অঞ্জলি এতক্ষণ কথা বলেনি। এবার বোজার মুখে বলল, আপাটার সব কিছুতেই বেশি বেশি। তুই পুলিশে জানিয়ে দিয়ে চুপ করে বসে থাক না। আত মাথা ঘামাচ্ছিস কেন?
আপা আস্তে করে বলল, মাথা থাকলে একটু ঘামাতেও হয়। বিমলা আমার বন্ধু ছিল।
অঞ্জলি একটু ঝাঝিয়ে উঠে বলল, বন্ধু ছিল তো ছিল। তুই আবার ওকে উইমেনস লিভ দেখাতে গেলি কেন? সেইজন্যই তো এসব হল। সাধে কি বলি আপাটার বড্ড বাড়ি বেড়েছে!
পারগত বাধা দিয়ে বলে, আরে বাবা, এসব না হলে লাইফটার কোনও ইন্টারেস্ট থাকত আমাদের? আপা, নাউ। ইউ সে হোয়াট উই শুড ড়ু। আমি বলি কি আমরা কয়েকজন এখন তোমার সঙ্গে যাই। বাড়িটা ওয়াচ করি। ইফ যশবীর ইজ দেয়ার তাহলে তাকেও একটু দেখে রাখি।
না, সন্দেহ করবে।
করুক না, কী আছে?
সন্দেহ করলে ও সাবধান হয়ে যাবে।
পারগত হেসে বলল, দূর বোকা! সন্দেহ করলেও একটু ঘাবড়েও যাবে। ঘাবড়ে গেলে ব্লান্ডার করবে।
আপার মনটা খুব খারাপ। বিমলা কি সত্যিই খুন হল? হয়ে থাকলে খুব খারাপ ব্যাপার। সে পারগতের দিকে চেয়ে বলল, আজ আমি একাই ওকে ওয়াচ করি। কাল তোমরা যেও।
বুবকা সামান্য রেগে গিয়ে বলে, আপা, সব ব্যাপারেই তুমি একা এগিয়ে যেতে চাও কেন? ড্রাগ পোডলারদের সঙ্গে যখন লেগেছিল তখনও তুমি একা গিয়েছিলে। ফলে মার খেতে হয়েছিল, মনে আছে?
বাংলায় একটা কথা আছে, অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট।
পারগত বলে, আরে বাবা, ওসব কথা ছাড়ো। আমি বলি, যশবীর ইজ নাউ এ উন্ডেড টাইগার। তোমার যা স্বভাব হয়তো একাই ওকে ফেস করতে যাবে। তাহলেই বিপদ।
আপা একটু ভোবল। তারপর বলল, আমি তাতে ভয় পাই না। কিন্তু লোকটাকে ধরা দরকার। আমি আজ তেমন কিছু করব না। শুধু লক্ষ রাখব। দরকার হলে কাল তোমরা যেও। বিপদের ভয় নেই। আমি আজ বাবা আর মাকেও বলব।
তাই হল। স্কুলের পর আপার বন্ধুরা একটু উদ্বেগ নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল।
আপা বাস থেকে নেমে নিজেদের বাড়িতে ঢোকার আগে যশবীরের ঘরখানা আবার ভাল করে দেখল। ঘর অন্ধকার, তালা বন্ধ। কেউ নেই। আপা কিছুক্ষণ বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। চোখে জল আসছিল তার। সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শুনে ডানদিকে তাকাল আপা। দোতলার সিঁড়ি দিয়ে কেউ নেমে আসছে। ওপরে বাড়িওলা থাকেন একা। বুড়ো মানুষ। নিচের তলার ভাড়াটে হল যশবীর।
চোখের জলের ভিতর দিয়েও আপা বাড়িওলাকে দেখতে পেল। চেনা মানুষ।
এই যে আপা, কেমন আছ?
আপা হাসল, ভাল।
বিমলার কাছে এসেছ নাকি? ওরা কি বাড়ি আছে?
আপা একটু আকুল হয়ে বলল, কাকাবাবু, আপনাকে একটা জরুরি কথা জানানো দরকার। বিমলার কিছু একটা হয়েছে।
বুড়ো মানুষটি ভয় পেয়ে গেলেন। উদ্বেগের সঙ্গে বললেন, কী হয়েছে?
ঠিক বুঝতে পারছি না। আজ যশবীরের ভাবসাব দেখে কেমন একটা সন্দেহ হচ্ছে।
কী সন্দেহ বলো তো?
ওদের মধ্যে কি কাল বা আজ ঝগড়া হয়েছে কাকাবাবু?
ঝগড়া! সে তো কিছুদিন যাবৎ রোজই হয়। হ্যাঁ, কাল রাতেও তো কথা কাটাকাটি হচ্ছিল।
আর কিছু শুনতে পাননি!
বাড়িওলার মুখ শুকিয়ে গেল। বললেন, কিছু মনে তো পড়ছে না। কী ব্যাপার একটু খুলে বলবে?
আমিও যে জানি না। শুধু ভয় হচ্ছে। আপনার কাছে কি এই ফ্ল্যাটের ড়ুপ্লিকেট চাবি আছে কাকাবাবু? ফ্ল্যাটটা একবার দেখা দরকার।
বাড়িওলা একটু চিন্তিত মুখে বললেন, কাজটা কি ঠিক হবে। আপা? ট্রেসপাসিং।
কাকাবাবু, আমার যে জানা দরকার। বিমলার যদি কিছু হয়ে থাকে। তবে ঢুকে দেখলে দোষ নেই। আমি আজ সকালে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু যশবীর আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল।
বলো কি? আচ্ছা তুমি দাঁড়াও। চাবি আনছি।
আপা নিচে দাঁড়িয়ে রইল। বাড়িওলা চাবি আনতে অনেক সময় নিচ্ছিলেন। আপা ধৈর্য হারাচ্ছে!
চটিজুতোর শব্দটা শোনা গেল যেন এক যুগ পর।
এই নাও চাবি। কিন্তু সাবধান!
আপা দরজাটা খুলে ভিতরে ঢুকাল। সন্ধের অন্ধকার হয়ে এসেছে। সে বাতি জুলিল। প্রথম ঘরটি লিভিং কাম ডাইনিং। দারুণ সাজানো। টিভি, ভি সি আর, ফ্রিজ সব এই ঘরে। আপা পরের ঘরটায় উঁকি দিল। স্পেয়ার বেডরুম। ওপাশে আর একটা বেডরুম। তার দরজাটা বন্ধ। আপা দরজায় একটা টোকা দিল। তারপর হাতল ঘুরিয়ে দরজাটা খুলে বাতি জ্বালতেই বিমলাকে দেখতে পেল। দেয়ালের গা ঘেঁষে কার্পেটে পড়ে আছে বিমলা। হাত পা পিছমোড়া করে বাধা। মুখে একটা চওড়া লিউকো প্লাস্ট আটকানো।
একটা শ্বাস ফেলল। আপা। নিশ্চিন্তের শ্বাস। হাত পা যখন বাধা তখন হয়তো খুন হয়নি এখনও।
কিন্তু দেখা গেল, খুনের খুব কাছাকাছিই ঘটে আছে! অভুক্ত, দুর্বল, ক্লান্ত, মার-খাওয়া বিমলা অজ্ঞান হয়ে গেছে। হয়তো অনেকক্ষণ। হাত পা সাদা হয়ে গেছে রক্ত চলাচলের অভাবে। শ্বাস চলছে ধীরে।
কষ্ট আপা তাড়াতাড়ি রান্নাঘর থেকে একটু ছুরি এনে বাঁধন কাটল। লিউকোপ্লাস্টটা বড্ড সেঁটে বসে গিয়েছিল। খুলতে কষ্ট হল আপার।
কাকাবাবু! একটু আসুন।
বাড়িওলা এলেন। নার্ভাস, ভীত।
এসব কী আপা?
দেখুন কী অবস্থা করে রেখে গেছে। মরেই যেত।
লোকটা তো খুব অমানুষ দেখছি!
আপনি, একজন ডাক্তার ডাকবেন কাকাবাবু? বিমলার অবস্থাটা আমি বুঝতে পারছি না!
পুলিশেও কি খবর দেওয়া দরকার আপা?
না কাকাবাবু, পুলিশ ডেকে লাভ নেই! মেয়েদের কেউ বুঝবে না। ডাক্তারই ডাকুন।
চোখে-মুখে জল দেওয়ার পরই অবশ্য বিমলা চোখ খুলল। অনেকক্ষণ সেই চোখ রইল শূন্য, ভাষাহীন; এত দুর্বল যে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না বিমলা।
