বীণাও কি তোমার কাছে ফুরিয়ে গেছে?
নিমাইয়ের চোখদুটো মেদুর হয়ে গেল! গলাটাও কি ধরে গেল একটু? সামান্য ভারী গলায় বলল, না কাকা। সে আমাকে যে চোখে দেখত আমি তো তাকে সে চোখে দেখতাম না।
ওইটেই তো আমি জানতে চাই।
নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আমার জন্য অনেক করেছে বীণা। অনেক। অসুখবিসুখে যখন যেতে বসেছিলাম। তখন সে-ই আমাকে যমের হাত থেকে ছিনিয়ে আনে। তার দয়ায় আমার মা-বাবা উপোসের হাত থেকে বেঁচে যায়। কত মুখে তার কথা বলব? সে আমার কাছে ফুরোবে কেন?
কাকা একটু চুপ করে থেকে বলল, সজল নামে একটা ছেলে এসেছিল তোমার কাছে?
নিমাই তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ হ্যাঁ, এসেছিলেন। বড় ভাল ছেলেটি।
কী বলতে এসেছিল?
নিমাই ম্লান একটু হাসল, তিনি বোধ হয় আমার মনোবাসনা জানতে এসেছিলেন। তা আমি বলে দিয়েছি, আমার কোনও দাবিদাওয়া উঠবে না। কখনও। মানুষকে কি দাবিদাওয়া করে, আইন আদালত করে আটকানো যায়?
কাকা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। তারপর বলল, তোমার মতো মানুষ আমি বেশি দেখিনি নিমাই। তোমার রাগ হয় না।
জিব কেটে নিমাই বলে, রাগ! বলেন কি? রাগ কি আমার শোভা পায়। আজও তার ঋণে আমার কাঁধ ভারী হয়ে সুন্টু, আমি অকৃতজ্ঞ নরাধম বলে তার ঋণ শোধ করতে পারিনি। শোধ করতে গেলে হয়তো উল্টো বুঝবে, তাই চেষ্টাও করিনি।
কাকা দৃঢ় গলায় বলে, তোমার কাছে বীণার অনেক শেখার ছিল। আমাদেরও শেখার আছে। দোকানটা তো দিব্যি দাঁড়িয়ে গেছে দেখছি।
ভগবানের দয়া।
এলেম তোমার কম ছিল না। হাত পা গুটিয়ে বসে ছিলে বলে হচ্ছিল না। তোমার উন্নতি দেখে যে কী খুশি হয়েছি তা বলার নয়।
আশীৰ্বাদ করবেন যেন টাকা পয়সা আমাকে খেয়ে না ফেলে। ভগবানে যেন বিশ্বাস-ভক্তি থাকে। একটা কথা বলব কাক? আমার একটা কাজ করে দেবেন?
কী কাজ?
বীণার জন্য পাঁচ হাজার টাকা তুলে রেখেছি। এমনিতে সে হয়তো নেবে না। আমার নাম না করে টাকাটা তাকে দেবেন?
পাঁচ হাজার টাকা! সে তো অনেক টাকা!
টাকাই তো। কাগজ মাত্র। তবু এ দিয়ে তার যদি কিছু উপকার হয় তো আমি শান্তি পাবো। আপনি একটু অন্যভাবে দেবেন।
কী বলব তাকে?
সে আপনি ঠিক করে নেবেন।
মিথ্যে কথা বলতে বলছ?
জিব কেটে নিমাই বলে, না না, তা কেন? ধরুন, টাকাটা আমি আপনাকেই দিচ্ছি। এবার আপনার অভিরুচি।
ইতি গজ? বলে কাকা হাসল। তারপর হাত বাড়িয়ে বলল, দাও। এ টাকায় খেলে তার অনেক পাপ কেটে যাবে। দাও।
নিমাই উজ্জ্বল হয়ে বলল, বাঁচলাম।
০৮১. আপার মা আর বাবা
আপার মা আর বাবা দুজনেই শান্ত মানুষ। শান্ত এবং স্থির। তাদের দুজনের মধ্যে কখনও ঝগড়াঝাঁটি বা কথা কাটাকাটি পর্যন্ত হয় না। দুজনেই খুব ধাৰ্মিক। পুজো-আচ্চা তাদের বাড়িতে লেগেই থাকে। আপার বাবা মস্ত সরকারি অফিসার, কিন্তু ঠাটঠমক বিশেষ নেই। কাজ-অন্ত প্ৰাণ। আপার দুই দাদার একজন আই আই টি-তে ইনজিনিয়ারিং-এর ফাইন্যাল ইয়ার পড়ছে খড়গপুরে। অন্য জন দিল্লিতে ম্যানেজমেন্ট শিখছে।
বিমলাকে সন্ধেবেলা যখন ঘরে তুলে আনল আপা তখনও তার বাবা ফেরেননি। মা একটু আতঙ্কিত হয়ে বললেন, এসব কী ব্যাপার?
আপা সংক্ষেপে সব বলল, মায়ের কাছে সে প্রায় কিছুই গোপন করে না।
মা শুনলেন এবং শান্তভাবে বললেন, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ায় বাইরের লোকের ঢুকে পড়াটা বিপজ্জনক। বিমলাকে ভিতরের ঘরে নিয়ে যাও। যশবীর এলে তুমি বেরিও না। যা বলবার আমি বা তোমার বাবা বলব।
কেন মা, যশবীরকে তো আমি ভয় পাই না।
ভয় পাওয়ার কথা বলছি না। তুমি কাউকেই ভয় পাও না, তা আমি জানি। কিন্তু তুমি হয়তো গরম গরম কথা বলবে, তোমার বয়স তো অল্প। আমরা বুঝিয়ে বলতে পারব।
যশবীর যদি বিমলাকে নিয়ে যেতে চায়?
যাতে না নেয় তা দেখব। তবে তুমি নিশ্চয়ই চাও না যে, ওদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যাক?
চাই মা। বিমলার যা অবস্থা করেছে তাতে তো ও মরেই যেত। এর পর হয়তো সত্যিই মেরে ফেলবে। যশবীর স্বাভাবিক অবস্থায় নেই।
তুমি তো দূরবীন দিয়ে দুনিয়াকে দেখছ, তাই এমন মনে হচ্ছে। যাকগে, তুমি বিমলাকে ভিতরের ঘরে নিয়ে শুইয়ে দাও। তুমি আজ ওর সঙ্গেই থাকবে। যশবীরকে আমরা সামলাবো। যশবীরকে আমি চিনি, আমাকে আন্টি বলে ডাকে।
বিমলাকে নিজের ঘরে নিয়ে এল আপা। তার খাটটা বেশ বড়। দুজনের অনায়াসে হয়ে যাবে। বিমলা বাথরুম থেকে চোখেমুখে জল দিয়ে এসে বসল, তারপর বলল, কেন ঝামেলা পাকালে? তোমার বোঝা হয়ে তো থাকা যাবে না।
আপা বলল, কেউ কারও বোঝা নয় বিমলা। কিন্তু বিপদে পড়লে একে অন্যের ওপর নির্ভর না করলে কি হয়?
আন্টি আর আঙ্কলকেও বিপদে ফেলা হল।
ওসব ভেবো না। আমাদের পরিবারটা একটু অন্যরকম। আমরা নিজেদের নিয়ে থাকতে ভালবাসি না। আমাদের ভয়ডরও একটু কম। কিন্তু তোমাদের ব্যাপারটা আমাকে বলবে?
বিছানায় গুটিসুটি হয়ে অসহায়ের মতো বসেছিল বিমলা। খুব দুর্বল দেখাচ্ছে। চোখ দুটিতে গভীর একটা হতাশা। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, বলতে গেলেই আমার খুব কান্না পাবে।
কাঁদবে কেন? মনটাকে শক্ত করার সময় এসেছে বিমলা। এই টরচার সহ্য করো কি করে? কী চায় যশবীর?
যশবীর চায় অল অ্যাটেনশনস। যখন বাড়ি আসবে তখনই আমাকে অ্যালার্ট থাকতে হবে। সে সময়ে বাইরে কোথাও গেলে রেগে যায় ভীষণ। অসম্ভব পজেটিভ। আমাকে অনেকটা পুতুল বানিয়ে রাখতে চায়। সাজো-গোজো, টিভি দেখ, মার্কেটিং করো, ঘর সাজাও, কিন্তু গণ্ডির মধ্যে থাকো। যেন আমার আলাদা মত নেই, সত্তা নেই, চরিত্র নেই। আমি দাসী না পুতুল, বলো তো!
