রিয়া হাসল, অতটা জানি না।
ইট্স এ ফ্যাক্ট।
আসছেন কিন্তু।
যাবো।
ফোনটা রেখে দিল হেমাঙ্গ। এইজন্যই সে বিয়ে করতে চায় না। ভদ্রমহিলা তার স্বামীর বইটা অবধি পড়েননি!
সারাদিন ধরে বইটা আবার পড়ল হেমাঙ্গ। এবার ধীরে ধীরে। ক্রিটিকের মতো। সজাগ ও সতর্ক। কিন্তু কৃষ্ণজীবন তার বইয়ের সম্মোহক অভ্যন্তরে ঠিকই টেনে নিল তাকে। শেষ অধ্যায়ের শুরুতে জীবনানন্দ দাশের একটি রয়েছে। হে নাবিক, হে নাবিক, জীবন অপরিমেয় নাকি-ও সেইলার, সেইলার, ইজনটু দি লাইফ স্টিল। ক্ষ্যাপা বৈজ্ঞানিক তার বলগাছাড়া কলমে লিখে গেছে, তোমাকে কে বলে দেবে, একটি প্রস্ফুটিত শিউলি ফুলের সৌন্দর্যে কেন তোমার এত আনন্দ? দূরের নক্ষত্রের দিকে চেয়ে শুয়ে আছে। ছাদে, চিৎপোত! তোমার সর্বস্ব হারিয়ে যাচ্ছে অনন্ত নক্ষত্ৰবীথির রহস্যময়তায়—তখন কে তুমি মনে পড়ে? ওই নক্ষত্ররা কি তোমার সঙ্গে কথা বলে? বলতে চায়? বিজ্ঞান কি ব্যাখ্যা করে এক মহৎ কবিতার অন্তলোর্ককে? সুন্দর গানের মধ্যে কোথায় হারিয়ে যায় তোমার লজিক? হে মানুষ, কোন জড়বস্তু থেকে এল এত চৈতন্যের প্লাবন? ভালবাসা? মুগ্ধতা! কে ব্যাখ্যা করবে তা? বিজ্ঞান তো অন্ধের ব্যষ্টি মাত্র। পথের ঠাহর দেয়। কিন্তু সে তো নয় চোখ! বীজের ভিতরে বটবৃক্ষের সম্ভাবনা-এ কি ভাবতে পারা যায়? একটু ভাবো। ভাল করে ভাবো। ঈশ্বরীয় বা নিরীশ্বর যাই হও তুমি, দাঁড়াও। দুই হাত অঞ্জলিবদ্ধ করে প্রার্থনা করো, জ্ঞানবান করো আমাকে। সৃষ্টির দুর্জেয় অবগুণ্ঠন সরিয়ে দাও। বুঝতে দাও, আমি-কে। বুঝতে দাও, তুমি কে!
আপনি কি খুব কবিতা পড়েন?
কবিতা! বলে কৃষ্ণজীবন লাজুক একটু হাসল, একটু-আধটু।
না, না, কী যে বলেন!
হেমাঙ্গ একটু চুপ করে থেকে বলল, আমার মনে হচ্ছিল, কবিতার প্রতি আপনার কিছু আনুগত্য আছে।
কৃষ্ণজীবন চুপ করে রইল। কিছুক্ষণ। তারপর বলল, অ্যাফ্লয়েন্ট দেশগুলোতে কবিতা লোপাট হয়ে যাচ্ছে। টেকনোলজি খেয়ে ফেলছে সাহিত্যকে। এইসব কবিতা-টবিতা যা কিছু সব আজকাল থার্ড ওয়ার্ডের নিষ্কর্মাদের পাসটাইম। জানেন?
কিছুটা জানি।
বঁচোয়া। আর সব দিকে এগিয়ে গেলেও ওরা, ওইসব টেকনোলজিক্যালি হাই সোসাইটি, বোধহয় কবিতাকে আমাদের হাতে ছেড়ে দেবে।
তাই হোক।
বিকেল মরে সন্ধে হয়ে আসছে। কৃষ্ণজীবনের সাততলার ঝুল-বারান্দা থেকে সূর্যাস্তের শেষ রশ্মি মিলিয়ে যেতে দেখেছে হেমাঙ্গ। অতিথিদের সমাগম এখনও হয়নি। কৃষ্ণজীবনকে একা পাওয়ার জন্য একটু আগেই এসেছে হেমাঙ্গ।
রেলিঙে থুতনির ভর হাতের পাতায় রেখে কৃষ্ণজীবনু সামনের দিকে চেয়ে দূরাবলোকন করছিল। কেমন এক দূর গলায় বলল, আমার ছোটো দুটো ভাই সামান্য বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারপিট করে ও ওকে জখম করেছে। আমরা একটা বোন যাত্রা করে বেড়ায়। আমার বাবা-মা কাঁচাঘরে বাস করে। আর আমি? সাততলায় থাকি। মোটা মাইনে পাই। আমেরিকা থেকে আমার বই বেরোয়। হেমাঙ্গবাবু, আমাকে যা দেখছেন, যতটুকু দেখা যাচ্ছে আমার, এটুকুই সব নয়। আমি যেমন বাইরের দূষণের কথা বলি, তেমনি ভিতরের দূষণের কথাও বলি। মানুষের জীবনযাপনের মধ্যে, তার মনের মধ্যে, মস্তিষ্কের মধ্যে কি কম পলিউশন?
হেমাঙ্গ চুপ করে কৃষ্ণজীবনের দিকে চেয়ে রইল।
জীবন মৃদু স্বরে বলল, মাঝে মাঝে আমি কেমন যেন মুক-বধির হয়ে যাই। এমন সব সিচুয়েশন তৈরি হয় যাতে আমি ভীষণ অসহায় হয়ে পড়ি, কিছুই করতে পারি না। তখন কি ভাবি জানেন? ভাবি, তোর ওপরে নেই ভুবনের ভার। মাঝে মাঝে ভাবি, আমি বৃথা চিৎকার করে মরছি, পৃথিবীর কেউ আমার কথা শুনছে না, গুরুত্ব দিচ্ছে না, হয়তো আমাকে নিয়ে হাসাহসি করছে।
আপনার কেন এরকম মনে হয়?
কৃষ্ণজীবন যখন মুখ ফিরিয়ে তার দিকে তাকাল তখন হেমাঙ্গ লক্ষ করল কৃষ্ণজীবনের মুখে বিষণ্ণতার ছাই মাখানো। চোখের দীপ্তি হঠাৎ নিবে গেছে। মৃদু স্বরে বলল, ডারলিং আৰ্থ বইটা প্রকাশের আগে অনেক দ্বিধা ছিল। রিভিউয়াররা সবাই ফেবারেবল ছিল না। অনেক আগু-পিছু, অনেক দ্বিধা-দ্বন্দুের পর ওরা ডিসিশন নেয় যে, বইটা শেষ অবধি ছাপা হবে। যখন বইটা নিয়ে ইনডিসিশন চলছে তখন আমার প্রায়ই মনে হত, ওই বইয়ের মধ্যে বোধহয় আমার পাগলামিই রয়েছে। কিন্তু এই পাগলামি ছাড়া আর যে আমি কিছুই পারি না।
কোনও কোনও পাগলামি হয়তো প্ৰতিভার লক্ষণ।
প্রতিভা! না না, ওসব আমার নেই। আপনি ঠিক বুঝবেন না, আমি খুব আনসাকসেসফুল ম্যান।
তার মানেটা কি হল?
সাকসেস তাকেই বলে যখন মানুষ নিজের সঙ্গে এই গোটা বিশ্বজগতের প্রকৃত সম্পর্কটা আবিষ্কার কুরতে পারে। সারাজীবন আমি সেই চেষ্টাই তো করেছি। কিন্তু হল না। মনে হচ্ছে, একটা নিরেট দেয়ালে মাথা ঠুকে মরছি। কিছুতেই বুঝতে পারছি না, আমি কি। সত্যিই কে। এই যন্ত্রণা আমাকে মাঝে মাঝে পাগলের মতো করে দেয়। এই গাড়ি বাড়ি টাকা ডক্টরেট সব যেন একমুঠো ধুলোর মতো অর্থহীন হয়ে যায়।
হেমাঙ্গ স্মিতমুখে বলল, অ্যান্ড দ্যাট ইজ সাকসেস। আপনার যন্ত্রণাটাও যদি আমার থাকত তা হলো নিজের পিঠ চাপড়ে বলে উঠতাম, সাবাস।
এ বই কি মানুষকে ভাবাবে হেমাঙ্গীবাবু?
কাঁদাবে।
আপনি ঠাট্টা করছেন না তো!
এই বুঝলেন এতক্ষণে?
না না। ইউ আর সো কাইন্ড।
ডোরবেল বাজতেই উঠে গেল কৃষ্ণজীবন। অতিথি সমাগম শুরু হল বোধহয়; ভিড় হয়ে যাবে! কত অর্থহীন কথার গ্যালু গুবু বিষ্ণু, মহুর, গভীর যে সময়টুকু এই ব্যরস্থায় ঘনীভূত হয়ে উঠেছিল তা ভাল মেলে পালিয়ে যাবে।
