তুমি গোফের কিছু বোঝো?
ফটিক এক গাল হেসে বলল, আপনিই কি আগে বুঝতেন? আজকাল গোফদাড়ি রেখে মুখখানা সৌন্দরবন বানিয়ে কি সুখ হচ্ছে তাও তো ভেবে পাই না। দিন না ও আপদ নিকেশ করে। কামিয়ে ফেলুন।
হেমাঙ্গ আঁতকে উঠে বলে, ও বাবা! কামাবো কি? গোফদাড়ি এখন আমার খুব দরকার।
সে দরকার হয় ফেরারিদের। খুনটুন করে যারা গা ঢাকা দেয়। আপনার ওসব কি দরকার? সুন্দর মুখখানাব কি যে ছিরি করে রেখেছেন।
নাঃ, তুমি এর মর্ম বুঝবে না।
দিল্লি যাবে বলে আজ অফিসে যাওয়ার কথা নয়। তার। কিন্তু ঘরে শুয়ে বসে সময় কাটাতেও তার আজকাল ভাল লাগে না। কোথাও যাওয়ার নেই তেমন। এলোমেলো উদ্দেশ্যহীন খানিকক্ষণ ঘুরে আসা যায় মাত্র।
পোশাক পরে বেরোতে যাবে ঠিক এমন সময়ে চারুশীলার ফোন এল।
ওরে হেমাঙ্গ, এবার আমি পাগল হয়ে যাবো।
সে তো তুই আছিসই একটু। নতুন করে হওয়ার কিছু নেই।
শোন, পিন্টু সাইকেলের জন্য ভীষণ বায়না করছে। সামলাতে পারছি না। তুই নাকি ওকে সাইকেল কেনার টাকা দিয়েছিস?
সাইকেল! সাইকেলের জন্য বায়না করছে তো কিনে দে না, এর জন্য পাগল হওয়ার কি আছে?
ভুকি মাথা খারাপ হয়ে গেল? পিন্টু দৃ চাকার সাইকেল চাইছে। বলছে এখন থেকে সাইকেলেই স্কুলে যাবে।
মাই গড!
তুই-ই ওকে লাই দিয়ে মাথায় তুলছিস। কেন যে টাকাটা ওকে দিতে গেলি। এখন এসে ভাগ্নেকে সামলা।
খুব জেদ ধরেছে নাকি?
ভীষণ।
ও তো জেদী ছেলে নয়। ঠাণ্ডা, শান্ত, বাধ্যের ছেলে।
কি জানি, কাকে দেখে যেন মাথায় ভূত চেপেছে। ওর এক ক্লাসমেট নাকি রোজ সাইকেলে স্কুলে যায়। তার মাবাবারও বলিহারি বাবা, ওইটুকু দুধের শিশুকে সাইকেলে কলকাতার অসভ্য বাস মিনিবাস ট্যাক্সির মুখে ছেড়ে দিচ্ছে। একটু ভয় নেই! এখন তুই এসে যদি কিছু করতে পারিস।–
পিন্টুকে খুবই ভালবাসে হেমাঙ্গ। আর একটু যখন ছোট ছিল তখন দেবশিশুর মতো লাগত। এখনও সুন্দর, তবে লম্বা হয়েছে একটু। সামান্য এক পর্দা ফারাক হয়েছে। আজকাল আর কোলে চড়ে না, হামি দেয় না, বন্ধুবান্ধব আর খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। পিন্টু এখনও তার ভীষণ প্রিয়।
চারুশীলার বাড়িতে হাজির হয়ে সোজা দোতলায় উঠে হেমাঙ্গ হাঁক মারাল, কোথায় রে পিন্টু?
নিজের পড়ার ঘর থেকে পিন্টু বেরিয়ে দরজায় দাঁড়াল। মুখে সলজ্জ হাসি।
বায়না করেছিলি?
পিন্টু মুখ লুকিয়ে ফেলল। তারপর বলল, মা সবসময়ে এত ভয় পায় কেন বলো তো!
তোর মায়ের চেয়ে আমি বেশি ভয় পাই।
রাজ্যের অবাক বিস্ময় চোখে নিয়ে তার দিকে ঊর্ধ্বমুখে চেয়ে পিন্টু বলল, তাহলে যে তুমি কিনতে বললে?
আমার দোষ কি জানিস? অর্ধেক কথা বলতে ভুলে যাই। আমি তোকে বলতে চেয়েছিলাম, সাইকেল কিনে নিস আঠারো বছর বয়স হলো। ওই আঠারো বছরটা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম।
আঠারো বছর বয়স হলে কেন?
কারণ আছে। আঠারো বছরে লোকে অ্যাডাল্ট হয়।
পিন্টু একটু হাসল, সত্যি? সত্যি
তাহলে টাকাটা তুমি নিয়ে নাও, আঠারো বছর বয়স হলে দিও।
না না, কিছু দিয়ে ফেরত নিলে কালিঘাটের কুকুর হয়। এক কাজ কর, টাকাটা মাকে দিয়ে দে।
মা কিনে দেবে না। কিন্তু। মা কিনে দেবে না, জানি। কিন্তু তোর আঠারো বছর বয়স হলে আমিই ও টাকা তোর মার কাছ থেকে নিয়ে কিনে দেবো।
মা আমাকে খুব বিকেছে।
সেইজন্যেই তো তোর মায়ের সঙ্গে আমি ঝগড়া করতে এসেছি। আজ দারুণ ঝগড়া করব। ফাটাফাটি হয়ে যাবে। শুনিবি নাকি ঝগড়াটা?
হিহি। তুমি তো হেরে যাও।
স্থার মা আমার দিদি তো, বয়সে বড়, তাই মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে হেরে যাই। কিন্তু আজ দারুণ ফাইট দেবো। দেখবি?
পারবে? মাও খুব ভাল ঝগড়া করতে পারে।
রোজ করে নাকি?
সবাইকে বকে তো। সেটাই তো ঝগড়া, না?
হ্যাঁ, বটেই তো।
পিন্টুর মাথায় একটু হাত বুলিয়ে ছেড়ে দিল হেমাঙ্গ। পিন্টু পড়তে গেল।
তার পর দেয়ালে মস্ত অয়েল পেন্টিংটার দিকে নজর পড়ল হেমাঙ্গর। এটা আগে ছিল না তো! কাছে গিয়ে দেখল, একটি গ্রাম্য বাড়ির উঠোনে নানা ধরনের গৃহকর্মেরত কয়েক মহিলার ছবি। সকালের রোদ, গাছের সবুজ, উঠোনের মেটে রঙ, ঘাগরা, চোলি সব আলাদা উজ্জ্বল রঙে দক্ষ হাতে আঁকা। সমস্ত ছবিটার মধ্যে একটা নৃত্যপর আনন্দের আভাস রয়েছে। দেখলেই মনটা ভাল হয়ে যায়। একটু বুকে ছবির নিচে ডান ধারে শিল্পীর স্বাক্ষর দেখে বিস্ময়ে ভ্ৰী উঁচু হল তার। হুসেনের ছবি! এর তো অনেক দাম। পাওয়াও কঠিন। হুসেনের ছবি তো আঁকার আগেই আগাম বিক্রি হয়ে যায়। এ বাড়িতে ছবির সমঝদারই বা কে আছে?
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আপন মনেই বলল, হুঁ।
একটি ওরিজিনাল হুসেনের দাম নিশ্চয়ই লক্ষাধিক টাকা। বা তারও অনেক বেশি হয়তো ডবল। কোনও কালেক্টরের কাছ থেকে কিনতে গেলেও আরও বিচ্ছিরি রকমের বেশি।
খুঁজতে খুঁজতে চারুশীলাকে এই বিচিত্র বাড়ির আড়াইতলার একটা চাতালে পাওয়া গেল। একখানা চৌকো, প্রায় পুত্রভূমিক জানলার চওড়া সিল-এর ওপর বসবার গদি পাতা। মুখোমুখি বসে খুব হাসাহাসি করছে চারুশীলা আর অন্য একটা মেয়ে।
এই যে! কখন এলি?
হেমাঙ্গ ভ্রূ কুঁচকে বলল, গত আধাঘন্টা ধরে এই ভুলভুলাইয়াতে তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।
মিথুঢ়ক! জানলার ধারে বসে রাস্তার দিকে লক্ষ রাখছি। তোর গাড়ি এলে দেখতে পেতাম।
গাড়ি আসেনি। তবে আমি যে এসেছি সেটা তো মিথ্যে নয়! পিন্টুর সঙ্গে এতক্ষণ কথা বলছিলাম।
কি হল শুন!
