তাহলে টাকাটা দিয়ে করবোটা কী?
দুজনেই খানিক ভোবল। তারপর বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, বরং মাঝে মাঝে একটু ভাল-মন্দ খাওয়াদাওয়া হোক। বাকি টাকাটা রেখে দাও।
নয়নতারা একটু ম্লান হেসে বলে, তাই হবে। কিন্তু টাকা পুষে রেখে আমাদের কী লাভ বলো তো! কে কবে আছি, কবে নেই, টাকাগুলো বেহাত হয়ে যাবে।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, তা ঠিক। কিন্তু তবু হাতে টাকা থাকলে মনে একটু বল ভরসা হয়। এখন রেমো যদি বাজার-হাট না করতে পারে তাহলেও আমরা চালিয়ে নিতে পারব।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ।
ঘরটা যদি সত্যিই পাকা করে দেয় কৃষ্ণ তাহলে কত ভাল হবে বলো তো!
খুব ভাল। বর্ষার জল পড়ে ঘর ভেসে যায়। শীতে ফুটো ফাটা দিয়ে হাওয়া ঢোকে। দরজা জানালার অবস্থাও তো ঝুরঝুরে।
দুজনের চোখেই একটা আশার আলো। একটা আনন্দের অনুভূতি আজ দুপুরটাকে বড্ড ফুরফুরে করে দিয়েছে।
নয়নতারা বলল, হ্যাঁ গো, বামা আর শ্যামলী যে এত ঝগড়া করে গেল, ওদের ফিরিয়ে আনা যায় না?
আনতে চাও?
কি জানো, কেমন একটা কষ্ট হচ্ছে। বামাটা তো ষণ্ডা গুণ্ডা নয়। সে এমনিতে নিরীহ। সেদিন রেগে গিয়ে দা নিয়ে উঠেছিল বটে, কিন্তু সে অত খারাপ নয়। মারধর খেল। বউমা গালমন্দ করলেও বামা কিন্তু শেষতক কিছু বলেনি। চুপটি করে ছিল।
তোমার হল মায়ের মন।
একটা ভয় খাই, জানো? শ্যামলী বাপের বাড়ি গিয়ে তো ঘোঁট পাকাবে। তারপর রেমোর পিছনে পুলিশ লাগাবে। গুণ্ডাদেরও লেলিয়ে দিতে পারে। শেষ অবধি খুনোখুনি না হয়। তার চেয়ে আপসে মিটে গেলে হয় না?
বিষ্ণুপদ একটু চুপ করে থেকে বলল, দুনিয়াসুদ্ধ যত ঝগড়া-কাজিয়া তার কোটা আপসে মিটছে বলো তো!
এ ঝগড়া মিটলেও বাইরে বাইরে মিটবে, ভিতরে ভিতরে শক্রতা থেকে যাবে। তবে লোভ দেখালে বামা ফিরতেও পারে। সে আমাদের ঘরখানা চেয়েছিল। এখন ঘরখানা পাকা হবে শুনলে সে লোভে পড়তে পারে।
নয়নতারা চুপ করে রইল। মুখখানা মলিন। কিছুক্ষণ পর বলল, শ্যামলী যে-সব কথা বলে গেল তা কি কেউ উচ্চারণ করতে পারে, বলো! আমাকে বেশ্যাও বলেছে, তোমাকে… উঃ, সে কথা ভাবলে গলায় দড়ি দিতে ইচ্ছে করে।
কথাই তো! কথার আর কী দাম বলো। এ যুগে সব দূষিত কথা লোকের মুখে মুখে এত ফিরছে যে কথাগুলোর ধার কমে গেছে। কেউ গায়ে মাখে না।
আমি তো কখনও এ সংসারে এইসব কথা কারও মুখে শুনিনি। এক রেমো মাতাল হয়ে এসে যখন চোঁচামেচি করে। তা সে মাতালের কথা। সে তো ধরতে নেই।
ভোলো, নয়নতারা, সব ভোলো। এই বয়সে আর কিছু শোধবোধ করতে পারবে না। লাথি খেলেও হজম করে যেতে হবে। ভুলে যাওয়াই ভাল। দশটা টাকা দেবে?
কী করবে?
নিতাইয়ের দোকানে বিকেলে রসগোল্লা হয়। গরম রসগোল্লা নিয়ে আসি গে। তারপর বুড়োবুড়ি বসে বসে খাই।
নয়নতারা একশ টাকার একখানা নোট এগিয়ে দিয়ে বলে, ভাঙিয়ে নিয়ে এসো। টাকা ফেরত নিতে ভুল কোরো না।
বিষ্ণুপদ হাসে, ছেলেমানুষ পেলে নাকি?
ছেলেমানুষ ছাড়া কি? ভোলানাথ শিবঠাকুর।
০৭৯. দাদার সঙ্গে সম্পর্কটা
দাদার সঙ্গে সম্পর্কটা কি খারাপ হয়ে গেল। অয়ন তার চরিত্র নিয়ে তাকে আর অনিন্দিতাকে জড়িয়ে কুৎসিত ইঙ্গিত করেছে, চড় মেরেছে—এ সবই যেন এই চিলেকোঠায় বাস করার বিনিময়ে সে ভুলে যেতে পারে। চয়নের মনে হয় এ বাসা থেকে উৎখাত হলে তার আর আশ্রয় বলে কিছু থাকবে না।
অনিন্দিতাদের সঙ্গে বউদির আজকাল একটু-আধটু ঝগড়া হচ্ছে প্রায়ই। জল নিয়ে, ময়লা ফেলা নিয়ে, ছাদে যাওয়া নিয়ে। ঝগড়ার জন্য খুব গুরুতর কারণের দরকারও হয় না। ঝগড়াটাই যখন আসল তখন কারণ একটা বের করে নিলেই হয়।
অনিন্দিতা আজকাল ছাদে আসে না। চয়নের সঙ্গে দেখাও হচ্ছে না। গত কয়েকদিন। একদিক থেকে ভালই। সম্পর্কট এইভাবে শেষ হয়ে যাক। সম্পর্ক ছিলও না তেমন, একটা ক্ষীণ বন্ধুত্ব গড়ে উঠছিল মাত্র। তার মধ্যে একটু বৈদ্যুতিক ঘটনা ঘটেছিল তাকে নিয়ে অনিন্দিতার তুমি বলানো, কিন্তু সেটাও গুরুতর কিছু নয়। অনিন্দিতা তো পাগল নয় যে, তার সঙ্গে প্রেম করতে চাইবে।
তবু অবস্থাটা একটু অনিশ্চিত, অয়ন তাকে বাসা ছাড়তে বলেছে। কিন্তু রাগের মাথায় বলা, সেটাকে গুরুত্ব দেওয়ার মানে হয় না। ছাদের এই চিলেকোঠা নিশ্চয়ই ভাড়া দেবে না। ওরা। হয়তো রাগ পড়ে গেলে কথাটা মনেও থাকবে না অয়নের। তবু এতসব ভেবেও নিশ্চিত হতে পারে না চয়ন। দুশ্চিন্তার একটা কাটা সর্বদা খচখচ করে।
একদিন বিকেলে টিউশনিতে বেরোচ্ছিল চয়ন, সদর দরজার বাইরে গলির মধ্যে অনিন্দিতার বাবার সঙ্গে দেখা।
ভারাক্রান্ত মুখ, হাসি নেই। ওর মধ্যেই জোর করে একটু হেসে বললেন, বেরোচ্ছ নাকি?
চয়ন বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ।
বড় অশান্তি চলছে, বুঝলে?
অশান্তি যে চলছে তা চয়ন জানে। কিন্তু তার তো কিছু বলার নেই।
ভদ্রলোক চয়নের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল চয়ন। সময় হবে?
চয়ন মৃদুস্বরে বলল, হবে। বলুন না!
কোথায় বেরোচ্ছিলে যেন, দেরি হয়ে যাবে না তো!
তাড়া নেই। টিউশনিতে যাচ্ছিলাম।
অনিন্দিতার বাবা গলির মুখ অবধি কথাটা ভাঙলেন না। বড় রাস্তায় অসংখ্য লোক চলাচল ও ট্রামবাসের শব্দের মধ্যে এসে নিশ্চিন্ত মনে বললেন, এখানে বলা যায়।
বাস্তবিকই তাই, কলকাতার রাজপথই গোপন কথা বলার সবচেয়ে ভাল জায়গা। চয়ন দাঁড়িয়ে বলল, বলুন।
কথাটা জিজ্ঞেস করতে একটু সঙ্কোচ হচ্ছে। অলিম্বিতার কাছ থেকে কথা বের করার উপায় নেই। বড্ড ভয় পাই ওকে।
