চয়ন প্ৰচণ্ড অবাক হয়ে বলে, আমার!
নাও নাও।
আজ্ঞে আমি! বলে সঙ্কুচিত হাতে ফুলের তোড়া আর প্যাকেটটা নিল চয়ন। রীতিমতো ভারী দুটোই!
কৃষ্ণজীবন উদার হাসি হেসে বলল, উপহারে উপহারে আমি জর্জরিত। আর উপহার রাখার জায়গা নেই। ওটা তুমি নিয়ে যাও। কোনও সুইটহার্ট থাকলে ফুলের তোড়াটা তাকে দিও। আর বাক্সের মধ্যে কী আছে তা আমিও জানি না। বাড়িতে গিয়ে খুলে দেখো, উইস ইউ এ গুড লাক।
রিয়া বলল, নাও চয়ন। লজ্জার কিছু নেই। চা-টা কিছু খাওনি এখনও?
মোহিনী চা করতেই গেল।
তাহলে বোসো একটু। ওগো তুমি একটু চয়নের সঙ্গে কথা বলো, আমি একটু দেখে আসি মেয়েটা কী করছে।
কৃষ্ণজীবন বসল। এই সুপুরুষ, মহাপণ্ডিত এবং বিখ্যাত মানুষটির সামনে চয়ন বরাবরই অস্বস্তি বোধ করে। সে শুনেছে, ঐর একখানা বই ডারলিং আর্থ খুব হইচই ফেলে দিয়েছে বিদেশে। তাতে সে আরও সংকুচিত বোধ করে। নিজের সামান্যতা নিয়ে সে সর্বদাই বিব্রত।
কৃষ্ণজীবন বলল, তোমার একটা পারিবারিক অশান্তি ছিল না? ডিটেলস ভুলে গেছি, বোধ হয় তোমার দাদার সঙ্গে গণ্ডগোল। সেটা কি এখনও আছে?
চয়ন লজ্জায় মরে গিয়ে বলল, মা মারা যাওয়ার পর থেকে সম্পর্কটা ততটা খারাপ নেই।
ভাল। খুব ভাল। তাহলে মা ছিল দি স্টােম্বলিং ব্লক? বলে খুব হাঃ হাঃ করে হাসল। হাসি থামিয়ে বলল, চারদিকে খুব ভাগাভাগির হুজুগ পড়েছে, দেখেছ? সবাই ভাগ হতে চায়। স্ত্রী চায়, মা-বাপের সঙ্গে সন্তান ভাগ হতে চায়, ভাইয়ে বোনে ভাগ হতে চায়। এমন কি দেশের নানা মানবগোষ্ঠীও চায় ভাগাভাগি করে আলাদা রাষ্ট্র তৈরি করতে। হাওয়ায় এ এক নতুন জীবাণু ঢুকেছে। সম্প্রীতি সংহতির কথা বলে আর কী লাভ বলো তো! ওসব কথায় কেউ কানই দিচ্ছে না। মেয়েরাও বোধ হয় ভাগ হতে চাইছে। নারী স্বাধীনতা নিয়ে কী বিরাট হইচই!
চয়ন মাথা নেড়ে বলে, যে আজ্ঞে।
কৃষ্ণজীবন খানিকক্ষণ আনমনে একটা ক্যাবিনেটের দিকে চেয়ে থেকে বিড়বিড় করে বলল, মানুষ ধীরে ধীরে বড় চিন্তা করতে ভুলে যাবে। চিন্তারাজ্যও খণ্ড খণ্ড হয়ে যাবে তার। সে ছোট করে ভাবতে শুরু করবে। ছোট ছোট কথা ভাববে। মানুষ কি খুব স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে চয়ন?
চয়ন একটু বিব্রত হয়ে বলে, যে আজ্ঞে।
কৃষ্ণজীবন হতাশায় একটু মাথা নাড়া দিয়ে বলে, আমার সংসারেও অনেক অশান্তি, আমার মা-বাবা এখনও বেঁচে আছেন। কিন্তু সে এক অদ্ভুত বেঁচে থাকা। দু ভাইয়ের প্রচণ্ড ঝগড়া। এক ভাই আলাদা হয়ে গেছে—কেন এসব হয় বলো তো!
কঠিন প্রশ্ন। চয়ন বিনীতভাবে চুপ করে থাকে।
কৃষ্ণজীবন মাথা নেড়ে বলে, কি মনে হয় জানো? মানুষের কোনও গন্তব্য নেই, শুধু গতি আছে। সে কোথায় চলেছে তা সে জানেই না।
যে আজ্ঞে।
এরপর এক গভীর অন্যমনস্কতায় ড়ুবে রইল কৃষ্ণজীবন। চয়নকে ভুলেই গেল বোধ হয়। মিনিট পাঁচেক এই মানসিক অনুপস্থিতির পর স্বপ্লোখিতের মতো মাথা তুলে কৃষ্ণজীবন তার দিকে চেয়ে বলল, ওঃ হো, তোমাকে একটা কথা বলাই হয়নি। আমার এক ছাত্র মস্ত এক কোম্পানির বড় কর্তা, তাকে তোমার কথা বলেছিলাম। সে তোমাকে দেখা করতে বলেছে। কিন্তু সে তো বোধ হয় মাস দুই আগের কথা। ভুলেই গিয়েছিলাম।
চয়নের বুক দুরুদুরু করে উঠল। কিছু বলল না।
কৃষ্ণজীবন একটা শ্বাস ফেলে বলল, দেখ, আমার কাছে তোমার চাকরিটা এতই সামান্য ব্যাপার যে মনেই ছিল না। অথচ তোমার কাছে ব্যাপারটা বড় গুরুতর। কেন যে আজকাল আমার এমন সব ভুল হয়!
চয়ন বিনয়ের সঙ্গে বলল, তাতে কি? আমি না হয় তাঁর সঙ্গে একবার দেখা করব।
হ্যাঁ হ্যাঁ, বোধ হয় খুব দেরি হয়ে যায়নি। খুব বড় কোম্পানি! সবসময়ে লোক দরকার হয়। তুমি বোসো, আমি একটা চিঠি দিয়ে দিচ্ছি। তোমাকে। কালই দেখা কোরো।
যে আজ্ঞে।
বিশাল উপহারের বাক্স, ফুলের তোড়া এবং পকেটে কৃষ্ণজীবনের চিঠি নিয়ে চয়ন যখন বাড়ি ফিরল। তখনও সে বুঝতে পারছিল না, আজকের দিনটা তার ভাল গেল না খারাপা! এক দিনে অনেকগুলো ঘটনা ঘটে যাওয়ায় সে একটু বেসামাল বোধ করছে। মাতালের মতো।
তালা খুলে ঘরে ঢুকে সে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। ঘটনাগুলো বাস্তব কি না একটু সন্দেহ হচ্ছিল তার।
স্টোভ জ্বেলে যখন রান্না করতে বসেছে চয়ন, তখনই হঠাৎ মনে হল, অন্ধকার ছাদে জলের ট্যাঙ্কের পাশে কেউ দাঁড়িয়ে, তার দিকেই মুখ।
চয়ন তাকাতেই অনিন্দিতা চাপা গলায় বলল, অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি। চয়নের হাত পা হিম হয়ে গেল আজ। অনিন্দিতাকে তার তো ভয় পাওয়ার কথা নয়।
অনিন্দিতা এগিয়ে এল। কাছে। বলল, বাবা তোমাকে আজ কী বলেছে বলো তো?
চয়ন লজ্জায় গুটিয়ে গিয়ে বলল, ও কিছু নয়।
বাবার মাথাটাই গেছে। কী সব আবোল-তাবোল ভাবে, প্ল্যান করে, তার ঠিক নেই। তুমি বাবাকে সিরিয়াসলি নিও না।
চয়ন চুপ করে রইল।
এ কথাটা বলার জন্যই আজ রিস্ক নিয়েও ছাদে এসেছি। তোমার দাদা-বউদি আমাদের ছাদে আসা বন্ধ করেছে, জানো তো?
জানি।
তবু বাবার জন্যই আসতে হল। বাবাকে নিয়ে আমাদের অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। কিছু মনে কোরো না।
চয়ন হঠাৎ বলল, অনিন্দিতা, একটা জিনিস নেবে? বলেই ফুলের তোড়া আর উপহারের বাক্সটা ঘর থেকে এনে তাকে দিয়ে বলল, নিয়ে যাও।
এ কী? এ দিয়ে কি হবে?
নাও। নিলে আমার ভাল লাগবে।
অনিন্দিতা তার সুন্দর দাঁতে চমৎকার হাসল, আচ্ছা নিলাম।
০৮০. চিঠিটা এল দুপুরে
চিঠিটা এল দুপুরে। মুখ আঁটা একটা খাম। হাতের লেখা অচেনা। বীণার ঠিকানায় চিঠি আসেও না বড় একটা। ন মাসে ছ। মাসে বিষ্টুপুর থেকে মা কিংবা বাবা লেখে।
