনই কী একটা কাজ তাকে সেরে ফেলতে হবে।
রবিবার ভোর রাতে উঠে সামান্য জিনিসপত্র গুছিয়েই সে বেরিয়ে পড়ল। ক্যানিং, নদী, নৌকো, তার পরই তার নদীর ধারের ঘরখানা। আঃ, কী আনন্দ! কী স্বস্তি!
বাসন্তী যেন হাওয়ার মুখে খবর পেয়ে ছুটে এল, ওমাঃ তুমি এসে গেছ? এবার কতদিন পর এলে বলো তো! আমি তো ফি শনিবার ভাবি, আজ আসবেই আসবে।
হেমাঙ্গ অকপট হেসে বলল, ভাবিস?
ভাবব না? ও কি, দাঁড়াও, দাঁড়াও, হুট করে বিছানায় উঠে না। ঘরদের পরিষ্কার করি, বিছানা ঝেড়ে দিই, কাঁচা চাঁদর পাতি, তবে না! যাও, হাতমুখ ধুয়ে এসো ভাল করে।
আজ কী খাবো রে? বাজার তো নেই।
সে তোমাকে ভাবতে হবে না। দশটা টাকা দাও, সব নিয়ে এসে রান্না করে দিই। ততক্ষণ জিরোও।
হেমাঙ্গ মাথা নেড়ে বলল, জিরোবো না। নৌকো করে একটু ঘুরে আসি। উঃ, কী যে ভাল লাগছে এসে!
হেমাঙ্গ বেরিয়ে পড়ল। বিশাল নদী, বিশাল আকাশ, বিশাল ব্যাপ্ত চরাচর যেন কোল পেতে আছে তার জন্য। বাতাস
নৌকো করে অনেক দূর গেল হেমাঙ্গ। রূপমুগ্ধ দুটি চোখ দিয়ে পৃথিবীকে পান করতে লাগল। ভিতরে কী তেষ্টাটাই না জমে ছিল তার!
যখন দুপুরে স্নান করে খেতে বসেছে তখন বাঁকা মিঞা এল।
আবার এলেন! এবার বেশ দেরি করে এলেন। আমি তো ভাবলাম শখ মিটে গেছে।
হেমাঙ্গ হাসল। বলল, না, শখ আরও বেড়েছে। আবার ঘন ঘন দেখতে পাবে আমাকে।
বিয়েটিয়ে কি শিকেয় তুলে রাখলেন?
হেমাঙ্গ ফিচেল হাসি হেসে বলল, ভাবছি। এদিককারই কোনও গায়ের মেয়েকে বিয়ে করব। এখানেই থাকব। তুমি বরং পাত্রী খোঁজ করতে লেগে যাও।
বাঁকা মিঞার বাক্য হরে গেল। তারপর খুব হাসতে লাগল সে।
০৮৩. বামাচরণকে প্রথমটায় চিনতেই পারেনি বিষ্ণুপদ
বামাচরণকে প্রথমটায় চিনতেই পারেনি বিষ্ণুপদ। দুগালে বিজবিজ করছে কাঁচা-পাকা দাড়ি, চুলও লম্বা হয়ে জট পাকানোর জোগাড়, চোখ ঘোলাটে। বেশ রোগাও হয়ে গেছে। চিনতে কষ্ট হল খুব। বামা প্ৰণাম করে দাঁড়ানোর কয়েক লহমা পর বিষ্ণুপদ বলল, আয়, বোস।
