বিয়েটা শেষ অবধি হল বটে, কিন্তু বয়ে আনল নানা উপসৰ্গ আর জটিলতা। গায়ের ওই বাড়িতে গিয়েই বিবর্ণ হয়ে গেল রিয়া। এই বাড়ি? এইসব অতি নিম্নমানের মা-বাবা-ভাইবোন? বোকা, আহাম্মক, হিংসুটে, লোভী! প্রত্যেক রাতে প্রেমের বদলে তাদের ঝগড়া হতে লাগল। প্রতি রাতে কাঁদত রিয়া। আর প্রতিদিন সকাল থেকে কৃষ্ণজীবনের ভাইবোনদের সঙ্গে মন কষাকষি শুরু হত রিয়ার। এই সাঙ্ঘাতিক অবস্থায় বড় কাহিল আর অসহায় আর একা হয়ে পড়ছিল কৃষ্ণজীবন।
দুমাসের মধ্যে তাকে চলে আসতে হল কলকাতার ভাড়া বাসায়। বড় কষ্ট হয়েছিল কৃষ্ণজীবনের। কারণ সে ফাটলটা দেখতে পেয়েছিল। সে জানত, নিজের আপনজনদের সঙ্গে এই যে বাঁধন কাটল আর কিছুতেই তা গিঁট বাঁধা যাবে না। গাদাবোটকে টেনে নিয়ে যাবে একটি লঞ্চ—এরকমই আশা ছিল সকলের। কিন্তু লঞ্চ শিকল কেটে তফাত হল। সংসারের গাদাবোট যেখানে ছিল পড়ে রইল। উত্তর চব্বিশ পরগনার ওই অজ পাড়াগাঁয়ে আজও তার স্তিমিত পরিবারটি অভাবে, অশিক্ষার অন্ধকারে পড়ে আছে। অভাবের সংসারে ঝগড়া-কাজিয়া-অশান্তি আর নানা পঙ্কিলতার মধ্যে।
কৃষ্ণজীবন পারত। পারল না।
কে কার শিকার তা বুঝে ওঠা মুশকিল। আজ তো কৃষ্ণজীবনের মনে হয়, এক লোলুপ বাঘের থাবার নিচে লম্বমান পড়ে আছে তার মৃতদেহ। ধীরে ধীরে বাঘটা তাকে খেয়ে ফেলছে। তার কিছু করার নেই।
না, রিয়াকে সেই বাঘ ভাবে না কৃষ্ণজীবন। গোটা পরিস্থিতিটাই সেই বাঘ। রিয়া তার একটি থাবা মাত্র।
মাইনে কম ছিল তখন। তবু কষ্টেসৃষ্টে টাকা পাঠাত কৃষ্ণজীবন। প্রতি শনিবারে রবিবারে যেত গায়ের বাড়িতে। আর তখন তাকে চোখা চোখা কথা শোনাতো ভাইবোনেরা। বিশেষ করে বোনেরা। বউয়ের চাকর, ব্যক্তিত্বহীন ভেড়া, স্ত্রৈণ। এতকাল কৃষ্ণজীবনের মুখের ওপর কথা বলার সাহসই কারও ছিল না। এই গরিব, গৌরবহীন পরিবারে কৃষ্ণজীবন ছিল প্রায় গৃহদেবতার মতো সম্মানের আসনে। সবাই তাকে তোয়াজ করত, ভয় পেত। কিন্তু বিয়ের পর সব ভাঙচুর হয়ে গেল। একদিন তার বোন বীণাপাণি বলেছিল, তুই তো লেখাপড়া শিখে ভদ্ৰলোক হয়ে গেছি, আমরা সেই ছোটলোকই আছি, আমাদের সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখার দরকার কি তোর?
সবচেয়ে বেশী লেগেছিল ভাই রামজীবনের সঙ্গে। আগে কুব বশংবদ ছিল রামজীবন। কি কারণে কে জানে, সেই রামজীবনই তার ওপর ক্ষেপে গেল সবচেয়ে বেশী। এক শনিবার বিকেলে সামান্য কিছু জিনিসপত্র নিজের পরিবারের জন্য নিয়ে গিয়ে গায়ের বাড়িতে হাজির হয়েছিল সে। তার পদার্পণমাত্র বাড়ির আবহাওয়া থমথমে করে উঠল। ভিতরে ভিতরে একটা আক্ৰোশ পাকিয়ে ছিল আগে থেকেই। সন্ধের পর রামজীবন মদ খেয়ে ফিরল। মাতাল নয়, তবে বেশ টং। ফিরেই তাকে দেখে বাবার উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে উঠল, এই ততা আপনার লেখাপড়া জানা ছেলে এসে গেছে। শালা মেলা লেখাপড়া করেছে। মেলা বই পড়েছে। মেলা ভাল ভাল কথা জানে। কিন্তু শালা নিজের পরিবার, নিজের ভাইবোনের জন্য এক ফেঁটা বিদ্যে খরচ করেনি। করেছে বাবা? আপনিই বলুন, আমাদের কোনওদিন ডেকে বলেছে, আয় তোকে এটা বুঝিয়ে দিই বা সেটা শিখিয়ে দিই? কোনওদিন জিজ্ঞেস করেছে যে, আমরা কে কোন ক্লাসে পড়ি? আপনার বিদ্যাধর ছেলে শুধু নিজেরটা গুছিয়ে নিয়েছে। আর আমরা শালাকে তেল দিয়ে গেছি। বলুন সত্যি কিনা! আপনার গুণধর ছেলে এখন কলেজে পড়ায়, ছেলেদের ভাল ভাল জ্ঞানের কথা শেখায়। কী শেখাবে ও বলুন তো! ওর চরিত্র আছে, না মায়াদয়া আছে? ও জানে, মা-বাবা ভাই-বোনকে কেমন করে শ্রদ্ধাভক্তি করতে হয়, ভালবাসতে হয়? লেখাপড়া জানা বউকে দিয়ে আমাদের কম অপমান করে গেল? সব শেখানো ছিল আগে থেকে।
রামজীবন যে মদ খায় তা জানত না কৃষ্ণজীবন। হয়তো আগে যেত না। সম্প্রতি ধরেছে। মদ পয়সার জিনিস। এ বাড়িতে চাল কেনার পয়সা জোটে না তো মদ কেনার পয়সা আসবে কোথেকে? কৃষ্ণজীবন জীবনে খুবই কম আত্মবিস্তৃত হয়েছে। সেদিন হল। ওই মাতাল অবস্থায় রামজীবনের চেঁচামেচি তার সহ্য হয়নি। তার ওপর রামজীবন তাকে গুয়োরের বাচ্চা ও বেজন্ম বলে গাল দিয়েছিল। মায়ের পেটের ভাই হয়েও দিয়েছিল। সে উঠে তেড়ে গিয়েছিল রামজীবনের দিকে, যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা!
রামজীবন একা নয়, সঙ্গে সঙ্গে তার সব ভাইবোন যেন এককাট্টা হয়ে উষ্টে তেড়ে এল তার দিকে বিস্তর চেঁচামেচি হয়েছিল। তার মধ্যে রামজীবনের একটা কথা খুব কানে বাজে আজও, তোর টাকায় আমরা পেচ্ছাপ করি। তোর লেখাপড়া জানার মুখে পেচ্ছাপ করি।
রামজীবনকে খুন করতে পারলে সেদিন তার জ্বালা জুড়োতো। কিন্তু আজ আর সেই রাগটা তার নেই। কৃষ্ণজীবন আজ বুঝতে পারে তাকে বড় বেশী ভালবাসত তার পরিবার, অনেক নির্ভর করত তার ওপর, তাকে ঘিরেই ছিল ওদের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে চুরমার করে দিয়েছে তো সে নিজেই।
সেই রাতেই ফিরে এল কৃষ্ণজীবন। সে কি মারতে গিয়েছিল রামজীবনকে? সে কি আত্মবিস্তৃত হয়েছিল। তার সঙ্গে কি ওদের আর সম্পর্ক থাকবে না? কী হল! সে কিছুতেই এইসব ঘটনার জট খুলতে পারল না। শুধু টের পেল, তাকে ঘিরে একটা অদৃশ্য পোকা একটা গুটি বুনে যাচ্ছে। তাকে বন্ধ করে দিতে চাইছে নিজস্ব খোলর মধ্যে।
কলকাতার বাসাই বা কোন কোল পেতে বসে ছিল তার জন্য? অভাবী সংসার থেকে মেধা দিয়ে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল সে, কিন্তু গা থেকে গায়ের গন্ধ মোছেনি, মুছে যায়নি তার নিম্নবিত্ত, প্ৰায় অশিক্ষিত পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড। সে নিজেও টের পায়, পুরোপুরি ভদ্ৰলোক নয়, খানিকটা গেঁয়ো, খানিকটা কুসংস্কারাচ্ছন্ন। রিয়া ঝকঝকে আধুনিক, ছলেবলে, আর্ট। অসবর্ণের সেই শুরু।
