ফ্রিজ থেকে দুধ বের করে গ্যাস জেলে গরম করে এনে তাকে একটু খাওয়াল আপা। অনেকক্ষণ বাদে বিমলা বলতে পারল, আপা, আমি তো মরবই। কেন কষ্ট করছ?
না, মরবে না। মরলে লড়বে কে? উঠতে পারবে?
পারব।
তাহলে আমাদের বাড়ি চলো। এ বাড়ি তোমার পক্ষে নিরাপদ নয়।
কেন কষ্ট করবে। আপা? ছেড়ে দাও।
না। চলো।
০৭৭. ডারলিং আৰ্থ বইটা
ডারলিং আৰ্থ বইটা হাতে এসেছিল। কয়েকদিন আগে। চারুশীলার বাড়িতে ঝকমকে বইটা দেখে নিয়ে এসেছিল। লেখক ডঃ কৃষ্ণজীবন বিসোয়াস। প্রকাশক লস এঞ্জেলেসের একটা বই কোম্পানি। সাড়ে তিনশো পৃষ্ঠার শক্ত মলাটের বই। ভিতরে কিছু আর্ট প্লেট আর লাইন ড্রয়িং আছে। ত্রিশ ডলার দামটা বড্ড বেশি। লোকে কি কিনবে?
বইটা আনলেও পড়ার সময় পায়নি প্ৰথমে। অফিসের বকেয়া কাজ নিয়ে হিমসিম খেতে হচ্ছিল। এক শুক্রবার রাতে খাওয়ার পর বইটা নিয়ে শুয়ে পড়ল। খটোমটো টেকনিক্যাল বই নয়। যেন এ দার্শনিকের লেখা প্ৰবন্ধ-উপন্যাস। প্রথম পরিচ্ছেদের শুরুতেই এলিয়টের একটা উদ্ধৃতি, দিস ইজ দি ওয়ে দি ওয়ার্ল্ড এন্ডস, নাট উইথ এ ব্যাং, বাট এ হুইমপার। প্রথম পরিচ্ছেদেই প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত এক মানুষ বেরিয়েছে তার সঙ্গে পৃথিবীর ও বিশ্বজগতের সম্পর্ক অনুসন্ধানে; রোমান্টিক এক কবির মতো। কিন্তু রোমান্টিক কবি কখনও চায় না তার অনুসন্ধান চরিতার্থ হোক মীমাংসায়, সমাধানে, প্রত্যুত্তরে। শুধু ওই অনুসন্ধানই তার কাম্য, তার প্রার্থিত হল ওই রহস্যময়তার ঘেরাটোপ। কিন্তু কৃষ্ণজীবন চায় স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ সত্যকে। জড় থেকে চৈতন্যের স্তরে ক্ৰম অভিগমনকে নানা জ্বলন্ত প্রশ্নে, জরিপে, এষণায় উল্টে-পাল্টে দেখছে পাগল কৃষ্ণজীবন। খ্যাপার হাহাকার শুরু হল দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে, যার শুরুতেই কৃষ্ণজীবন উদ্ধৃতি দিয়েছে, কুয়ো ভেদিস? এক মহাকাশযাত্রীর চোখ দিয়ে দেখা পৃথিবীর দৃশ্য দিয়ে শুরু। আর তারপর এই উন্মাদ বৈজ্ঞানিক মানুষের সব ধ্যানধারণার ওপর যেন উপর্যুপরি আঘাত করতে চেয়েছে। কোথায় যাচ্ছে? কোথায় চলেছো তোমরা? এইভাবে এই গ্রন্থ এগিয়ে গেছে চূড়ান্ত রোমান্টিক পাগলামি আর বৈজ্ঞানিক পরিসংখ্যানে গাঁটছড়া বেঁধে। পড়তে পড়তে ঘুম কোথায় পালাল হেমাঙ্গর। শোয়া থেকে উত্তেজনায় উঠে বসল। সাড়ে তিনশো পাতার বই শেষ হয়ে গেল লহমায়। তখন হেমাঙ্গর দুচোখে টলটল করছে জল। বুক ভার। গলায় ঠেলা ঠেলি করছে কান্নার ডেলা।
রাত সাড়ে তিনটে। লন্ডনে রাত দশটাও বোধহয় নয়। হেমাঙ্গ থাকতে পারছিল না। কাউকে এই বইটার কথা তাকে বলতেই হবে। দ্রুত রশ্মির নম্বর ডায়াল করল সে।
আমি তোমাকে একটা বইয়ের কথা বলতে চাই রশ্মি।
তুমি এখনও জেগে আছো? কী করছিলে?
একটা বই পড়ছিলাম। সেই বইটার কথাই বলতে চাই। বইটা তুমি পড়ে। অবশ্যই পড়ে।
কী বই বলো তো!
ডারলিং আর্থ।
ওঃ! বলে একটু হাসল রশ্মি। তারপর বলল, এতদিনে পড়লে? আমার কয়েকবার পড়া হয়ে গেছে।
সে কী! তুমি বইটা পেলে কোথায়?
কেন, এখানে তো খুব বিক্রি হচ্ছে। সাত-আটটা রিপ্রিন্ট হয়েছে। আমারটাই বোধহয় সেভেনথ ইমপ্রেশন।
মাই গড! কৃষ্ণজীবন তা হলে এখন ওয়ার্ল্ড ফেমাস!
তাও বলতে পারো। তবে তুমি তো জানোই এসব দেশে বই এমনিতেই বেশি বিক্রি হয়। আর ওয়ার্ল্ড ফেমাস হতে বেশি দেরিও লাগে না। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ফেমাসদের সংখ্যাও যে বড্ড বেশি।
তা বটে। বই পড়ে তোমার কেমন লেগেছে বলো তো!
এত প্যাশনেট লেখা অনেকদিন পড়িনি। তুমি ভীষণ ইমপ্রেসড মনে হচ্ছে!
আমার মাথাটা একটু বিভ্রান্ত। ঠিক অ্যাসেস করতে পারছি না।
তুমি তো ভাল অ্যাসেসর নও। অনেক কিছুই অ্যাসেস করতে পারোনি।
রশ্মির হাসির শব্দটা শুনে একটু লজ্জা পেল হেমাঙ্গ। বলল, তোমার বোধহয় ততটা ভাল লাগেনি, না?
আমি ভদ্রলোককে চিনি। চারুন্দির বাড়িতে কয়েকবার দেখা হয়েছে। আমি ওঁর প্যাশনের কথা জানি। ডারৰ্লিং আর্থএ ইমোশন একটু বেশি। কিন্তু তবু ভাল। এখানকার কাগজে ভাল রিভিউ হয়েছ। এশিয়াবাসী বলে একটু ক্ষমাঘেন্নার ভাবও আছে। সাহেবরা যেমনটা হয়। আর কি।
বলছে, এ বই সাহেব লিখলে নোবেল প্রাইজ পেত?
ও বাবা, তা জানি না। নোবেল প্ৰাইজ অনেক বড় ব্যাপার।
আমার ক্ষমতা থাকলে দিতাম।
ভাগ্যিস তোমার ক্ষমতা নেই! রোজ এত রাত অবধি জেগে থাকো নাকি?
না। আজ বইটা পড়তে গিয়ে ঘুম চটে গেল। কৃষ্ণজীবনকেই ফোন করতাম। কিন্তু আনগডলি আওয়ার্সে ফোন করলে হয়তো প্রশংসাও ভাল মনে নেবেন না। কিন্তু কাউকে তো বলা দরকার, তাই তোমাকে বলতে হল।
বেশ করেছে। ডারলিং আর্থকে ধন্যবাদ। বইটার সুবাদে অন্তত তোমার গলা শোনা গেল।
কেন, আমি কি তোমাকে প্রায়ই ফোন করি না?
রশ্মি হাসল, মাসে দুবার। আমি কতবার করি বলে তো! চারবার।
আমাকে কৃপণ বলার চেষ্টা করছে নাকি?
একটু আছো। সব ব্যাপারেই তুমি একটু কৃপণ। এমন কি হৃদয়ের ব্যাপারেও।
তাই বুঝি?
শুধু এই ডারলিং আর্থের ব্যাপারে দেখছি খুব অকৃপণ।
বইটা তোমাকে কেন ইমপ্রেস করল না ভাবছি।
রশ্মি একটু চুপ করে থেকে আস্তে করে বলল, দেখ, পৃথিবীকে নিয়ে কৃষ্ণজীবনের কিছু উদ্ভট ভয় আছে। তাই উনি কল-কারখানা বন্ধ করতে বলছেন, মোটরগাড়ির ব্যবহার কমিয়ে সাইকেল, ঘোড়া এইসব ব্যবহার করতে বলছেন। তা করলে যে আন এমপ্লয়মেন্টের সৃষ্টি হবে তার সমাধান কে করবে? আরও অনেক কথা আছে যা খুব লজিক্যাল নয়।
