তা হোক গে। আমার অত জেনে দরকার নেই।
আমিও যে জানি তা নয়। তবে তোমার চেয়ে একটু বেশি জানি, এই যা। জম্পেশ একখানা যন্ত্র বটে।
নয়নতারা রান্নাঘরে গেল। কথাটা আর এগোলো না।
আর একটু বেলা গড়ালে একখানা ঘটনা ঘটল। এমনটা অনেক আগে ঘটত বটে, ইদানীং ঘটছিল না। পিওন এসে পাঁচশো টাকার একখানা মানি অর্ডার দিয়ে গেল। ফর্মের টোকেনে কৃষ্ণজীবনের একটু লেখা, বাবা, অনেকদিন কিছু পাঠাইনি। গিয়ে থোক কিছু টাকা আপনার হাতে দেওয়ার ইচ্ছে ছিল। সময়াভাবে হয়ে উঠছে না। রামজীবনকে বলুন, আপনার আর মায়ের ঘরটা পাকা করতে। খরচ আমি দেবো। মা ও আপনি, প্ৰণাম নেবেন। সেবকাধম কৃষ্ণ।
টাকাটা হাতেই থর থর করে কাঁপছিল। পাঁচশো টাকা এখনও তার কাছে অনেক টাকা।
টাকাটা নিয়ে উঠে রান্নাঘরের দরজায় এল বিষ্ণুপদ, কী গো, কানে কম শুনছো নাকি আজকাল? মূঢ়ারা মুখ তুলে হাসল, কেন, ডাকছিল নাকি উনুন্নটা ধরাতে আজ দেরি হল, এক হাতে সব কাজ। কোটা, বাটা, রাধা।
না। ডাকিনি। তবে পিওন এসেছিল, শুনতে পাওনি!
পিওন! ও মা, তোমার হাতে একগোছা নোট যে! কে দিল?
কৃষ্ণ পাঠিয়েছে। এই পিওন এসে মানি অর্ডার দিয়ে গেল। পাঁচশো টাকা।
ওম্মা গো! পাঁচশো!
ভাল-মন্দ খাওয়া যাবে কদিন। আরও কথা আছে। আমাদের ঘরখানা পাকা করে দিতে চাইছে।
এতদিনে বুঝি মা-বাবার দুঃখ বুঝতে পারছে সে!
ইংরিজিতে একটা কথা আছে, বেটার লেট দ্যান নেভার। তা দেরি করেছে বটে, কিন্তু সে এককথার মানুষ।
নয়নতারার চোখে জল এসেছিল। আঁচলে চোখ দুটো মুছে নিয়ে বলল, বলেছে সেই ঢের। বললেও তো বুকটা ঠাণ্ডা হয় গো। ছেলেমেয়েরা তো বোঝে না। ওরা আদর করে এক টেলা মাটি এনে দিলেও মা-বাপের বুক ভরে ওঠে!
কেঁদো না। কান্নার মতো কিছু হয়েছে নাকি?
কৃষ্ণ আমার তো খারাপ ছেলে নয়। তার বুকে মায়া-দয়া কিছু কম নয়। কিন্তু ওই গেছো মাগীটাই যে খেল ওকে।
ওভাবে বলতে নেই। তাদের জীবনের ধারা আলাদা, আমাদের সঙ্গে কি বনে? এসব কথা এখন তুললে আনন্দটা মাটি হবে।
আচ্ছা, আর বলব না।
টাকাটা তোমার কাছে রাখো।
নয়নতারা হাসল, কেন, তোমার কাছেই থাক না!
ও বাবা! আমি লক্ষ্মীছাড়া মানুষ, আমি টাকা রাখব কি? কোনোদিন রেখেছি নাকি? যতদিন মা বেঁচে ছিল, টাকা এনে মায়ের হাতে দিয়েছি। মা চলে যাওয়ার পর থেকে তোমার হাতে। টাকা আমার সয় না।
নয়নতারা হেসে বলল, আচ্ছা গো আচ্ছা। কিছুক্ষণ রাখো, রান্নাটা সেরে গিয়ে নিচ্ছি।
এ ঘর যদি কৃষ্ণ পাকা করে দেয় তাহলে আর রেমের পাকা ঘরে আমাদের না যাওয়াই ভাল। বউমা, বাচ্চারা সব থাকবেখন ওখানে।
সেই বুদ্ধিই ভাল। কিন্তু হুট করে আবার রেমোকে এসব কথা বোলো না। হয়তো মান হবে।
বিষ্ণুপদ মাথাটা একটু নেড়ে বলল, এই তো বুদ্ধি! কিন্তু কেন যে সবসময় বলে বেড়াও যে তোমার নাকি বুদ্ধি নেই।
আহা, এ আবার কী এমন বুদ্ধির কথা হল শুনি!
আমার মাথায় তো আসেনি।
এসব ছোটো কথা তোমার মাথায় না। আসাই ভাল। তুমি, আমার ভোলানাথ শিবঠাকুরটি হয়েই থেকো।
শোনো, আমার মাথাতেও ছোটো কথা আসে। কৃষ্ণ তো রেমোকে দিয়ে ঘর করাতে চাইছে। কিন্তু সেটা কি ঠিক হবে? সে নেশাখের মানুষ, টাকা হাতে পেলে কি করে না-করে তার ঠিক নেই।
নয়নতারার মুখ শুকোলো, ও বাবা! এ কথাটা ভাবিনি তো! ঠিকই বলেছে। কৃষ্ণকে লিখে দাও যেন টাকা আমাদের কাছেই দেয়। তাহলে রাশ থাকবে।
হ্যাঁ। তাকে বাড়ির ঠিকানায় চিঠি দেওয়া বারণ। ইউনিভার্সিটির ঠিকানায় দিতে হবে। নইলে বৌমা আবার—
নয়নতারা একটু হাসল। বলল, ওসব পরে হবে। এখন স্নান করতে যাও। শাক আর ঝোল। হবে না?
খুব হবে।
কাল বাজারে গিয়ে মাছ এনো! অনেকদিন খাও না। ইদানীং রেমোটার হাতে বোধহয় পয়সা নেই। বাজার-টাজার দেখে মনে হয় টানাটানিতে আছে।
বিষ্ণুপদ স্নানে গেল। শীত শেষ হয়ে আসছে। গায়ে জল ঢালতে আর কষ্ট নেই।
খেতে বসে বড় চমৎকৃত হল বিষ্ণুপদ। ব্যাঙের ছাতার ঝোল দিয়ে ভাত মেখে দুগ্ৰাস খেয়ে বলল, এ তো অমৃত! একেবারে মাংসের মতো খেতে লাগে!
নয়নতারা চোখ বড় বড় করে বলে, তাই!
একটু খেয়ে দেখ না।
আচ্ছা তুমি খাও তো! সত্যিই ভাল?
অপূর্ব জিনিস, এতদিন খাইনি বলে আফসোস হচ্ছে।
অজান জিনিস তো, রাঁধতে ভয় হত। কেমন লাগবে তোমার কে জানে।
খুবই ভাল জিনিস। সাহেবরা খায়। দামও নাকি খুব।
এবার থেকে তাহলে প্রায়ই রাঁধব।
খুব রেঁধো। অতি চমৎকার।
বিষ্ণুপদর উদ্ভাসিত মুখ দেখে নয়নতারা মৃদু মৃদু হাসতে থাকে। এই তার স্বৰ্গসুখ। আর বেশি সে কিছু চায় না!
দুপুরে দুজনে পাঁচশো টাকা নিয়ে বসল। খরচের আগাম হিসেব কষতে। অনেক দিন এক সঙ্গে এত টাকা হাতে পায়নি তারা। কী করবে তা পরামর্শ করতে বসে একটু ছেলেমানুষ হয়ে গেল দুজনেই।
বিষ্ণুপদ বলল, কিছু তেল কিনে রাখো। তেল প্রায়ই ফুরিয়ে যায়।
না না। তেল খেয়ে শরীর খারাপ করবে নাকি? তোমার লুঙ্গি দুটো তো ছিঁড়েছে। একজোড়া ভাল দেখে কিনতে হবে। একখানা গেঞ্জিও।
আরে পাঁচশো টাকা তো মেলা টাকা। লুঙ্গি ছাড়াও অন্য জিনিস কেনা যাবে। আমার পুরোনো লুঙ্গিতেই চলে যাচ্ছে।
শোনো, আমাদের বালিশ তোশকের অবস্থা দেখেছো? তুলো জমে জমে আর তেলচিাটে হয়ে একেবারে ছোটোলোকি চেহারা। বালিশ দুটো তো ইটের মতো শক্ত। এসব করালে একটু আরাম করে শোয়া যায়।
বিছানা! পুরোনো বিছানায় শোয়া অভ্যাস। বেশি নরম হলে আবার হয়তো ঘুম হবে না।
