কেন বলে তো! দোষোটা কোথায়?
ঘর বাধা তো বিলাসিতা নয় মেসোমশাই। তার পেছনেও অনেক ব্যাপার থাকে। আপনি তো নিজেই জানেন কত সমস্যায় আমরা দিন কটাই। আমার চালচুলো নেই, টিউশনি সম্বল, আমাকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন নিতান্ত আহাম্মকেও দেখবে না। আপনি ভুল বুঝেছেন মেসোমশাই।
ভদ্রলোক কথাটা স্বীকার করতে চাইলেন না, বললেন, ওটা কোনও কথা নয়। তোমার মধ্যে গুণও কিছু কম নেই, একদিন দাঁড়িয়ে যাবে। আর ফিটের ব্যামো? ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলে, ওতে বিয়ে সাদী চলতে পারে।
আপনারা অনেক দূর ভেবে ফেলেছেন, কিন্তু ওসব ভাবতেই আমার সংকোচ হয়, লজ্জাও হয়।
অনিন্দিতার বাবা মুখখানা কানের কাছ বরাবর রেখেই বললেন, আমি তো এর মধ্যে লজ্জার কিছু দেখছি না। অনিন্দিতার ভাবগতিক দেখে মনে হয়, ওর আগ্রহ আছে। তোমার শুধু একটু আত্মবিশ্বাসের দরকার।
মুনি একটা হতাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আপনি বাড়ি যান মেসোমশাই, এ নিয়ে আর ভাববেন না। আমি বড় অপদাৰ্থ।
দাঁড়াও। কথাটা এখনও শেষ হয়নি। আমার পরিবার তো দেখেছি। তিন জনের সংসার। আমার ছেলেও নেই। আমার খুব মনে হয়, সংসারটা যেন অসম্পূর্ণ, আর একজন কাউকে যেন দরকার ছিল ফাকাটা ভরাট করতে। এদিকে তোমারও তো আসলে কেউ নেই। তোমারও একটা স্থায়ী এবং নিরাপদ আশ্রয় দরকার। যদি অনিন্দিতাকে বিয়ে করো তাহলে আমরা চার জন মিলেমিশে বেশ থাকতে পারব। আমাদের বড় জনের অভাব। যদি এর মধ্যে ঘরজামাই প্রথার কথা মনে হয় তাহলে সেটা ভুল হবে। অস্তিত্বের সংকটেই আমাদের একসঙ্গে থাকাটা দরকার। তোমাকেও দেখাশোনা করার লোক হবে। যদি রাজি থাকো তাহলে আমি হাতের পাতের যা আছে সব দিয়ে জমিতে একখানা বাড়ি তুলি। তারপর চার জন নিশ্চিন্তে গিয়ে সেখানে থাকি।
চয়ন ম্লান একটু হেসে বলল, আপনি কি অনিন্দিতার সঙ্গে কথা বলেছেন?
সরাসরি নয়। তবে হাবেভাবে বুঝেছি।
আপনি আরও একটু ভাবুন। অনিন্দিতার সঙ্গে কথাও বলুন।
সে না হয় বলব, কিন্তু তোমার মনোভাবটা আগে জানা দরকার।
আমাকেও একটু সময় দিন।
আমার মনে হয় কি জানো? তোমাদের বিয়ে হলে সব সমস্যার সুষ্ঠু একটা সমাধান হয়ে যায়।
সমস্যার সমাধান! কি জানি, হয়তো নতুন সমস্যাই হবে একটা।
না না, কোথাও সমস্যা হবে না। তুমি একটু পজিটিভলি ভাবো। নেগেটিভ ভাবলে কিছুই হতে চায় না।
ভাবিব, এখন তবে আমি যাই?
এসো গিয়ে।
একা হতে পেরে চয়ন হাঁফ ছাড়ল। তারপর গভীরভাবে চিন্তিত হয়ে পড়ল।
তার চিন্তান্বিত মুখ দেখে আজ মোহিনীও জিজ্ঞেস করল, চয়নদা, আপনার শরীর আবার খারাপ করেনি তো!
না, ঠিক আছে।
তবে মুখ অত শুকনো কেন?
চয়ন একটু হেসে বলল, দুনিয়াটা একটা পাগলা, না?
বাঃ রে, তার মানে কী হল?
মানে! না, এর কোনও মানে নেই।
আপনি ঠিক আমার বাবার মতো হয়ে যাচ্ছেন। বাবাও মাঝে মাঝে অদ্ভুত অদ্ভুত সব কথা বলে।
চয়ন একটু লজ্জা পেয়ে বলে, তাই নাকি?
মোহিনী হেসে ফেলে বলল, কাল রাতেই তো, খাওয়ার টেবিলে সবাই চুপচাপ বসে খাচ্ছি, বাবা হঠাৎ বলে উঠল, আজকে আমার মনের মাঝে ধাই ধপাধপ তবলা বাজে। আমরা তো অবাক!
চয়ন লজ্জিত মুখে চুপ করে রইল। কিন্তু পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে তার বুক কেঁপে কেঁপে ওঠে মাঝে মাঝে। একটু যেন শ্বাসকষ্ট হয়। বারবার আনমনা হয়ে যায় সে। তাকে নিয়ে এসব কী হচ্ছে?
পড়ানোর এক ফাঁকে চয়ন হঠাৎ বলল, ভীতু আর দুর্বলদের একটা অসুবিধে কি জানো? তারা ঘটনাবলীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাদের দিয়ে যে যা-খুশি করিয়ে নেয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ওরে ভীরু, তোর ওপরে নেই ভুবনের ভার।
মোহিনী হেসে ফেলল, চয়নদা, আজ নিশ্চয়ই একটা সিরিয়াস ঘটনা ঘটেছে, তাই না? আজ আপনি ভীষণ আনমাইণ্ডফুল, কী হয়েছে?
চয়ন মাথা নেড়ে বলল, বলা যায় না।
তাহলে বলবেন না, কিন্তু রাস্তায়-ঘাটে আজ একটু সাবধান থাকবেন। অত আনমাইণ্ডফুল হলে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যেতে পারে।
না, তা হবে না। তবে আজ আমি একটু চঞ্চল ঠিকই।
চয়ন উঠতে যাচ্ছিল, মোহিনী বলে উঠল, দাঁড়ান চয়নদা, আপনাকে যে চা দেওয়া হয়নি।
তাতে কি? আজি থাক।
না না, বসুন, আজ মা বাড়ি নেই, বাবার সঙ্গে একটা রিসেপশনে গেছে। আমাকে বলে গেছে যেন আপনাকে চা-টা দিই। দেওয়া হয়নি শুনলে মা ভীষণ বকবে। বসুন।
মোহিনী উঠে গেলে চয়ন চুপ করে বসে রইল। মনের ভিতরে একটা উথালিপাথাল হচ্ছে। ভয় হচ্ছে, তার ভয়, সে প্রতিরোধহীন, বিয়ে করার প্রশ্নই ওঠে না, কিন্তু অনিন্দিতার বাবা যদি জোরজবরদস্তি শুরু করে, যদি নানারকম কৌশলের আশ্রয় নেয়, তাহলে? যদি প্রতিরোধ ভেঙে যায় তার?
ডোরবেল বাজাল। দরজা খুলল। করিডোরে পায়ের শব্দ আর একঝলক বিদেশি পারফিউমের সুবাস ভেসে এল। পড়ার ঘরের দরজাটা খোলাই ছিল রিয়া উঁকি দিয়ে বলল, চয়ন একা বসে কেন?
তটস্থ হয়ে চয়ন বলে, মোহিনী বসিয়ে রেখে গেল।
রিয়ার পিছনে কৃষ্ণজীবন, হাতে মস্ত ফুলের তোড়া আর একটা বড়সড় ঝলমলে সোনালি রঙের বাক্স। বলল, চয়ন নাকি? কী খবর তোমার? অনেকদিন দেখা নেই।
চয়ন শশব্যাস্তে উঠে দাঁড়াল, আজ্ঞে ভালই।
কৃষ্ণজীবন আর রিয়া ঘরে ঢুকল, কৃষ্ণজীবন চারদিকটা চেয়ে দেখে অকারণেই বলে উঠল, বাঃ!
কেন বাঃ, কিসের বাঃ, তা বুঝতে পারল না চয়ন। কৃষ্ণজীবন হঠাৎ ফুলের তোড়া আর বাক্সটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, নাও, এগুলো তোমার।
