আপার হঠাৎ কেমন খটকা লাগল। লোকটা স্বাভাবিক নেই। লোকটা পাগলের মতো ব্যবহার করছে। এরকম করছে। কেন?
আপা শান্ত গলায় বলল, আপনার কী হয়েছে বলুন তো? আপনি তো পাগল হয়ে গেছেন দেখছি!
এ কথায় যশবীর লাফিয়ে উঠে গলার শিরা ফুলিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, পাগল হয়ে গেছি! তুমি জানো বিমলাকে আমি কত ভালবাসতাম! অ্যান্ড আই হ্যাভ লস্ট হার ফর এভার! ফর এভার!
ফর এভার শুনে আপার মাথা একটা চক্কর দিল। যশবীর কি বিমলাকে খুন-টুন কিছু করে এসেছে? তারপর প্রলাপ বকছে?
যশবীর চেঁচাচ্ছিল, ইফ শী কমিটস সুইসাইড ইউ উইল বি রেসপনসিবল। ইফ শী ডাইজ ইউ উইল বি দি কজ।
আপা হঠাৎ হায় ভগবান বলে ঘুরে ছুটি দিল। রাস্তাটা হরিণের মতো চকিতে পেরিয়ে সে গিয়ে ঢুকাল পাশের বাড়িতে। ডোরবেল বাজাতে বাজাতে ডাকতে লাগল, বিমলা! বিমলা!
বিমলা জবাব দিল না। দরজাও খুলল না।
আপা জানালার কাছে গিয়ে দেখল, কাচের শার্শি বন্ধ, পর্দা টানা।
হঠাৎ যশবীর হাঁফাতে হাঁফাতে এসে কর্কশ হাতে একটা ধাক্কা দিল আপাকে, হোয়াট ড়ু ইয়া ওয়ান্ট? হোয়াট ড়ু ইয়া ওয়ান্ট? গেট আউট ফ্রম হিয়ার।
ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়েছিল। আপা। রোগা কনুইটা ঠিকাস করে ঠুকে গিয়েছিল শানে। পড়ে-থাকা অবস্থাতেই বলল, আপনি বিমলাকে কী করেছেন? ও দরজা খুলছে না কেন?
শী। হ্যাজ লেফট। নাউ। ইউ গেট আউট।
আপা উঠে দাঁড়াল। তারপর বলল, আমি আপনার কথা বিশ্বাস করি না। বিমলা ঘরে আছে।
যশবীর ধমকে ওঠে, ইউ বিচ! ইউ রেচেড গার্ল! গেট আউট! গেট আউট!
আপার চোখে জল আসছিল। বিমলা একটি ভারি সরল সোজা নরম প্রকৃতির মেয়ে। একটু অন্যমনস্ক ধরনের। কিন্তু হাসিখুশি, প্রাণময়। প্রায়ই আসত তাদের বাড়িতে। আপাও যেত। বিমলার সারা দিন সময় কাটে না। স্বামী বাড়ি না থাকলে সে শুধু ঘর গোছায়, টিভি দেখে আর টুকটাক মার্কেটিং করে। যশবীরের মা-বাবা থাকে ইউ পি-তে। মাঝে মাঝে তারা এসে থেকে যায় কয়েক মাস। তখন বিমলার খুব কাজ বেড়ে যায়। অবশ্য বিমলাদের কাজের লোক আছে। একজন রান্না করে, একজন ঠিকে ঝি অন্য কাজ করে দিয়ে যায়। সুখী পরিবার বলেই মনে হয় বাইরে থেকে। কিন্তু বছরখানেক আগে বিমলা এসে একদিন অনেক কথা বলল আপাকে। নিঃসঙ্গতার কথা, স্বামীর অন্যান্য মেয়ে-বন্ধুর কথা, একঘেয়ে জীবনের কথা, শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে অবনিবন।ার কথা। সব মেয়েদেরই অভিযোগ মোটামুটি একইরকম। বিমলারও আলাদা কিছু নয়। কথা হল, বিয়েতে বিমলার বাবাকে দুলক্ষ টাকা নগদ বরপণ দিতে হয়েছিল।
ভালবাসা কি কেনা যায় আপা? যদি যায় তাহলে আমি দুলাখ টাকার ভালবাসা কিনেছি।
খুব অবাক হওয়ার কিছু নেই। আপা জানে কোনও কোনও সম্প্রদায়ের মধ্যে এর চেয়েও অনেক বেশি পণ নেওয়া হয়। কিন্তু ছেলেমানুষ বিমলা স্বামীর কাছ থেকে একটু ভালবাসা চাইত। যশবীর অবশ্য কৃপণ নয়। বউকে বিস্তর প্রেজেন্টেশন দিয়েছে। ভালবাসা দিয়েছে কি না কে জানে!
বিমলাকে একটু চার-চোখোস বানানোর জন্যই আপা তাকে মাঝে-মধ্যে একটু মেয়েদের অধিকার, তাদের সত্তা, তাদের ভবিষ্যতের কথা শোনাত। বিমলা বলত, তুমি ঠিক বাঙালি মেয়েদের মতো কথা বলো! বাঙালী মেয়েরা কত ভাল আছে দেখ। আমাদের মতো মাথা নিচু করে থাকতে হয় না। অনেক স্বাধীন।
আপা বলেছে, তুমি তাহলে বাঙালিদের সঙ্গে আরও একটু মেশে। ভাল হবে।
লেডিজ গ্রুপটায় আপাই নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দেয় বিমলাকে। তারপর কি বিমলার খুব কিছু পরিবর্তন ঘটেছিল? যতদূর আপা জানে, না। তেমন কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। রক্তের গভীর সংস্কার আর অভ্যাস কি সহজে পাল্টায়?
অণুজীবের দিকে চেয়ে বলল, আপনি খুব বীরপুরুষ, না? আমি পুলিশের কাছে যাচ্ছি।
গো ঢু হেল।
আপা শেষ অবধি পুলিশের কাছে যায়নি। কারণ, বিমলাকে খুন করা হয়েছে এমন কোনও কথা হুট করে পুলিশকে গিয়ে বলাটা ঠিক হবে না। হয়তো বিমলাকে বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। কে জানে? সে স্কুলে দেরিতে পৌঁছলৌ, টিচারের বকুনি খেল এবং তারপর টিফিনের সময় বন্ধুদের জড়ো করে ঘটনাটা সবিস্তারে শোনাল।
পারগত বলল, হোয়াইল দেয়ার ইজ আপা, দেয়ার অলওয়েজ ইজ ট্রাবল। আপা অ্যাট্রাক্টস ট্রাবল।
বুবকা একটু গরম হয়ে বলল, উই হ্যাভ টু স্পাই অন দি ম্যান। আপা, তুমি ওর ফ্ল্যাটের ড়ুপ্লিকেট চাবি জোগাড় করতে পারবে?
পারব।
পরমা বলে উঠল, আরে লক তো পিক করাই যায়। আমরা সবাই মিলে আজ সন্ধেবেলাতেই যাই চলো। লোকটাকে চেপে ধরি।
আপা মাথা নেড়ে বলে, না, সেটা বুদ্ধির কাজ হবে না। আমি আজ নজর রাখব। যশবীরের বাড়িতে টেলিফোন আছে। টেলিফোনেও খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করব। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, লোকটা পালিয়ে যাবে। মাথার ঠিক নেই এখন।
রাজেশ বলে, খুন করলেও বডি যে ঘরে আছে তার তো মানে নেই। যদি গাড়ি থাকে তো বডি নিয়ে গিয়ে ধাপা বা গঙ্গায় ফেলে দিয়ে আসতে পারে।
আপা বলল, ওদের গাড়ি আছে। কন্টেসা।
রাজেশ বলে, তাহলে? উই হ্যাভ টু অ্যালার্ট দি অথরিটি।
বুবকা একটু হেসে বলল, পুলিশের দরকার কী? আপার তো গুণ্ডার দল আছে। বলো আপা, এসব ঝামেলা মেটানোর জন্যই না তুমি গুণ্ডার দল খুলতে চেয়েছিলে?
আপা মৃদু হেসে বলল, তাহলে তুমিও তো মানো যে কেন একটা গুণ্ডার দল খোলা দরকার?
কিন্তু তোমার গুণ্ডারা তো অহিংসা গুণ্ডা। অহিংসা দিয়ে কি যশবীরের মতো লোককে টিটি করা যাবে?
