কি কথা?
তোমার দাদা-বউদি আকারে ইঙ্গিতে বলতে চাইছে যে, তোমার সঙ্গে অনিন্দিতার একটা সম্পর্ক হয়েছে। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
চয়ন মৃদু হেসে বলল, না মেসোমশাই। ওসব কথা মিথ্যে করে রটানো হচ্ছে। সত্যি নয়।
ভদ্রলোক তার মুখের দিকে স্তিমিত চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, আজকাল ছেলেরা আর মেয়েরা তো আখছার মেলামেশা করে। এটাকে একটা ইসু করে তোলাটা কি ঠিক? তোমার দাদা এই কারণ দেখিয়ে আমাদের তুলে দিতে চাইছে।
চয়নের মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভদ্রলোকের অবস্থা সে জানে। বাসা বদলানো এর পক্ষে শক্ত ব্যাপার। সে মৃদু স্বরে বলল, আপনারা বুঝিয়ে বলুন যে ওঁদের সন্দেহটা সত্যি নয়।
মাথা নেড়ে অনিন্দিতার বাবা বললেন, মানুষ যখন গো ধরে তখন কিছুই বুঝতে চায় না। তোমাকে নাকি একদিন চড়ও মেরেছে শুনলাম। অত্যন্ত অন্যায়। ছিঃ।
চয়ন বলে, আমার জন্য ভাববেন না! আমি তো ভুলেই গেছি।
ভদ্রলোক ঘন ঘন মাথা নেড়ে বললেন, অনিন্দিতারও উচিত হয়নি তোমাকে বিপন্ন করা। তোমার অসুখের সময় যখন মা-মেয়ে সেবা করতে এল তখনও আমি বারণ করেছিলাম। বলেছিলাম, চয়নের দাদা-বউদ্দি থাকতে তোমরা আগ বাড়িয়ে ওদের ডিঙিয়ে এসব করছি কেন? কিন্তু ফ্যামিলিতে আমার তো ভয়েস নেই। আমার মতামত বুদ্ধি পরামর্শকে ওরা গ্রাহ্যই করল না।
যা হওয়ার হয়ে গেছে, ও নিয়ে ভেবে আর কী করবেন?
ভাবনা কি ছাড়ে? দুখানা স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার ঘরের জন্য মাসে আটশো টাকা ভাড়া দিচ্ছি। তাও সস্তাই। এর কমে ভদ্রস্থ বাসা তো পাওয়া যাবে না। আমার হার্ড আনড মানি। প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের সামান্য টাকা আর নামমাত্র পেনশন ভরসা। তা ভেঙেই চলছে। দিন দিন ব্যাঙ্কের টাকা কমছে। বড় ভয় হয়।
আপনি অত ভাববেন না, বরং বাড়িটা করে ফেলুন।
বাড়ি! বাড়ি করতে সব টাকা বেরিয়ে যাবে। খাবো কি? আমি তো তোমার মাসিমাকে বলেছিলাম, টিনের ঘর তুলে থাকি চলো। তা তাতে মা-মেয়ের ঘোর আপত্তি। পাকা বড়ি ছাড়া নাকি তাদের হবে না। মেয়েটার বিয়েরও তো খরচ আছে?
চয়ন ভেবে পেল না, এই ভদ্রলোককে সে এবার কী পরামর্শ দেবে।
সে মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
উনি বললেন, তোমার মাসিমা বা আমার শরীরও ভাল নয়। টুকটাক ডাক্তার বদ্যি ওষুধবিসুধের জন্যও টাকা বেরিয়ে যায়। আয় কমেছে, কিন্তু ব্যয় তো আর কমছে না।
চয়ন চুপ করে রইল, স্বগতোক্তির তো জবাব দেওয়ার দরকার হয় না।
ভদ্রলোক চশমাজোড়া চয়নের দিকে তাক করে ময়োনো গলায় বললেন, সব সমস্যার সমাধান হয় না জানি। তবু যখন যেটা দেখা দেয় সেটাই যেন আজকাল বড্ড কহিল করে ফেলে আমাকে। এই যে বাড়ি ছাড়ার জন্য হুড়ো দিচ্ছে, আমার রাতে ভাল ঘুম হচ্ছে না, প্রেসার বেড়ে গেছে, খাওয়ায় রুচি নেই। অথচ কত ভাড়াটে তো বাড়িওলার সঙ্গে যুঝে আছে। আমি কাটা হয়ে আছি।
চয়ন এ কথারও জবাব খুঁজে পেল না।
শুনলাম, তোমাকেও নাকি তাড়াবে! সত্যি নাকি;
চয়ন অত্যন্ত অস্বস্তি বোধ করে বলল, বলেছিল একবার।
তাহলে এখন তুমি কি করবে?
কী করব তা তো জানি না, ঠিক করিনি।
তোমার মাসিমা আর অনিন্দিতা তো বলছে, তারা ছেড়ে দেবে না। দরকার হলে মামলা-মোকদ্দমা অবধি করবে। আমি এসব শুনে বড় ভয় পাচ্ছি। স্ত্রী-বুদ্ধি বড় ভয়াবহ।
এবার চয়ন খুব সাবধানে বলল, অনিন্দিতা কিন্তু বেশ সাহসী মেয়ে। আপনি ওর ওপর নির্ভর করতে পারেন।
নির্ভর করব? বলো কি? এ যুগে সাহসের কোনও দাম আছে?
চয়ন একটা শ্বাস ফেলে বলে, আমি বড় ভীতু। মেসোমশাই, আপনার চেয়েও ভীতু। কিন্তু কারও সাহস দেখলে আমার বড় ভাল লাগে।
ভদ্রলোক কথাটা শুনে সন্তুষ্ট হলেন না। মাথা নেড়ে বললেন, মেয়েদের সাহস ভাল জিনিস নয়। অনিন্দিতার সাহসের কথা বলছ! ওকে সাহস বলে না, অনিন্দিতা বেপরোয়া। ওতেই তো অশান্তি হয়। কাউকে মান্যগণ্য না করা কি ভাল?
চয়ন ফের সতর্কভাবে বলল, মেসোমশাই, আপনাদের যা অবস্থা আমারও তো তাই, ভেবে কী হবে? আপনারাও শুনেছি বউদির আত্মীয়।
ভদ্রলোক মুখটা একটু বিকৃত করে বললেন, আত্মীয়তা যেটুকু সেটুকু না ধরলেও হয়। আজকাল কেউ আত্মীয়তা মানে নাকি? তোমাকে আর একটা কথা বলার ছিল, বলতে একটু লজ্জা পাচ্ছি।
বলুন না, আমাকে লজ্জা কিসের?
ভদ্রলোক একটু কাছে এগিয়ে এসে চাপা গলায় বললেন, আমার একটা কথা মনে হয়, বলব?
চয়নের বুকটা এবার একটু কেঁপে উঠল, মৃদু একটা শ্বাসকষ্টও টের পেতে লাগল সে। বোধ হয় এ কথাটা বলার জন্যই এত ভূমিকা, হঠাৎ চয়নের মাথার ভিতর একঝলক আলোর উদ্ভাস যেন তাকে জানিয়ে দিল, কথাটা কী। তবু সে অপেক্ষা করল, বিনয় এবং ধৈর্যের সঙ্গে।
ভদ্রলোক মুখটা তার কানের খুব কাছাকাছি। এনে বললেন, আমার মনে হয় তোমাকে অনিন্দিতার খুব পছন্দ।
চয়নের কান গরম হল, শ্বাসকষ্ট বাড়ল। তবু সে নিপাট ভোলমানুষের মতো বলল, হ্যাঁ। অনিন্দিতা আমাকে বন্ধু বলে মনে করে।
ভদ্রলোক এ জবাবে খুশি হলেন না। ঘন ঘন মাথা নাড়া দিয়ে বললেন, সে ব্যাপার নয়। ওর ছেলে বন্ধু তো আরও ছিল; তোমার প্রতি ওর মনোভাব একটু ডিপ। বুঝছি না?
না তো! চয়ন খুবই বিস্ময় প্রকাশ করে।
ওর বোধ হয় ইচ্ছে তোমার সঙ্গেই ঘর বাধে।
সয়ন জোর করে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে, কিছুটা সফলও হয়, মৃদু হেসে বলে, অনিন্দিতা বুদ্ধিমতী, এরকম চিন্তা সে স্বপ্নেও করবে না।
