সজল লজ্জা পেয়ে বলে, আমার জন্য তোমার কোনও ক্ষতি হচ্ছে না তো বীণা? কিন্তু তোমার সঙ্গে মেলামেশা ছাড়া, চা খাওয়া ছাড়া আমি তো আর কিছু করিনি! তোমার সঙ্গ আমার ভাল লাগে, তোমাকে আমার ভীষণ প্রয়োজন বলে মনে হয়। কি করে এই ভাল লাগাটাকে, প্রয়োজনটাকে অস্বীকার করি বলো!
বীণা একটু ভিজল। নরম গলায় বলল, কিছুদিন আমার সঙ্গে মিশো না। একটু দূরে থাকো।
ও বাবা! তোমাকে একদিন না দেখলে যে ভীষণ অস্থির লাগে!
বীণা হেসে ফেলল। তারপর বলল, তাহলে আড়াল থেকে দেখো। কাছে বেশি এসো না।
সজল মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল, বীণা, তুমি এত তেজী, এত স্বাধীনচেতা, ব্যক্তিত্বময়ী তবু মাঝে মাঝে এমন মধ্যযুগীয় মহিলার মতো হয়ে যাও কেন? লোকে কথা রটাচ্ছে বলে ভয় পেয়ে গেলে? আজকাল মেলামেশা নিয়ে কেউ কি মাথা ঘামায়? সিরিয়াসলি ঘামায় না। তবে পাসিটাইম হিসেবে কুটকচালি করতে পারে। তা করুক না, কি যায় আসে তাতে?
বীণা এই সুপুরুষ তরুণটির মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তুমি যদি মেয়ে হতে তো বুঝতে। স্বাধীনচেতা, তেজী হয়েও মেয়েদের কত বাধা থাকে।
জানি, সব জানি। কিন্তু আমি তোমাকে কখনও ঠিকাব না, কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করব না তোমার সঙ্গে। আজ অবধি আমি তোমার মতো আর কাউকে খুঁজে পাইনি।
সজলের আবেগ প্রায় কণ্ঠরুদ্ধ করে দিচ্ছিল তার। বীণা তাই খুব কোমল কণ্ঠে বলল, তোমাকে আমারও খুব ভাল লাগে। কিন্তু জানো তো, একটা সম্পর্কের জ্বালা আমার এখনও যায়নি। আমার আর একটু সময় লাগবে। তুমি যেমন অস্থির হয়ে পড়ছ, আমি তেমনটা হতে পারছি না। ঘরপোড়া গরু তো!
সে ঠিক আছে, কিন্তু দূরে সরে থাকতে বলছি কেন? আমি তো শুধু সঙ্গটুকুই চাই, তার বেশি এখন কিছু চাই না।
এই পাগলকে নিয়ে আর পারল না বীণা। তার প্রতিরোধ ভাঙল। তবু বলল, খুব বেশি নয়। কিন্তু।
কিন্তু সেটা কথার কথা হয়ে রইল। রিহার্সালের পর একসঙ্গে ফেরা, চা খাওয়া এবং গল্পগুজব যথারীতি হতে লাগল। কথাবার্তায় অনেক ফেরতা, অনেক ইশারা ইঙ্গিত, চোখে চোখ রেখে মুগ্ধমূক হয়ে বসে থাকা। স্রোতে ভেসে যাচ্ছে দুজন। টের পাচ্ছে, তবু ঠেকাতে চেষ্টা করছে না।
ঠিক এই অবস্থায় এল নিমাইয়ের এই চিঠি। হতবাক বীণা চিঠিটার দিকে চেয়ে রইল। নিমাইয়ের হাতের লেখা সে চিনত না, কেনো নিমাই এর আগে কোনওদিন তাকে চিঠি লেখেনি, তার দরকারও হয়নি। হাতের লেখাটা খুবই সুন্দর, ভূষণামূলু, বীণা চিঠিটা বালিশের তলায় রেখে দিল। বক্তব্য নতুন নয়, এরকম কথা নিমাই তাকে আগেও বলেছে। নতুন হল, চিঠি।
কাঁচড়াপাড়ায় একদিন সকাল দশটা নাগাদ নিমাই তার দোকানের কোণটিতে বসে এক গেলাস ঘোল খাচ্ছিল। দোকানে এখন ভিড় নেই। দুপুরের খাবার তৈরি হচ্ছে। এগারোটার পর মানুষের গাদি লেগে যাবে। রান্নার গন্ধটা পাচ্ছিল নিমাই। রোজ সে এই গন্ধটা খুব ভাল করে পরীক্ষা করে। গন্ধেই তো স্বাদ। ঠিকমতো গন্ধ না বেরোলে গিয়ে রাঁধুনীকে একটু সমঝে দিয়ে আসে। সে সতর্ক মানুষ। কোথাও ফাঁক রাখতে চায় না। বাসি জিনিস মেশাতে দেয় না। কখনও। রাতের বাসি বাড়তি খাবার নিয়ে যায় কিছু ভুখা মানুষ আর কচিকাঁচা বাচ্চারা। ওটা তার নিত্যকার কাঙালীভোজন। লোকে নানারকম বুদ্ধি পরামর্শ দেয় তাকে। লাভ বাড়ানোর ফন্দিফিকির বলে যায়, নিমাই সেগুলো শোনে, কিন্তু মানে না। সেই যে কথায় আছে, হাঁ জী, হাঁ জী করতে রহো, বৈঠো। আপনা ঠাম। তলে মশলায় তার কোনও ফাকি নেই। ঘানির তেল, বাছাই মশলা। তার দোকানে বাসন, কাপ প্লেট ধোয়া হয় সযত্নে, কোথাও ফাঁক থাকে না নিমাইয়ের। শালপাতা, কলাপাতা, ভাড়ের ব্যবস্থাও আছে। এত সামলে চলতে গিয়ে মাথার মধ্যে আর অন্য চিন্তা পাক খায় না।
ঘোলটা শেষ করে হিসেবের খাতা টেনে নিয়ে বসতে যাবে, এমন সময়ে একটা লোক ঢুকল দোকানে।
নিমাই যে! ভাল আছ?
নিমাই শশব্যাস্তে উঠে দাঁড়াল। একগাল হেসে হাত জোড় করে বলল, কাকা! এতদিন পর নিমাইকে মনে পড়ল তাহলে? আসুন, আসুন, বসুন ভাল করে।
কাকা বসল। নিমাই বলল, একটু কিছু মুখে দিতে হবে। কী খাবেন বলুন তো!
ব্যস্ত হয়ে না। সকালে জিলিপি আর কচুরি ঠেসেছি, এখন আর খাওয়া নয়। এক কাপ চা দাও শুধু।
চায়ের হুকুম দিয়ে জুৎ করে বসল। নিমাই মুখোমুখি। বলল, তারপর খবরটাবর কি?
তুমি তো আর বনগাঁ-মুখো হলে না!
নিমাই হাত উল্টে বলল, কি করতে যাবো? বনগাঁর পাট তো চুকেই গেছে। তা এখানে হঠাৎ আসা হল কেন?
একটা বায়নার ব্যাপার ছিল। কাল রাতেই এসেছি। আজ বনগাঁ রওনা হওয়ার মুখে তোমার সঙ্গে দেখা করে যাচ্ছিা! বীণার খবর-টাবর নাও না?
নিমাই সলজ্জ হেসে বলল, তার কথা আবার কেন? যতদূর জানি ভালই আছে, নামটামও হচ্ছে।
কাকা মৃদুস্বরে বলল, তোমাদের মধ্যে কি হয়েছিল আমাকে একটু বলবে নিমাই? যদি বাধা না থাকে?
নিমাই একটু চুপ করে থেকে বলল, সব কথা কি খোলসা করে বলা যায় কাকা?
খোলসা করে বলতে বলছি না। স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার, আবডাল থাকাই ভাল। কিন্তু মোদ্দা কথাটা কী?
নিমাই মুখখানা গম্ভীর করে বলল, আমাকে তার আর দরকার হচ্ছে না।
এটা কোনও কথা হল?
একটা মানুষ আর একটা মানুষের কাছে হঠাৎ যে কেন ফুরিয়ে যায় তা তো বলতে পারি না। মনের রহস্য কে ভেদ করতে পারে বলুন।
