চিঠিটা খুলে বীণা খানিকক্ষণ বজাহতের মতো বসে রইল।
নিমাই লিখেছে : কল্যাণীয়াসু, শ্ৰীভগবানের পাদপদ্মে তোমার কুশল কামনা করি। হয়তো পত্ৰ পাইয়া অবাক হইবে। তোমার নাটকের দলের একটি ছেলের নাম সজল রায় দিনকতক আগে আসিয়াছিল। তোমার সম্পর্কে আমার দাবি-দাওয়া কতটুকু তাহা জানিতে চায়। সে তৃতীয় ব্যক্তি, তাহার কাছে কী বলিব? কিন্তু তাহার আগ্রহ ও ব্যস্ততা দেখিয়া মনে হইল, ইহার পিছনে অন্য কারণ আছে। বীণা, সজলকে পাঠাইলে কেন? তোমাকে তো আমার অধীনস্থ কখনও থাকিতে হয় নাই। আমিই তো তোমার অন্নদাস ছিলাম। কোন বাধনে তোমাকে বাধিব? আমার না আছে জোর, না যোগ্যতা। তোমার বন্ধন তো কখনও ছিল না। বহুকাল আগেই তোমাকে বলিয়াছি, আমাকে ছাড়িয়া যদি অন্য কাহাকেও বিবাহ কর তাহাতে। আমার অপমান হইবে না। আমার কোনও স্বত্ব-স্বামীত্ব নাই। তবু যদি আদালতের রায় প্রয়োজন হয় তবে পত্রপাঠ সেই ব্যবস্থা করিও। আমি আইনের বন্ধনটুকু খুলিয়া দিতে সাহায্য করিব। আমরা যে স্তরের মানুষ সেই স্তরের মানুষের কাছে আইন আদালতের প্রয়োজন হয় না। মোটা অপরাধ না করিলে দেশের আইন আমাদের স্পর্শ করিবে না। তোমার ও আমার বিবাহের কোনও দলিল নাই, সাক্ষীসাব্বুদও নগণ্য। তাহার চেয়েও বড় কথা আমার দিক হইতে তুমি সম্পূর্ণ মুক্ত। নিমাই অপদাৰ্থ হইলেও, মিথ্যাবাদী নহে। নিশ্চিন্ত থাকিও। সজলবাবুর আগ্রহ দেখিয়া নিজেই তোমাকে সব জানাইয়া দিলাম। সর্বদাই তোমার মঙ্গল আকাঙ্ক্ষা করি। শুভকামনা জানাইয়া রাখিলাম। অনর্থক আমাকে বাধা কল্পনা করিয়া বিব্রত হইও না। ইতি নিমাইচরণ রায়।
বীণা চিঠিটা বার কয়েক পড়ল। কেন পড়ল এবং বারবার পড়েও যেন একটা সংকেতবাক্য কেন উদ্ধার করতে পারল না তা নিজেও বুঝতে পারল না। ভরদুপুরে বন্ধ ঘরের মধ্যে বিছানায় অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। সজল গিয়েছিল তা সে জানে। এসে বলেছিল, বীণা, তোমার হাজব্যান্ডের সঙ্গে আলাপ করে এলাম।
বীণা একটু অবাক হয়ে বলল, কেন?
এমনিই। মানুষটা কেমন তা একটু জরিপ করে এলাম।
তার কোনও দরকার ছিল কি?
আমার ছিল।
কেন, সেটা বলবে তো?
সজল একটু হেসে বলল, কেন বোকা সাজছ? কেন গিয়েছিলাম তা তুমি জানো।
বীনা একটু চুপ করে থেকে বলল, কী বলেছে ও?
তেমন কিছু নয়। তবে সে তোমাকে মনে মনে ত্যাগ করেছে। ডিভোর্স দিতে রাজি।
সেটা আমি জানি।
তুমি কি মন থেকে ওকে ছাড়তে পারোনি এখনও?
বীণা একটু ভেবে বলল, তা হয়তো পেরেছি। কিন্তু বাড়াবাড়ির দরকার ছিল না। আমার কোনও কাজে বাধা দেওয়ার সাহস ওর নেই। আমি যখন যা খুশি করব, ওর অনুমতি বা মতামতের দরকার আমার হয় না। তুমি ওর কাছে গিয়ে বরং আমাকেই অপমান করেছ।
যাঃ, এ তো উল্টো কথা শুনছি!
উল্টো নয়। সজল। আমি তো কারও ক্রীতদাসী নই।
তা তো নাও জানি।
না, জানো না। জানলে ওর কাছে দৌড়ে যেতে না। এ কথা কেন ভুলে যাও যে, আমার ভবিষ্যৎ আমারই হাতে! আমার জীবনটা আমারই! সেখানে কোনও পুরুষের কোনও ভূমিকাই নেই। আমি ওকে মানি না। তোমার যা কিছু বলার তা আমাকেই বলতে পারতে। ওর কাছে কেন গেলে?
সজল একটু যেন ভয় পেল। বলল, ভুল হয়ে গেছে বীণা। মাপ করে দাও।
সজলের সঙ্গে তার সম্পর্ক এর পর আরও একটু গাঢ় হয়েছে। সজল মেয়েদের ব্যাপারে সাহসী পুরুষ। অনেক পুরুষের শুধু এই একটা ব্যাপারে খুব সাহস আর আত্মবিশ্বাস থাকে। কিন্তু বীণাও কম পুরুষের সঙ্গে মেশে না। সে সজলকে একটু লাগাম পরিয়ে রাখল। খুব কাছাকাছি হতে দিল না।
সম্পর্কটা একটা জায়গায় থেমে আছে। বীণা শরীরের সম্পর্কে যেতে চায় না। ওটা ঘটে গেলে বেইমান পুরুষ ওইটেই চাইবে। দায়িত্ব নিতে পিছপা হবে।
সজল প্রায়ই আসে। চা খায়। রাত নটা দশটা অবধি গল্প করে। তারপর নানা ইশারা ইঙ্গিতের ব্যর্থ চেষ্টা করে চলে যায়। একদিন বলেই ফেলল, আজ জ্যোৎস্না রাত ছিল বীণা, দুজনে যদি সারা রাত একসঙ্গে জেগে থাকতে পারতাম!
বীণা তাকে একটা ধমক দিলে বলল, বাড়ি যাও।
তাড়িয়ে দিচ্ছ?
মেয়েদের সঙ্গে ফস্টিনষ্টি করা ছাড়া যে-সব পুরুষের আর কোনও বড় কাজ থাকে না তাদের মেয়েরা পছন্দ করে না সজল।
আমাদের মতো ছেলের আর কী বড় কাজ থাকবে বলো তো বীণা? আমি ইস্কুল-কেরানির ছেলে, কষ্টেসৃষ্টে বড় হয়েছি। লেখাপড়াও করেছি। কিন্তু ওসব লেখাপড়ায় তো কিছু হয় না। বাংলায় এম এ হয়েও একটা মাস্টারির চাকরিও জোটাতে পারিনি। অনেক টাকা দিতে হয়, তবে মাস্টারি মেলে। বড় কিছু করতেই তো সিনেমায় নামার জন্য ঘোরাঘুরি করতাম। হয়নি। ঘুরতে ঘুরতে কাকার দলে। কী বড় হবো বলো তো! কি ভাবে বড় হওয়া যায়? এ দেশে আমাদের মতো ছেলের জন্য ওপরে ওঠার কোনও সিঁড়ি নেই। এ তো তুমিও জানো বীণা ।
জানি। কিন্তু তোমার মধ্যে চেষ্টাও নেই।
চেষ্টা নেই? না, কথাটা ঠিক হয় না। এ কথা ঠিক যে, অভিনয়ে আমি খুব পাকা নই। কিন্তু শেখার চেষ্টা করেছি। হয়নি, কি করবো বলো?
নাটক লিখতে পারো না? বাংলায় এম এ, তোমার তো লেখার হাত থাকা উচিত।
ছিল একসময়ে। নাটক নয়, কবিতা লিখতাম। কিন্তু ওসব পোষাল না। কবিতার লাইনেও বেজায় ভিড়। সব লাইনেই দারুণ কমপিটিশন।
বীণা হেসে ফেলে বলেছিল, আজ বাড়ি যাও। জ্যোৎস্না রাতে আমার খুব ঘুম পায়।
তুমি যখন বলছি, নাটক লেখার চেষ্টা করব। কিন্তু তাতেও কিছু হবে না। আমি জানি।
