তুমি কোনোটাই নও, যশবীরকে সেটা বুঝিয়ে দেব।
প্লিজ! ওর সঙ্গে কনফ্রন্টেশনে গিয়ে বিপদে পড়ে না, ও কিন্তু খ্যাপাটে আছে।
আপা হাসল, তোমার মতো আমি ভিতু নই।
জানি আপা, তোমার খুব সাহস। কিন্তু যশবীর তো পশুর মতো হয়ে গেছে। সাবধান হওয়া ভাল।
কাল রাতে কী হয়েছিল?
রোজই হচ্ছে। ইদানীং ওর মাথায় এসেছে, আমি উইমেন্স লিব করছি। ওকে ঠিকমতো দেখভাল করছি না। কি করব বলো? লেডিজ গ্রুপের হয়ে আমাকে কিছু কাজ করতে হচ্ছে। সাবস্ক্রিপশন, অ্যাকাউন্টস, মিটিং-এ কিছু সময় দিতে হয়। ইদানীং ফিরতে দেরি হয়ে যাচ্ছিল। প্রথম তাই নিয়ে ঝগড়া। বাঙালি মেয়েদের মতো স্বাধীন তো নাই আমরা। আমাদের স্বামীসেবা করতেই হয়। সেটাতে টিলেমি দেখা দিলেই মুশকিল। কিন্তু আমার আর ভাল লাগে না। যশবীরের ভো কোনও কালচার নেই। সারা দিন লরি, ট্রাক, খালাসি, ড্রাইভারদের সঙ্গে কাটায়, বাড়ি ফিরে হুইস্কি আর হিন্দি সিনেমা, তারপর খাওয়া আর শোওয়া। ছুটির দিনে মাঝেমধ্যে একটু আউটিং বা সিনেমায় যাওয়া। লোকটাকে আমার আর একদম ভাল লাগছে না। জীবনের কত দিকে কত কী ঘটে যাচ্ছে, ও তার কোনও খবরই রাখে না। ওর অন্য সব ভাড়াটে মেয়ের সঙ্গেও সম্পর্ক আছে। ওর এক বন্ধু কিছুদিন আগে মারা গেছে। সেই বন্ধুর স্ত্রীর সঙ্গেও আছে। এগুলো কিন্তু সন্দেহ নয়, সব সত্যি।
ডাক্তার এলেন। বিমলার হাতপায়ের বাধনের জায়গা, মুখে স্টিকিং প্লাস্টারের দাগ সবই লক্ষ করলেন। গম্ভীর মুখে নাড়ি, বুক সব পরীক্ষা করে দেখে আপার দিকে তাকিয়ে বললেন, ভেরি শকিং। কী হয়েছিল?
পাড়ার চেনা ডাক্তার, আপা মৃদু স্বরে বলল, ওর স্বামী ওকে নিজের পৌরুষ আর কর্তৃত্ব দেখিয়েছে। ওর কেমন অবস্থা ডাক্তারবাবু?
ডাক্তার দাশগুপ্ত গন্তীর মুখে বললেন, এমনিতে ঠিক আছে। কিন্তু যশবীরটা যে এরকম অমানুষ তা তো জানতাম না।
আপা বলল, ওর মাথায় হঠাৎ যেন ভূত চেপেছে।
ডাক্তারবাবু মাথা নেড়ে বলেন, তাহলে আপাতত ওদের সেপারেট থাকাই ভাল। একসঙ্গে হলেই আবার গণ্ডগোল হবে। আজকাল খুনো খুনিও হচ্ছে।
ডাক্তার একটা প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়ে গেলেন। বললেন, রেস্ট নিতে বলো। একটু ঘুমের ট্যাবলেট দিয়ে গেলাম। ওটা কিন্তু অবশ্য খাওয়াবে। কোনওরকম উত্তেজনা বারণ।
ডাক্তার চলে যাওয়ার পর বিমলা বলল, ওর সব অত্যাচার আধিপত্য মেনে নিচ্ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ মনে হতে লাগল, এতে আমার কী লাভ হচ্ছে? আমি কী পাচ্ছি। ওর কাছ থেকে? অকেশনাল সেক্স আর শাড়িগয়না বা প্রেজেন্টেশন। এসব দিয়ে কী হবে? আমি কি শুধু যশবীরের বউ? এ ছাড়া কি আমার অন্য পরিচয় কিছু নেই। আমাদের লেডিজ গ্রুপে এইসব নিয়েই তো কথা হয়। তাই ইদানীং আমি ওর মেজাজমজিকে বেশি পাত্তা দিচ্ছিলাম না। ফলে ঝগড়া হতে লাগল, বুঝতে পারছিলাম ও আমার স্বাধীনতা, স্বাধীন চিন্তা, বাইরের কাজ সহ্য করতে পারছে না। ও চায় আমি সারা দিন ওর ধ্যান করি। কিন্তু ধ্যান করার মতো মানুষ তো আগে ওকে হতে হবে। ও তো একটা পয়সা কামানোর যন্ত্র ছাড়া কিছু নয়।
বেশির ভাগ মানুষই তাই। তুমি কি কিছু ভাবিছ?
কিসের কথা বলছ?
যশবীরের সঙ্গে থাকবে, না আলাদা হবে?
ডিভোর্স? আমার বাপের বাড়ি খুব রক্ষণশীল পরিবার। তারা আমাকে ডির্ভোস করতে দেবে না।
তাহলে?
আমি সেপারেট থাকতে চাই। আমার লেডিজ গ্রুপ আমাকে হেল্প করবে।
আমরাও সাহায্য করব।
আপা, তোমার ওপর যশবীরের খুব রাগ। ও তোমাকে দেখতে পারে না। হি ইজ এ ডেনজারাস ম্যান। আমাকে তোমাদের বাড়িতে এনে তুমি নিজের বিপদ ডেকে আনিছ। আমি জানি তুমি খুব সাহসী মেয়ে। কিন্তু পুরুষের ইগো যে কী সাজঘাতিক হয় তা তো তুমি জানো না।
আমি এ সবই শিখছি। জানছি। মানুষ ধীরে ধীরে শেখে। যশবীর যে আমাকে পছন্দ করে না তা আমি জানি।
তবু রিস্ক নিচ্ছ?
রিস্ক না নিলে কি জানতে পারব? তুমি অত ভেবো না। এ পাড়ায় আমার কিছু বন্ধু আছে। পিছনের বস্তির লোকজন। আমি তেমন দরকার হলে তাদের ডাকতে পারি। আশা করি ততটা করতে হবে না। তুমি কিছু খেয়ে নাও। তারপর ওষুধ খেয়ে ঘুমোও। খুব টেনশন গেছে তোমার।
পাড়ার দোকান থেকে ওষুধ নিয়ে এসে আপা দেখল, বিমলা খেতে বসেছে। কিন্তু কিছু খেতে পারছে না। বলল, ভমিটিং টেন্ডেন্সি হচ্ছে। কি করে খাবো?
মা বললেন, আচার দিয়ে খাও। ভাল আচার আছে।
বিমুঢ় মুগ্ধ নেড়ে বলে, না আন্টি। আমি বরং শুধু ঘোলটা খাই। সলিড ফুড ভিতরে যাচ্ছে না।
তাহ খাও।
ওষুধ খেয়ে বিমলা শুলো। আপা দরজা টেনে দিল বাইরে থেকে।
মা খাবার টেবিল গোছাতে গোছাতে বললেন, তোমার এসব সোশ্যাল ওয়ার্কের জের আমাকে আর কত টানতে হবে?
আপা একটুও হাসল না। গম্ভীর মুখে বলল, আমাকে তো অনেক টানতে হবে মা। সমাজটা এত পচা-গলা।
মা তার দিকে চেয়ে শান্ত গলায় বললেন, তোমার বিচার খুব একপেশে। যশবীর কিন্তু খুব খারাপ লোক নয়। মদ খায়, সে তো বহু মানুষ খায়। কিন্তু তার স্বভাব বা কথাবার্তা আমার তো খারাপ লাগে না। বিমলা কি খুব শান্তিপ্রিয় মেয়ে ভেবেছ? রোজ যশবীর ফিরলেই অশান্তি করে।
এটা কী হচ্ছে মা, তুমি যশবীরের পক্ষ নিচ্ছ? আজ সকালেই আমাকে ও ধাক্কা দিয়েছে। বিমলাকে তো প্রায় মেরেই ফেলেছিল।
মা গম্ভীর মুখে বলেন, ঘটনা ভাল করে জানো, তারপর বিচার কোরো। আমার ধারণা বিমলাকে যশবীর খুব ভালবাসে। আর ভালবাসার মধ্যে একটু দখলদারি থাকেই, নইলে ভালবাসা কিসের? যেমন আমাকে তুমি বলো, আমার মা। ওই আমার মা কথার মধ্যে একটু দখলদারি থাকে না কি?
