ও টাকাটা তোর কাছে জমা দেবে। আঠারো বছর বয়স হলে সাইকেল কিনবে। আমাকে কথা দিয়েছে।
বাঁচলাম বাবা। যা সমস্যায় ফেলেছিল।
না, এখনও বাচিসনি। তোর আরও একটা ফাড়া আছে।
কিসের ফাঁড়া? বলে অকৃত্রিম বিস্ময়ে চাইল চারুশীলা।
হলঘরের ছবিটা কে কিনেছে?
কেন, আমি!
তুই!
কেন, আমি কিনতে পারি না?
তুই শকুনের ডিমও কিনতে পারিস, কিছু অবিশ্বাসের নেই। কিন্তু ছবির তুই কী বুঝিস?
ইস, ছবি যেন তুই বড় বুঝিাস!
হয়তো আমিও বুঝি না। কিন্তু আমার মক্কেলরা তাদের ব্ল্যাকমানি দিয়ে আজকাল ছবি কিনে রাখছে। সেটাও ব্যবসা। আর্ট না বুঝলেও ছবির কমার্সটা আমি জানি। তোর কি ব্ল্যাকমানি প্রবলেম? টাকাটা লগ্নি করে রাখলি?
কী পাজি আর জংলি তুই! আমি বুঝি তোর পেটমোটা, লোভী, জোচ্চোর মক্কেলদের মতো? ওরকম আনকালচার্ড, নভিস, আন এড়ুকেটেড?
তুই যে ছবির ছ-ও বুঝিস তা তো জানতাম না। জীবনে একটাও এগজিবিশনে যেতে দেখিনি, ছবি নিয়ে কোনওদিন একটাও কথা বলিসনি। কবে সমঝদার হলি বল তো!
আমার বাড়িতে কত আর্টের বই আছে জানিস!
জানি। তুই সেগুলোর পৃষ্ঠাও উল্টে দেখিস না কখনও। বইগুলো সুব্রতদার। ভদ্রলোক আর্কিটেক্ট, তাকে আর্টের খোঁজখবরও রাখতে হয়। কিন্তু তুই! তোর কবে থেকে আর্টের নেশা হল? নাকি স্ট্যাটাস সিম্বল। আজকাল ঘরে পেইন্টিং ঝোলানো অবশ্য একটা ফ্যাশান হয়েছে।
চারুশীলা রাগ করতে গিয়েও হেসে ফেলল, একটা পেইন্টিং কিনেছি বলে কেমন হিংসেয়া জ্বলে যাচ্ছে দেখ। তুই যে গুচ্ছের আজেবাজে জিনিস কিনে ঘরে জঙ্গল বানাচ্ছিস!
হেমাঙ্গ ব্যথিত হয়ে বলল, আজকাল কিনি না। আমার বৈরাগ্য আসছে। কিন্তু তুই সত্যিই পয়সা খরচ করে হুসেনের ছবি কিনেছিস এটা ভাবা যাচ্ছে না। ওটার অনেক দাম।
ভাল জিনিসের দাম একটু হবেই। হেমাঙ্গ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, সত্যিই আজকাল আমি তোকে আর বুঝতে পারছি না। তুই রহস্যময়ী হয়ে
যে মেয়েটা চারুশীলার মুখোমুখি বসে আছে সে হাঁটুর ভাঁজে মুখ লুকিয়ে একটু হাসছে। মুখটা চেনা। ঠিক চিনতে পারছিল না হেমাঙ্গ। সে বেশি তাকায়ওনি। মেয়েদের দিকে সে কমই তাকায়।
চারুশীলা মেয়েটার দিকে চেয়ে বলল, শুনলি তুই ওর কথা? আমি নাকি আর্ট বুঝি না, ছবি কেনা নাকি আমার ইনভেস্টমেন্ট! অ্যাকাউন্ট্যান্সি করে করে আর বদ লোকদের চুরির কাজে হেলপ করে করে ওর মনটাই হয়ে গেছে পিশাচের মতো। সবাইকেই সন্দেহ করে।
মেয়েটা মুখ তুলল না।
চারুশীলা নেমে পড়ল সিল থেকে। অগোছালো চুল খোঁপায় বাঁধতে বাঁধতে বলল, তোর চেহারাটা দিন দিন ট্র্যাফিক পুলিশের মতো হয়ে যাচ্ছে কেন রে? ইস, কি বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে! একটুও ভদ্রলোকের মতো নয়।
ওটা দৃষ্টিভঙ্গির তফাত। পৌরুষ জিনিসটা তুই তো বুঝিস না।
পৌরুষ বুঝি আজকাল দাড়ি-গোফে গিয়ে ঢুকেছে?
হেমাঙ্গ সামান্য অনুতপ্ত গলায় বলে, গোফটা আজ ছাঁটতে গিয়ে ডেবিট ক্রেডিট ঠিক মিলল না।
তাই বল! গোফ ছেটেছিস! তাই কেমন পাগলা মেহের আলি বলে মনে হচ্ছে।
মেহের আলি কে?
চারুশীলা হঠাৎ নাটুকে গলায় হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠল, তফাত যাও! তফাত যাও! সব বুট হ্যায়!
ওঃ! ক্ষুধিত পাষাণ!
যাক। আমি ভেবেছিলাম এটাও বুঝি ধরতে পারবি না! তোর পড়াশুনো এত কম। ঝুমকির সামনে কী লজ্জায় পড়তে হত তাহলে!
ঝুমকি! বলে অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকাল হেমাঙ্গ। তারপর বলল, ইনি কোন ঝুমকি?
ওমা, আমার কাছে আবার আর কোন ঝুমকি আসবে? তোর মাথাটাই গেছে দেখছি। নাকি চোখের দোষ!
ঝুমকি মুখ তুলে হাসি মুখে বলল, উনি সেদিন মিস্টার বিশ্বাসের বাড়িতেও আমাকে প্রথমে চিনতে পারেননি।
হেমাঙ্গ লজ্জা পেয়ে বলল, তা নয়। আপনার চেহারা পাল্টে যাচ্ছে।
তাই নাকি? কই আমি তো বুঝতে পারি না!
একটা শ্বাস ফেলে হেমাঙ্গ বলল, হয়তো কসমেটিক সার্জারি কিংবা যোগ, কিংবা আর কিছু করেছেন আপনি।
ঝুমকি এত হাসল যে ফের মুখ চাপা দিতে হল তাকে।
চারুশীলা তার মাথায় একটা গাড়ী মেরে বলল, বুদ্ধ আর কাকে বলে!
হেমাঙ্গ সত্যিই একটু অবাক হয়েছে। এ মেয়েটা যে ঝুমকিই তাতে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু ওর চেহারায় যে একটা পরিবর্তন হয়েছে সেটাও মিথ্যে নয়। কিন্তু পরিবর্তনটা কিরকম তা সে ধরতে পারছে না।
চারুশীলা বলল, ঝুমকি, হয়তো এ বোকাটা খুব একটা ভুলও বলেনি। হিসেবী চোখ তো। তোর চেহারা যে একটু ভাল হয়েছে সেটা ওর চোখ দিয়েই পরীক্ষা হয়ে গেল। চার কেজি ওজন বাড়া সার্থক হল।
ওজন! বলে হেমাঙ্গ একটু চিন্তিত হয়ে পড়ল। কিন্তু মুখে আর কোনও কথা এল না। ঠিকই, কৃষ্ণজীবনের বাড়িতেও মেয়েটার সঙ্গে দেখা হয়েছিল তার এবং প্রথম দর্শনে সে কয়েক পলক চিনতে পারেনি একে।মেয়েটা একটু ঠেস দিয়ে কি এক-আধটা কথা বলেছিল তাকে। আর ঘুরে ঘুরে তাকে দূর থেকে লক্ষ করেছিল।
দোতলার হলঘরে এসে বসল। তারা। কফি এল। হেমাঙ্গর অবাধ্য চোখ বারবার ঝুমকির মুখের ওপর এবং চারদিকে ওড়াউড়ি করছিল। মাত্র চার কেজি মাংস বা চর্বি বাড়লে এতটা পাল্টে যায় মানুষ! ডেবিট ক্রেডিট আজ কিছুতেই সমান হতে চাইছে না। হিসেবের গণ্ডগোল হয়ে যাচ্ছে। ব্যালান্স শিট মিলছে না।
একটু আনমনা ছিল হেমাঙ্গ, চারুশীলা হঠাৎ বলল, তুই ঝুমকিকে অত লজ্জা পাচ্ছিস কেন বল তো!
হেমাঙ্গ অবাক হয়ে বলে, লজ্জা! লজ্জার কী আছে?
লজ্জার অবশ্য তোর একটা কারণ আছে। তুই ঝুমকিকে একটা চাকরি করে দিতে পারিসনি।
