তোমাকে বাড়িতে টাকা দিতে হয় না?
দিতে পারলে তো ভালই হত। টাকা কোথায়? তবে আমার এক ভাই স্টেট ট্রান্সপোর্টে চাকরি করে। কন্ডাক্টর। সংসার সে চালিয়ে নেয়।
সজল সে রাতে চলে গেল। কিন্তু তা বলে সঙ্গ ছাড়ল না। সঙ্গ ছাড়ক এটা তো বীণাও চায় না। কিন্তু তার কপাল এমনই যে, এক হাড়হাভাতের বদলে এসে জুটল। আর এক হাড়হাভাতে। তফাতের মধ্যে এর চেহারাটা বড্ড সুন্দর। আর গানের মোহময় গলা।
তুমি তো গায়ক হতে পারতে সজল?
চেষ্টা কি করিনি ভাবিছ? আগে ফাংশনে গাইতাম। রেডিওতে তিনবার অডিশন দিয়েছি, হয়নি। বড় ওস্তাদের কাছেও তালিম নিতে গেছি। আমার গলায় নাকি ওসব সুর আসে না।
রিহার্সাল থেকে ফিরতে ফিরতে দুজনে কথা হচ্ছিল। বীণা টর্চ জেলে রাস্তা দেখতে দেখতে বলল, সেরকম চেষ্টা করোনি। আমার গানের কান আছে। তোমার গলা বেশ ভাল।
বেশ ভাল, জানি। সবাই বলে, বেশ ভাল। কিন্তু গলারও একটা ক্যারেক্টর আছে। সেটা থাকলে লোকে গান শুনেই বলে উঠত, দারুণ ভাল, ইউনিক। তা কিন্তু কেউ বলেনি।
তোমার এই জিনিসটা আমার খুব ভাল লাগে।
কোন জিনিসটা?
এই যে, নিজের সম্পর্কে তোমার চাছাছোলা মতামত। তোমার অহংকার নেই।
তাও ছিল। একেবারে নেই বোলো না। তবে ছেলেবেলা থেকে বাস্তবের ঘাষটানি খেয়ে খেয়ে অহংটা ভোতা হয়ে গেছে।
তুমি এম-এ পাশ, চেহারা সুন্দর, গানের গলা ভাল, তোমার যে কোথায় আটকাচ্ছে বুঝতে পারি না।
সজল হাসল, আমার চেয়ে ঢের বেশি গুণী ছেলেরাও ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে বীণা। চান্স পাওয়া-কথাটা তো তুমি ভালই জানো। ওই চান্স পাওয়া যে কত শক্ত!
ঘরে এসে সজলকে চা করে খাওয়াল বীণা।তারপর বল, শোনো সজল, বনগাঁয়ে পড়ে থেকে নিজেকে নষ্ট কোরো না। আরও চেষ্টা করো, খুব চেষ্টা করো।
সজল মাথা নেড়ে বলল, ইচ্ছেটাই মরে যাচ্ছে।
কেন মরে যাচ্ছে?
নিজেকে খুঁচিয়ে তুলবার আর উপায় নেই। তাই তোমার কাছে আমার একটা নিবেদন আছে। বলব?
বলো। আমাকে যদি কেউ সবসময়ে তাড়না করে, ভালবেসে, উৎসাহ দিয়ে চালাতে পারে তাহলে হয়তো কিছু এখনও হয়। বীণা, তুমিই একমাত্ৰ যে পারো।
আমি! সর্বনেশে কথা।
আমি জানি তুমি বিবাহিতা, তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এখনও মুছে যায়নি। তবু তোমাকে প্রথম দেখেই মনে হয়েছিল, তুমি ভীষণ তেজী, জেদী, একরোখা। তোমার মতো কাউকে পাশে পেলে হয়তো হয়।
বীণা হেসে ফেলল। বলল, এখন বাড়ি যাও। মাথা ঠাণ্ডা করো গে।
তুমি কি একটু নিষ্ঠুর বীণা?
না। আমি প্র্যাকটিক্যাল।
সজল চলে গেল বটে। কিন্তু রেখে গেল তার ছায়াকে, তার মায়াকে। অনেক রাত অবধি তাকে নিয়ে এক মোহময় চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে রইল বীণা। সে কি এই চালচুলোহীন সুন্দর ছেলেটির প্রেমে পড়ে গেল! কিন্তু এই কি প্রেমে পড়ার সময়! এখনও জীবনটা তো গুছিয়ে তুলতে পারেনি, সবে একটা সম্পর্ক ছিঁড়ে স্বাধীন হয়েছে। এখনই কি আবার গলায় ফাস পড়ার দরকার হল?
প্রেমে পড়েছে কিনা সেটা ভাল করে বুঝে ওঠার আগেই কিন্তু তাদের নিয়ে গুজব ছড়িয়ে গেল। কাকা একদিন তাকে ডেকে আড়ালে বলল, বীণা, কি সব শুনছি। সত্যি নাকি?
কী শুনছ?
তোমাকে আর সজলকে নিয়ে।
বীণা ঠোঁট উল্টে বলল, গুজবে কান দাও কেন?
তাহলে সত্যি নয়?
না।
কাকা একটু ভেবে বলল, তোমার পারসোনাল ব্যাপারে আমার নাক গলানো উচিত নয়। কিন্তু একটু ভেবে দেখো। সজল সবে কিছুদিন হয় দলে এসেছে, এখানকার ছেলেও নয়। ওর সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নিয়ে তারপর এগোনো ভাল।
বীণা একটু অবাক হওয়ার ভান করে বলল, তার মানে তুমি আমার মুখের কথাটা বিশ্বাস করলে না? ধরেই নিচ্ছ যে সজলের সঙ্গে আমার প্রেম হয়েছে?
তোমার মুখে আরও কিছু কথা ফুটে উঠছে বীণা। সেগুলো তুমি উচ্চারণ করছ না বটে, কিন্তু গোপনাও থাকছে না। আমার কাছে অস্বীকার করে কি লাভ? সজলকেও তো দেখছি, বড্ড উড়ু-উড়ু ভাব। ওসব কি গোপন করা যায় বীণা?
বীণা একটু রেগে গিয়ে বলল, সজলকে নিয়ে আমি মোটেই মাথা ঘামাচ্ছি না। আমার মাথায় অনেক চিন্তা, অনেক সমস্যা।
কাকা গম্ভীর মুখে বলল, রাগ কোরো না। যা করবে তা ভেবেচিন্তে করতে বলেছি। তোমার ভাল চাই বলেই বলেছি, অন্য কারও ব্যাপার হলে মাথাই ঘামাতাম না। যাত্ৰা থিয়েটার সিনেমায় এসব তো হয়েই থাকে। কেউ গায়ে মাখে না। আমারও শুচিবায়ু নেই। কিন্তু নিমাই চলে যাওয়ার পর থেকে তোমার ভালমন্দ নিয়ে আমার একটা উদ্বেগ থাকে।
সেটা তোমার দয়া কাকা, তুমি আমার জন্য অনেক করেছ।
ওটা কথা নয়। আমি গুণের দাম দিই। তোমার গুণের কদর আমি আর কতটুকু করতে পারি? কিন্তু কথাটা অন্য দিকে চলে যাচ্ছে। আসল কথাটা হল, যা করবে ভেবেচিন্তে কোরো।
ঠিক আছে কাকা।
সেদিন সজলকে এড়িয়ে একা ফিরল বীণা। কিন্তু পরদিনই সজল তাকে ধরল, বীণা, কী হয়েছে? আমন গম্ভীর হয়ে আছ কেন?
তোমার জন্য আমাকে অনেক কথা শুনতে হচ্ছে।
সজল একটু হাসল, কথায় কি যায় আসে? কে তোমাকে কী বলেছে বীণা?
সেসব শুনে তোমার লাভ নেই। আমার মন খুব খারাপ।
সজল অসহায় মুখ করে বলল, তোমাকে কিছু বলতে আমার ভয় হয়। যা রেগে যাও! কিন্তু বীণা, আমার অপরাধটা কি?
তোমার অপরাধ কি কে জানে! কিন্তু আমাদের নিয়ে কথা হচ্ছে।
হোক না।
তুমি যত সহজে হোক না বলতে পারলে আমি তত সহজে বলতে পারব না। পুরুষমানুষদের অনেক সুবিধে, মেয়েদের তা নেই। সমাজের যত খবরদারি তো মেয়েদের ওপরেই। সেইজন্য আজকাল পুরুষ জাতটার ওপরেই আমার ঘেন্না হয়।
