না। যশবীর সকালে ফিরেছে। এসেছিল। তাড়িয়ে দিয়েছি।
বিমলা একটু চমকে উঠল, সহজে গেল?
গেল। ওর ভয় হয়েছে। বোধ হয় ভেবেছিল সকালে এসে তোমাকে মরা অবস্থায় দেখবে।
তাহলে কী করত?
কাপুরুষরা কী করে? তারা বউ খুন করে ফেরার হয়।
উঃ! বলে বিমলা দুহাতে মুখ ঢেকে রইল। কিছুক্ষণ।
তুমি যশবীরের কথা ভেবো না। তাতে শরীর খারাপ হবে।
আমি শুধু ওর নিষ্ঠুরতার কথা ভাবছি। ও যে আমাকে এত শাস্তি দিতে পারে তা আমার ধারণাই ছিল না। ওর কথা ভাবলেই আমার এত ভয় করছে!
সাড়ে নটা নাগাদ ফোনটা এল।
আমি একটু কৃষ্ণমূৰ্তিজীর সঙ্গে কথা বলতে চাই।
আপার বাবার আজ ছুটির দিন। শনিবার, পুজো-আচ্চা সেরে সবে সকালের জলখাবার খেতে বসেছিলেন। উঠে এসে ফোন ধরলেন। কি একটু শুনে নিয়ে বললেন, আচ্ছা, আসছি।
ফোনটা রেখে আপার দিকে চেয়ে বললেন, যশবীর কিছু বলতে চায়। আমি আসছি।
প্ৰায় ঘন্টা খানেক বাদে বাবা ফিরলেন। বললেন, যশবীর চলে গেল।
মা বললেন, তার মানে?
বাবা অনুত্তেজিত গলায় বললেন, ওর একটা অদ্ভুত ধারণা হয়েছে যে, বিমলাকে ও হয়তো হঠাৎ ইমপালসের মাথায় কোনওদিন খুন-টুন করে ফেলতে পারে। ও নিজের বশে নেই। বলে গেল যে, ওর ফ্ল্যাটে বিমলা একাই থাকতে পারে। সুন্টু অ্যাকাউন্টের পাসবই আর চেকাই দিয়ে গেল। আর ফ্ল্যাটের চাবি। আরও বলেছে, বিমলাকে ডিভোর্স দিয়ে দেবে।
বিমলা ভিতরের ঘর থেকে উঠে এসেছে। সব শুনে বলল, ওর কথায় বিশ্বাস কী? রাতে যদি ফিরে আসে?
কৃষ্ণমূর্তি শান্ত চোখে বিমলার দিকে চেয়ে বললেন, আমার চেয়ে তুমিই ওকে বেশি চেনো। কাজেই কোনটা করা ভাল হবে তা তুমিই ঠিক করো। তবে আমার মনে হল, যশবীরের মন খুব খারাপ। বেশ ভেঙেও পড়েছে। এক ড্রাইভারের মুগ্ধ হওয়ায় কাল ট্রক চালিয়ে আসানসোল গিয়েছিল। সারারাত ট্রক চালিয়ে আজ সকালে এসে পৌঁছেছে। খুব টায়ার্ডও ছিল।
বিমলা মৃদু স্বরে বলল, আমি ওকে বিশ্বাস করি না আঙ্কল। আফটার ইয়েস্টারডেজ এক্সপিরিয়েন্স ওকে আর বিশ্বাস করা যায় না। আপা বুদ্ধি করে ফ্ল্যাটে না ঢুকলে আজ আমার ডেডবডিই পাওয়া যেত।
যশবীরও তাই বলছিল। খুব রিপেন্টেন্ট। যাই হোক, নিজের জিনিসপত্র ও নিয়ে গেছে। ফ্ল্যাটটা তোমার জন্য রেখে গেছে। বলেছে, ও তোমাকে আর কখনও ডিস্টার্ব করবে না।
বিমলা একটা শ্বাস ছাড়ল। তারপর বলল, টু বি অন দি সেফ সাইড আমি আরও দুদিন আপনাদের শেলটার চাই। ওর মতলবটা এখনও আমার বোঝা বাকি আছে।
ইউ আর অলওয়েজ ওয়েলকাম। তুমি আমাদের কাছেই এখন থাকো। তোমার চিকিৎসা এবং বিশ্রামও দরকার। যশবীরকেও ওয়াচ করা যাক। ডোন্ট ওরি।
আপা সব শুনল। দাবার খেলায় প্রতিপক্ষ যেন প্রত্যাশিত চালটা দিল না। এমন কূট চাল দিল যে আপা খেলাটা বুঝতে পারছে না।
সোমবার স্কুলে যেতেই বন্ধুরা ঘিরে ধরলা, যশবীরের কী হল আপা? বলো তো আমরা গিয়ে ধোলাই দিয়ে আসি।
আপা গম্ভীর মুখে বলল, তার দরকার হবে না। যশবীর হার মেনে নিয়েছে।
বুবকা হতাশার গলায় বলল, যাঃ, তাহলে তো অ্যাডভেনচারটা মাটি হয়ে গেল। হার মানল কেন?
স্ট্র্যাটেজিক রিট্রিট হতে পারে। কিছু বোঝা যাচ্ছে না। যাই হোক, এখন আর তোমাদের কিছু করার নেই।
আরও তিন দিন বাদে বিমলাকে সঙ্গে নিয়ে তার ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিল আপা। ফ্ল্যাটের ভিতরে একটু ধুলো পড়েছে। আর সোদা গন্ধ জমেছে একটু। আর সব ঠিকই আছে।
আপা বিমলাকে ঘরদের পরিষ্কার করতে সাহায্য করল। তারপর বলল, এখন তুমি স্বাধীন।
বিমলা আপার দিকে চিন্তিত মুখে চেয়ে বলল, আপা, আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।
কী বিশ্বাস হচ্ছে না?
যশবীর ঠিক এরকম নয়। এত মিকলি ও আমাকে রেহাই দেবে সেরকম মানুষ কী যশবীর?
তোমার কি এখনও ভয় করছে?
না। আর ভয় করছে না। এখন একটু চিন্তা হচ্ছে।
০৮২. দাড়ি আর গোঁফের কতগুলো অসুবিধের দিক
দাড়ি আর গোঁফের কতগুলো অসুবিধের দিক আছে। দাড়ি নেমে বুক পর্যন্ত ঝুলে পড়তে চায়। গোফ ঢেকে ফেলে দুটো ঠোঁটকেই। শিখরা দাড়ি জাল দিয়ে বেঁধে রাখে, কিন্তু সেরকমটা করতে যাওয়ার হ্যাপা আছে। তার চেয়ে কি একটু ট্রিম করে নেওয়া বেশি সুবিধেজনক? গোফ নিয়েও কিছু অসুবিধে হচ্ছে হেমাঙ্গর। বিশেষ করে খাওয়ার সময়। চা খেতে গিয়ে সে প্রায় দেখছে, চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়ানোর আগেই তার গোফ গিয়ে চায়ে ড়ুব দিচ্ছে।
অনেক ভেবেচিন্তে সে এক শুক্রবার সকালে ম্যাগনিফায়িং আয়না, চিরুনি আর কাচি নিয়ে বসল দাড়ি-গোফকে ভদ্রস্থ করতে। কিন্তু ছাঁটতে গিয়ে দেখল, তার সেই কৃতবিদ্যতা নেই। যা দিয়ে সুদক্ষ নাপিত গোঁফটোফ ছেটে একটা ব্যালান্স নিয়ে আসতে পারে। তার হাতে বানরের রুটি ভাগের মতো বাঁ দিকের গোফ ছোট তো ডান দিকেরটা বড় হয়ে যাচ্ছে। ফের ডান দিকেরটা ছোট তো বা দিকটা বড় থেকে যাচ্ছে। ডেবিট ক্রেডিট সমান হচ্ছে না, ব্যালান্স-শিট মিলছে না।
মাঝপথে হাল ছেড়ে দিল হেমাঙ্গ। যা হয়েছে তাই থাক। যা হল তা অবশ্য নয়নসুখকর নয়। আঁচড়ানোর পর দেখা গেল, নাকের নিচে দুদিকে দুটো ছোটখাটো ঝাটা উচিয়ে রয়েছে। গোঁফের এই ছিরি নিয়েই তাকে আজ বিকেলের ফ্লাইটে দিল্লি যেতে হবে, অফিসের কাজে।
ফটিককে ডেকে বলল, গোফটা কেমন হল বলো তো ফটিকদা!
ফটিক খুব ভাল করে নিরীক্ষণ করার পর বলল, ভালই দেখাচ্ছে। মিলিটারিদের মতো।
তার মানে কি?
আজ্ঞে ভালই।
