এটা সে জিনিস নয়। মা।
মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, কি জানি কি! আজিকাল সব পাল্টে যাচ্ছে।
হ্যাঁ মা, পাল্টে যাচ্ছে। পরিবর্তনটা তুমি বুঝতে পারছি না কেন?
তুমি কি বিমলাকে স্বাধীন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছ? ডিভোর্সের কথা বলেছ শুনলাম। কাজটা ভাল করনি। স্বাধীন হয়ে বিমলার লাভ হবে না। আরও কষ্টে পড়বে।
তুমি কি বলো ও অত্যাচারী স্বামীর পা ধরে থাকবে?
মা ব্যাজার মুখে বলেন, যশবীরকে আমার অত্যাচারী বলে মনে হয় না। হতে পারে ওর মাথা গরম। তারও কারণ বিমলাই। তুমি বোধ হয় এবার আমাকে নারীমুক্তির কথা শোনাবে! শোনো বোকা মেয়ে, নারীমুক্তি বলে কিছু নেই। প্রতি মুহূর্তেই পুরুষকে তার দরকার। কোনও মেয়ে যদি তার স্বামীকে না মানে, স্বাধীন হয়, তবে অন্য পুরুষরা তাকে ছিঁড়ে খাবে। স্বাধীন মেয়ের মতো এমন সহজ ভোগ্যবস্তু পুরুষের আর কী আছে? বহুভোগ্যা হলে কি স্বাধীন হওয়া যায়?
তাহলে মা, তুমিই স্বীকার করছ যে, পুরুষেরা পশুর মতোই। সুযোগ পেলেই মেয়েদের ছিঁড়ে খায়? তাহলে এই জাতকে মেয়েরা প্রভুর আসন দেবে কেন?
উপায় নেই বলে। পৃথিবীতে মেয়েদের আর কোনও উপায় নেই, তাই ওই নিয়ম মানতে হয়। মেয়তে মেয়েতে তো আর বিয়ে হয় না!
আজকাল তাও হয় মা।
মা গম্ভীর মুখে বলেন, হয় যে তা আমিও শুনেছি। তোমার বাবা আমাকে মাঝে মাঝে সেসব খবর শোনায়। তুমি কি চাও সেইটেই স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে উঠুক? ওটা তো কুৎসিত একটা বিকৃতি। তাও যদি মেনে নিই, তাহলেও জেনো, মেয়েতে মেয়েতে বা পুরুষে পুরুষে বিয়ে হলে কোনওদিনই আর সন্তান হবে না। প্রকৃতিকে কি এতটা অস্বীকার করা যায়?
আপা একটু অবাক হয়ে মায়ের দিকে চেয়ে রইল। তার শান্ত মা এত কথা কদাচিৎ বলে। আজ বলছে, তার কোনও কারণ আছে।
হ্যাঁ মা, যশবীর কি তোমাকে ঘুষ দেয়? কী ঘুষ দেয় বলো।
মা হাসলেন না। গোমড়া মুখেই বললেন, আমি যশবীরের পক্ষ নিচ্ছি না। সে অন্যায় করেছে। কিন্তু আগে ভাল করে দেখ, সেই অন্যায়ের পিছনে, আর কারও আর একটা অন্যায় আছে কি না।
ডোরবেল বাজতেই একটু চমকে উঠেছিল। আপা। কিন্তু দরজা খুলে দেখা গেল না, কোনও হামলাকারী নয়। আপার বাবা। দীর্ঘকায়, কালো মজবুত চেহারা, কঁচা-পাকা চুলের মানুষটি খুবই শান্ত ও দৃঢ় প্রকৃতির। কেন্দ্রীয় সরকারের মস্ত অফিসার। সকাল থেকে অনেক রাত অবধি নিবিষ্ট মনে অফিসে কাজ করে।
জামাকাপড় পাল্টানোর আগে ভদ্রলোককে আপা ও তার মায়ের কাছ থেকে ঘটনাটা আদ্যোপান্ত শুনতে হল। আপা প্রশ্ন করল, বলো বাবা, আমি অন্যায় করেছি?
আপার বাবা ভ্রূ কুঁচকে বললেন, আমি কোনও অন্যায় দেখছি না। আমি চাই তুমি এরকম কাজই করো। কিন্তু কখনও যেন ভুল সিদ্ধান্ত নিও না।
তাহলে কি এটা ভুল হল?
যশবীর না ফিরলে তো বোঝা যাবে না। অপেক্ষা করো।
অপেক্ষা অবশ্য অনেকক্ষণই করতে হল। যশবীর ফিরল না।
রাত দুটো অবধি অপেক্ষা করল। আপা। তারপর বইরের ঘরে সোফায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
যশবীর ফিরল সকালে। উসকোখুসকো চুল, রক্তবর্ণ চোখ, ক্লান্ত। প্রথমে নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকেছিল, কিছুক্ষণ পর বেরিয়ুসুম, আপাদের বাসায় এল। দরজা খুলল আপা-ই।
কী চাই?
যশবীর যেন সংকুচিত, ভীত। অপরাধী মুখ করে বলল, সি ইজ নট দেয়ার। বাট থ্যাংক ইউ। আই ওয়ান্ট হার ব্যাক।
আপা দরজা আটকে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, বিমলা যাবে না। কোনওদিনই যাবে না।
একটু যেন অবাক হয়ে চেয়ে রইল যশবীর। শুধু প্ৰতিধ্বনি করল, যাবে না?
না। আপনার নামে পুলিশ কেস করা উচিত।
যশবীর কেমন যেন গুটিয়ে গেল। মাথা নিচু করে একটু ভেবে বলল, বিমলার সঙ্গে আমার একবার দেখা হতে পারে কি?
না। বিমলা আপনার সঙ্গে দেখা করবে না।
নিঃশব্দে পিছনে মা এসে দাঁড়িয়েছেন, টের পাচ্ছিল আপা। মা বুদ্ধিমতী। তাকে টপকাতে চেষ্টা করলেন না। শুধু পিছনে আড়ালে থেকেই বললেন, ওদের দেখা হওয়াটা কিন্তু দরকার আপা।
আপা কঠিন মুখ করে নীরব রইল।
যশবীর তার দিকে তাকাল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল। কিছুক্ষণ। তারপর মৃদু স্বরে বলল, তুমি ওকে নিয়ে এসেছ বলে থ্যাংকস দিচ্ছি। আপা। ঠিকই করেছ। আমার সঙ্গে বিমলার আর না-থাকাই ভাল। আমি ভীষণ জেলাস। আই লাভ হার ভেরি মাচ। হয়তো সেই কারণেই আমার দিক থেকে ওর বিপদও বেশি। আই অ্যাম সরি ফর এভরিথিং।
এই বলে চলে গেল যশবীর। সে যে কোনও নাটক করল না, চেঁচামেচি করল না, গায়ের জোর দেখানোর চেষ্টা করল না। এতে একটু অবাক হল আপা। হয়তো নিজের অপরাধের গুরুত্ব বুঝতে পেরে ভয় পেয়েছে। হয়তো ভেবেছিল, বিমলা মরে পড়ে আছে ফ্ল্যাটের মধ্যে, তাই মুখে অপরাধী ভাব। কিন্তু লোকটা যে আদ্যন্ত হৃদয়হীন তা তো মিথ্যে নয়।
আপা দরজা বন্ধ করে ফিরতেই মায়ের মুখোমুখি।
তুমি একটু মেজাজি আছ আপা।
আপা সামান্য রাগের গলায় বলল, আমি খুব ভাল মেয়ে মা, তাই ওকে পুলিশে দিইনি। ও তো খুনের চেষ্টাই করেছিল বিমলাকে।
ঠিক আছে। এখন বিমলাকে ঘুম থেকে তুলে খাওয়াও। ওর যে এখন কী হবে তাই ভাবছি।
স্বামী ছাড়াও মেয়েরা বাঁচে। তুমি ভেবো না।
মা আর কথা বাড়ালেন না।
বিমলা ওষুধের গাঢ় ঘুম থেকে উঠল। বেলা নটায়।
ইস! কত বেলা হয়ে গেছে!
আপা বলল, তাতে কি? তোমার তো এখন রেস্ট-ই দরকার। কেমন আছ?
গায়ে হাতে-পায়ে কোমরে দারুণ ব্যথা। রাতে কিছু হয়নি তো!
