তার বাবা বিষ্ণুপদর স্বভাব হল, সংসারের কোনও ব্যাপারেই জোরালো মতামত নেই। বিষ্ণুপদ ছেলেপুলেদের শাসন-টাসন করত না। তার চোখের সামনে কোনও অন্যায় অবিচার দেখলেও বিষ্ণুপদ রা কাড়ত না। ওটাও একরকম মূক বধিরতা। বাবার কাছ থেকে ওই স্বভাবটি পেয়েছিল কৃষ্ণজীবনও। ভিতরটা যতই টগবগ করুক বাইরেটা শান্ত। সে কখনোই চেষ্টা করেনি রিয়াকে কিছু বোঝাতে বা শাসন করতে। চেষ্টা করলেও হয়তো পারত না। রিয়া বড্ড বেশী প্রখর, বড় বেশী মুখর।
কৃষ্ণজীবনের ওই আংশিক মূক-বধিরতা তার আর রিয়ার মধ্যে কোনও সেতুবন্ধন রচনা করতে দেয়নি। এক ঘরে থেকেও তারা পরস্পরের অচেনা থেকে গেছে। আর রিয়া তার ওপর ক্ষেপে উঠত সেইজন্যই। রাগ বাধা না পেলে অনেক সময়ে স্তিমিত হয়ে যায়। কিন্তু অনেক সময় উল্টোটাও হতে পারে। মানুষের চরিত্র ততা নানা বৈচিত্র্যে ভরা। রিয়া হয়তো চাইত, কৃষ্ণজীবন তার প্রতিবাদ করুক। তাতে বোধহয় রিয়ার ধার বাড়ত। যত সে চুপ করে থেকেছে ততই রাগ বেড়েছে। রিয়ার। বাড়তে বাড়তে আজ কৃষ্ণজীবনকে প্রায় পাপোশ বানিয়ে ছেড়েছে রিয়া।
রাগের কারণ অনেক। প্রথম কারণ, কৃষ্ণজীবনের নিম্নবিত্ত, নিম্নরুচি ও নিচু কালচারের পরিবার। অর্থাৎ কৃষ্ণজীবনের স্নান পটভূমি। আর দ্বিতীয় কারণ, কৃষ্ণজীবনের নিরীহ অনুত্তেজক ব্যক্তিত্ব। বা ব্যক্তিত্বের অভাব। তৃতীয়, চতুৰ্থ, পঞ্চম আরও নানা দাম্পত্য কারণ তো আছেই। সব সময়ে যথেষ্ট কারণেরও দরকার হয় না।
রাগ! রাগই রিয়াকে চালায়। রাগই তার চালিকাশক্তি। তার রাগের চোটে ঝি থাকে না। বাড়িওলার সঙ্গে খিটিমিটি বাধে, ছেলেমেয়েরা জড়োসড়ো হয়ে থাকে। তাদের সংসারে আনন্দের লেশমাত্র নেই।
তাকে উসকে তোলার জন্য, দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ করার জন্যই কি বিয়ের দুবছরের মধ্যেই একদিন, বাচ্চার জন্য কৌটোর দুধ আনতে ভুলে গিয়েছিল বলে, রাত বারোটা নাগাদ কৃষ্ণজীবনের হাতের বোটানির ভারী বইটা কেড়ে নিয়ে সেটা দিয়েই তার মাথায় মেরেছিল রিয়া? সরাসরি হাত তোলেনি, শুধু বইটা দিয়ে মেরেছিল।
ভারী বই। খুব সজোরে এসে মাথায় লাগতেই ঢলে পড়ে গিয়েছিল সে। মাথা অন্ধকার। আঘাতটা বড় কথা নয়। মানুষ মাঝে মাঝে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে। সে ওভাবে পড়ে যাওয়ায়, নিজের কৃতকর্মে অনুশোচনায় পাগলের মতো আচরণ করতে শুরু করেছিল রিয়া। কৃষ্ণজীবন মাথার সাময়িক অন্ধকার কাটিয়ে উঠে রিয়াকে সান্ত্বনা দিয়েছিল। কান্না থামিয়েছিল। বলেছিল, কিছু নি। আমার একটুও লাগেনি।
আমি যে তোমাকে মারলাম? এ কী করলাম আমি?
মার! একে কি মারা বলে? তুমি বইটা রাগ করে ছুঁড়ে ফেলতে গিয়েছিলে। আমিই তে এগিয়ে যেতে গিয়েঠিক গুছিয়ে মিথ্যেটা সাজাতে পারল না কৃষ্ণজীবন। সেই দক্ষতা তার নেই। তবে কাজ হল। রিয়া শান্ত হল।
কিন্তু অনেকক্ষণ তার দিকে চেয়ে থেকে বলল, তুমি খুব অদ্ভুত।
এ কথাটা কৃষ্ণজীবনের বিশ্বাস হয়। সে কিছু অদ্ভুত। রিয়া মিথ্যে বলেনি।
তার নিজের চারদিকে একটা গুটিপোকার খোলস আছে। প্রকৃত কৃষ্ণজীবন বাস করে সেই খোলর মধ্যে। সেখানে শক্ত হয়ে থাকে সে। বাইরের কারও সঙ্গেই তার সম্পর্ক রচিত হতে চায় না সহজে।
সম্পর্ক রচনা হল না তার বড় দুই সন্তানের সঙ্গেও। ব্যস্ততা বা সময়ের অভাব নয়, আগ্রহের অভাব নয়। অভাব পড়ল বাক্যের। অভাব পড়ল ভাব প্রকাশের। যখন ছোটো শিশু ছিল তখন একরকম। যখন বড় হল, বুঝতে শিখল, মতামত হতে লাগল, তখন অন্যরকম।
আজ সাতলার ফ্ল্যাটে তার সংসার। রিয়া আর সে দুজনেই অধ্যাপনা করে। মিলিত রোজগার আর ধার মিলিয়ে। কষ্ট করে কেনা। ধার এখনও অনেক শোধ হওয়ার বাকি। কিন্তু কোনওদিন এই ফ্ল্যাটটার সঙ্গেও কেন একটা আপন-আপ ভাব রচনা করা হল না কৃষ্ণজীবনের পক্ষে? কেন কেলই মনে হয় এ পরের বাড়ি?
এইসব কারণেই কৃষ্ণজীবনের কেবল মনে হয়, তার সবটুকুকে সে জড়ো করতে পারেনি আজও। এখানে ওখানে তার টুকরো টাকরা পড়ে আছে আজও। অনেকটাই পড়ে আছে ওই অজ পাড়াগাঁয়ে। মেটে ঘর, দারিদ্র্যের ক্লিষ্ট ছাপ চারদিকে, প্রতি পদক্ষেপে এক পয়সা দুপয়সার হিসেব রাখতে হয় মাথায়। নুন আনতে সত্যিই পান্তা ফুরোয়। তবু সেইখানে তার অনেকটা পড়ে আছে।
কৃষ্ণজীবন একবার একটা পেপার পড়তে আমেরিকা গিয়েছিল। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে যেতে হয়েছিল তাকে। রিয়ার ইচ্ছেতেই বিশেষ করে। স্বামী একবার বিদেশ ঘুরে এলে তার মুখ কিছু উজ্জ্বল হয়। ফলে একটা আলগা আমন্ত্রণপত্র যা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামেশাই আসে, ব্যক্তিবিশেষকে নয়, সেই নৈর্ব্যক্তিক একটি আমন্ত্রণলিপিকে অবলম্বন করে, বিস্তর চিঠি চালাচালির পর সে রাহাখরচ ও অন্যান্য ক্ষতি স্বীকার করে গিয়েছিল। সেখানে সেই ঝা-চকচকে, উন্নত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সভ্যতার দেশে পা দিয়েও তার মনে হয়েছিল উত্তর চব্বিশ পরগনার সেই অজ পাড়াগাঁ তার সঙ্গেই এসেছে। ধুলোটে পা, চোখে অসহায় আত্মবিশ্বাসহীন দৃষ্টি, ভিতরে কেবলই বিস্ময়ের পর বিস্ময়।
খুবই বিস্ময়ের কথা, পৃথিবীর বাতাবরণের ওপর তার বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধটি সেখানে বিস্তর কদর পেল। শুধু হাততালি দিয়ে কদর জানানো নয়। সাহেবরা যার মূল্য বুঝতে পারে সেটাকে বাস্তবসম্মত ভাবেই কদর দেয়। একটা ফাউন্ডেশন তার যাবতীয় রাহাখরচ আর হোটেলের ব্যয় মিটিয়ে দিল। সঙ্গে দিল কিছু দক্ষিণাও। এক আশাতীত পুরস্কার। আজকাল মাঝে মাঝে তাকে আমেরিকা যেতে হয়। নিজের উদ্যোগে আর নয়, পুরোপুরি আমন্ত্রণ পেয়েই সে যায়। সারা পৃথিবী জুড়ে একটা দুশ্চিন্তা আতঙ্কে পরিণত হচ্ছে ক্রমে। ওজোন হোল, গ্লোব ওয়ার্মিং, সমুদ্রের জলস্তরে স্ফীতি। দ্বীপ রাষ্ট্রগুলি ইতিমধ্যেই চারদিকে করুণ আবেদন জানাতে শুরু করেছে—কিছু একটা করো, নইলে অচিরে আমাদের প্রিয় ভূখণ্ড তলিয়ে যাবে সমুদ্রে।
