যন্ত্রখানা দেখছিল বিষ্ণুপদ। লম্বাটে সরু একখানা বাক্স, তার ডালায় বিরাট একখানা থার্মোমিটারের মতো জিনিস, নিচের খোদলে রবারের পট্টি আর পাম্প দেওয়ার জিনিসটা গুছিয়ে রাখার জায়গা; বাক্সটা কট করে বন্ধ করল পুলিন। মানুষ কত যন্ত্রই না বের করেছে! যত ভাবে তত অবাক হয়।
বিষ্ণুপদ বলল, একই শরীর, তবু কত তফাত দেখ। এই শরীরেই তো নৌকোয় বৈঠা মেরেছি, লাঙল ঠেলেছি, বোঝা টেনেছি, দশ-বিশ মাইল সাইকেল চালিয়েছি, দু-তিন ক্রোশ এক চোপাটে হেঁটে মেরে দিয়েছি। আবার সেই শরীরটাই এখন কেমন লাতিন হয়ে পড়েছে দেখ।
আহা, কালধৰ্ম নেই?
সে যে আছে তা তো দেখতেই পাচ্ছি। আমার কি মনে হয় জানো, মানুষের মরতে তত অনিচ্ছে নেই। কিন্তু বুড়ো হয়ে যেতে ভাল লাগে না। বুড়ো হওয়া মানে যেন ভেজা কথা জড়িয়ে বসে থাকা। তোমরা ডাক্তাররা বাপু এর একটা বিহিত করতে পার না? যে কবছর বাঁচিব বেশ ডেড়েমুশে বগল বাজিয়ে বাঁচিব। তারপর ফুরুৎ হওয়ার সময় হলে পট করে নেই হয়ে যাবো।
তোমার আমার ইচ্ছেমতো যদি সব হত তাহলে তো কথাই ছিল না। তবে কথাটা তুমি খুব আজগুবি বললেও মিথ্যে বলোনি। মাঝে মাঝে মনে হয়, বুড়ো বয়সটা যেন এক পাপ।
পাপও বলতে পারো, প্ৰায়শ্চিত্তও বলতে পারো। জীবনটা হেলাফেলা করে কাটিয়ে বুড়ো বয়সে তার গুনোগার দেওয়া।
তোমার আর গুনোগারটা কি? একটা ছেলে তো মানুষের মতো মানুষ হয়েছে। সেই ঢের। এত লোক তো এত ছেলে পয়দা করছে, কটা মানুষ হচ্ছে বলো তো! গরু ছাগলের মতো নম্বরে বাড়ছে! একখানা যে সোনার টুকরো হয়েছে তাই মহা ভাগ্য বলে জেনো।
বিষ্ণুপদ মৃদু একটু হেসে বলে, সোনার টুকরো তো বটে, কিন্তু সে যে এখন পরের সিন্দুকে।
তা হোক। ছেলে তো আর ট্যাকে গুঁজে রাখতে পারবে না। বাঙালি মা-বাপ তাই চায় বটে, কিন্তু তোমার ছেলের ওপর দুনিয়াটারও কিছু হক তো আছে।
তা যা বলেছে। মাঝে মাঝে তোমার মুখ দিয়ে একেবারে নির্ঘাত কথাটা বেরিয়ে আসে।
বামা তাহলে পাততাড়ি গুটোলো?
বিষ্ণুপদ একটা শ্বাস ফেলে বলে, তাই তো দেখছি। বলেও গেল না একবার।
পুলিন একটু হেসে বলে, বলে গেল না মানে? বামার বউ চলে যাওয়ার সময় চেঁচিয়ে তোমাদের যে বাপান্ত করছিল তা তো গা-সুদ্ধ লোক শুনেছে!
বিষ্ণুপদ কাহিল হেসে বলে, হ্যাঁ, সে একরকম বলে যাওয়াই বটে।
তাহলে আর দুঃখ কি? শ্বশুরবাড়িতেই গিয়ে উঠেছে তো?
সেরকমই কথা।
আজকাল শ্বশুরদেরই কপাল। বেলা হল, চলি হে বিষ্ণুপদ। কাঁচা নুনটা খাচ্ছে না তো!
না। তেমন আলুনি লাগলে ওই একটু খাই আর কি।
ওই রোগেই তো ঘোড়া মরে। নুন-টুন খেও না বাপু।
নুন না খেলে। কদিন এক্সটেনশন পাবো বলো তো! তোমার তো নিদান দিয়েই খালাস। কিন্তু গিলতে তো হবে আমাকেই। না কি?
তবে খাও। মনের আনন্দে খাও। নিজের শ্রাদ্ধের চিঠিটা নিজের হাতেই মুসাবিদা করো বসে বসে। নুন। এমন কোন অমৃতটা শুনি! কয়েকটা দিন একটু আলুনি লাগে, তারপর দেখবে বিস্বাদটা চলে গেছে।
পুলিন চলে গেলে বিষ্ণুপদ ফাঁকা বাড়ি বুকে নিয়ে বসে রইল। বামাচরণ সস্ত্রীক বিদেয় নিয়েছে। এ বাড়িতে তারা প্ৰাণের ভয়ে আর থাকতে নারাজ। তা বলে বাড়ির অধিকার ছেড়ে দিয়ে যায়নি। শ্যামলীর কোন কাকা র লোক, তাকে বলে রামজীবনকে চিট করবে বলে শাসিয়ে গেছে। বাড়ির দখলও তারা নেবে, তবে সবাইকে তাড়িয়ে। কথাগুলোর কিছু ফাঁকা আওয়াজ, কিন্তু আবার তত ফাঁকা নয়। একটা গণ্ডগোল পাকিয়ে উঠবেই। যাওয়ার সময় বামা রা কাড়েনি। কিন্তু বিষ্ণুপদর ধারণা, বউ সামনে না থাকলে বামা তার বাপ-মাকে একটা বলে যেত। বামার ঘর ফাঁকা পড়ে আছে তালাবদ্ধ হয়ে। রাঙা বউমাও কদিনের জন্য বাপের বাড়ি গেল কাল। বাড়িতে শুধু বুড়োবুড়ি। আর রামজীবন। রামজীবন বেহানে বেরোয়। দুপুরে কখনও খেতে আসে, কখনও আসে না। ফেরে রাতে। তার থাকা না-থাকা সমান।
বাগানে শাক তুলতে গিয়েছিল নয়নতারা। চুপড়ি কোলে নিয়ে ফিরল।
শাক পেলে?
হ্যাঁ। অনেক পেয়েছি। হ্যাগো, ব্যাঙের ছাতাও এনেছি কয়েকটা। খাবে?
কৃষ্ণুপদ একটু দ্বিধায় পড়ে বলে, দেশের বাড়িতে তো কখনও খাইনি। তবে এদেশে সবাই খায় শুনি। চেখে দেখতে দোষ কি?
তাহলে রাধি? আমিও কখনও খাইনি। সেদিন কুসুমের মা বলছিল, মাসিমা, কী ভাল ছাতু হয়েছে। আপনাদের বাগানে, খান না কেন? না খেলে আমাদের দেবেন।
বিষ্ণুপদ নড়েচড়ে বসে একটু হেসে বলে, তাহলে রেখেই ফেল। খেয়েই দেখি এমন কি জিনিস। সাহেবরাও খুব খায়
পুলিন ডাক্তার কী বলে গেল?
ডাক্তারদের কথা আর বোলো না। মান্ধাতার আমলের যন্ত্র দিয়ে কী দেখল ও—ই জানে। তবে তেমন কিছু নয়। কাঁচা নুন খেতে বারণ করে গেল। আবার।
তাহলে আজ থেকে আর নুনটা পাতে নিও না।
না নিলাম। কিন্তু আমার তো চিকিৎসা হচ্ছে। তোমার ব্যবস্থা কী হবে? কোনদিন ডাক্তার দেখাও না, এ ভাল নয়।
রক্ষে করো। পুরুষ ডাক্তার বুক দেখবে, পেট দেখবে, ও আমার পোষাবে না বাপু। আমি বেশ আছি। শয্যা নিলে তখন দেখা যাবে।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, এ বয়সে আর লজ্জার কী?
আমার আছে বাপু।
বিষ্ণুপদ খুব হাসল। সবকিছু পাল্টায়, কিন্তু নয়নতারারা আর পাল্টায় না। হাসি থামিয়ে বলল, শরীর এক জটিল যন্ত্র, বুঝলে? হাসো, কাঁদো, কাজ করো, ঘুমোও, যা কিছু করো না কেন, সবই করছ শরীরের ভিতরকার নানা সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির জন্য। এ এক আশ্চর্য জিনিস। বাইরে থেকে বোঝাই যায় না যে ভিতরে এত সব কাণ্ডকারখানা।
