কী রে কিম্ভূত?
হেমাঙ্গ ঘোর অন্যমনস্কতা থেকে মুখ তুলে কয়েক পলক মহিলাটিকে চিনতেই পারল না। মনে মনে অনেকটা দূরে সরে গিয়েছিল সে। এক মহাকাশচারীর মতো সে কালো আকাশে সবুজাভ নীল পৃথিবীর গোলকটিকে অবলোকন করছিল। সেও ভাবছিল, কেন জন্ম? কেন এই চৈতন্য? কেন এই বিশাল সৃষ্টির আয়োজন। এর কি কোনও মানে হয় না?
চারুশীলাকে চিনতে তাই সময় লাগল। সে একটু হাসল। নিজেই টের পেল, হাসিটা ফুটল না। হাসিটা হাসির মতো হল না। অস্ফুট স্বরে সে বলল, চারুদি!
তোরও নেমন্তন্ন ছিল বলিসনি তো! কৃষ্ণজীবনবাবুর কাছে শুনে তো আমি অবাক।
হেমাঙ্গ বেশ কষ্ট করেই নিজেকে বাস্তবে নামিয়ে আনল। বলল, নেমন্তন্ন? ও হ্যাঁ, নেমন্তন্নটা আজ সকালেই হয়েছে। তোকে বলবার সময় পাইনি।
এত অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে কেন তোকে? কী হয়েছে?
না, কিছু নয়।
ভেতরে আয় না! মুখ গোমড়া করে বসে আছিস কেন? আয়।
হৈমাঙ্গ উঠল।
মস্ত হলঘরটায় অতিথি সমাগম হচ্ছে; বেশির ভাগই চেনা মুখ। সুব্রত, অনু, চারুন্দির ছেলেমেয়েরা।
আপনি কিন্তু রোগা হয়ে গেছেন।
হেমাঙ্গ ফিরে তোকাল। যাকে দেখল তাকে চিনতেও একটু সময় লাগল তার!
রোগ হয়ে গেছি!
অনেক। কেন রোগা হলেন? বিরহে নয় তো!
হেমাঙ্গর কান দুটো হঠাৎ একটু গরম হয়ে গেল। বিড় বিড় করে সে কয়েকবার আওড়াল, বিরহ? বিরহ? কেন বলুন তো!
ঝুমকি একটুও হাসছে না। মুখটা থমথমে গম্ভীর। বলল, এমনি জিজ্ঞেস করলাম। কিছু মনে করবেন না।
হেমাঙ্গ ছিপছিপে সুন্দর মেয়েটার দিকে চেয়ে ভাবতে লাগল, একে কী বলা যায়! মেয়েটা কি তাকে নিয়ে মজা করছে?
একটু সময় নিয়ে সে গম্ভীর গলায় বলল, বিরহের কোনও কারণ তো দেখতে পাচ্ছি না।
ঝুমকি একটু হাসল। বলল, তা হলে বোধহয় ডায়েটিং করছেন।
ফাজিল মেয়েটির কাছ থেকে সরে যাওয়ার জন্য সে এই যে, চয়নবাবু বলে এগিয়ে গেল।
কিন্তু সারাক্ষণ সে মাঝে মাঝেই টের পেতে লাগল, একজোড়া চোখ তাকে কৌতূহলের সঙ্গে লক্ষ করছে, অনুসরণ করছে। কিছু বলতেও চাইছে কি? গেরো।
০৭৮. স্ট্রোক জিনিসটা কি
স্ট্রোক জিনিসটা কি বলো তো! ডিকশনারিতে যা লেখা আছে ডাক্তারি মতে তো তা নয়! ব্যাপারটা কি বলো তো!
পুলিন ডাক্তার একটু হেসে বলে, কেন, ওসব জেনে হবেটা কি?
বিষ্ণুপদ অপ্রতিভ হেসে বলে, জেনে রাখা ভাল, মানুষের স্ট্রেক হয় শুনেছি, মারাও যায়। কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারি না।
ওসব অলক্ষুণে ব্যাপার জানার দরকারটা কি? দুনিয়ায় জানার আরও অনেক জিনিস আছে তোমাকে। তো চিনি। ভেঙে বললেই ওসব নিয়ে ভাবতে শুরু করে আবার একটা রোগ বাধিয়ে বসবে।
বিষ্ণুপদ ফের একটু হেসে বলে, মানুষ তো মরেই। বয়স হলে, সময় ফুরোলে একটা না একটা ছলছুতোয় প্ৰাণপাখি ফুরুৎ হয়ে যায়। তা বলে বাঁচার ইচ্ছেটা কি মরে? এই যে অত আতান্তরে আছি, তাও মরতে কেমন ইচ্ছে যায় না। আরও কথা কি জানো, সংসারের যা অবস্থা দেখছি তাতে ভুগে মরতে ভয় হয়। স্ট্রোক হলে শুনেছি, ফুরুৎ হতে এক লহমা লাগে।
এই বলছো। মরতে ইচ্ছে যায় না। আবার বলছো ফুরুৎ হতে চাও, তোমাকে নিয়ে তো মুশকিল দেখছি! এক নিশ্বাসে দুটো উল্টো কথা বলে ফেললে।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে খুব হেসে বলে, উল্টোপাল্টা ভাবি আর বলি বলেই তো আমি মনিষ্যির মধ্যে পড়ি না। ভাবছিলাম কি জানো, মরতে ইচ্ছে যায় না। সে কথা ঠিক। তা বলে কি মরণ-বাবাজী আমাকে ছাড়বে? বুকে হাঁটু দিয়ে পাওনা-গণ্ডা আদায় করে নেবে না একদিন? তা মোরাটা যদি ওই স্ট্রোকে হয় তাহলে ল্যাটা একটু কম, তাই না?
তোমাকে বলেছে! যারা হুট বলতে মরে তারা ভাগ্যবান! ভোগে না, ভোগায় না। স্ট্রোক হলেই তেমনধারা হবে তার মানে নেই। অনেক সময় জড়ভরত হয়ে বেঁচে থাকে; পক্ষাঘাত হয়, আরও নানা জটিল জিনিস হয়; ফুরুৎ হতে চাইলে বরং গলায় দড়ি দেওয়া ভাল, নয়তো ঢাকাঢাক ফলিডিল মেরে দাও, হাতের কাছেই রয়েছে।
তাতে পাপ হবে না?
তা হবে। সব দিক সামলে চলতে গেলে কি হয়?
আত্মহত্যা করলে নাকি আত্মা আকাশের সব অন্ধকার গ্রহে ঘুরে বেড়ায়! মুক্তি হয় না।
তা হবে। তোমার মতো শাস্ত্ৰজ্ঞান আমার নেই। তবে একটা কথা জেনো, আত্মহত্যা হচ্ছে জোয়ান বয়সের ব্যাপার। বুড়ো বয়সে আর ওসব করার মতো বুকের পাটা থাকে না। তখন লাথি বঁটা খেয়েও প্ৰাণটুকু নিয়ে বেঁচে থাকতে চায় মানুষ। আজকাল খুব মরার কথা ভাবছো নাকি?
দুরকমই ভাবি! মরার কথাও, বাঁচার কথাও।
পুলিন ডাক্তার তার প্ৰেশার দেখার যন্ত্র আর স্টেথিসকোপ বের করে বলে, দেখি প্ৰেশারটা।
বিষ্ণুপদ হাতখানা বাড়িয়ে দিয়ে একটু হেসে বলে, তোমার ওই যন্ত্রখানার বয়স কত হল বলো তো! চল্লিশ পঞ্চাশ বছর হবে না?
তাতে কি? বিলিতি জিনিস!
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, আমার মনে হয়, যন্ত্রটা এবার পুরোনো লোহার দরে বেচে দিলে ভাল। যেমন তুমি, তেমন তোমার যন্ত্র।
বেশি বোকো না হে, ত্ৰিশ বছর ধরে প্ৰেশার দেখে আসছি। এক চুল এদিক-ওদিক হয়নি।
হলেই বা ধরছে কে? তুমি হলে মোত্রাবনে খাটাস বাঘ।
পুলিন গম্ভীর হয়ে প্ৰেশার দেখে বলল, একটু বেড়েছে। মার্জিনাল; ওষুধ খাবে নাকি?
বিষ্ণুপদ ভ্রূ কুচকে বলে, কে যেন বলছিল। থোড়ের রস খেলে প্ৰেশার কমে যায়।
তাও যায়। খেয়ে দেখতে পারো। তবে প্রেশারটা বেড়ে থাকলে কষ্ট; যা দিয়ে পারো বেঁধে রাখো। নইলে সামান্য উত্তেজনায় চড়াক করে উঠে পড়বে। তখনই বিপদ।
