আচ্ছা।
কিন্তু বিশ্রাম হল না বীণার। মনের মধ্যে জ্বালা আর জ্বালা। বারবার একই স্বপ্ন দেখছে কেন সে, যদি স্বপ্নের মধ্যে কোনও মানেই না থাকে?
আরও তিন-চারদিন বীণা বিছানায় পড়ে রইল। তার মধ্যে কোনও খবর আনিয়ে দিতে পারল না। কুসুম। ষোলো দিনের দিন সকালবেলা জ্বর ছেড়ে গা ঠাণ্ডা হল। শরীর তখন চুপসে গেছে। উঠে বসবার ক্ষমতা নেই। ভীষণ দুর্বল।
আরও দুদিন পর কুসুম বলল, একটা খবর আছে বীণাদি।
কি খবর?
নিমাইদাদা বিয়ে করেনি।
বীণা কুসুমের দিকে একটু চেয়ে থেকে বলে, ঠিক খবর তো!
খুব ঠিক খবর। তবে খুব রমরম করে ব্যবসা করছে।
বীণা চুপ করে রইল। লোকটা ছোট্ট একখানা দোকান করতে চেয়েছিল। হয়-হচ্ছে করে হল না। কেন হল না? তখন বড্ড বীণার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হত লোকটাকে। বীণার অন্য দিকে তাকানোর সময় ছিল না। লোকটা যে ভিতরে ভতরে বড় হতাশ হচ্ছে, মনমরা হয়ে যাচ্ছে, এটা দেখেও দেখেনি। বীণা। শেষ অবধি ভেবেছিল ডলার। আর পাউন্ড বেচে একখানা দোকান করে দেবে। তাও হল না। সব ফাঁস হয়ে গেল। ধৰ্মপুতুর নিমাই তো ও পাপের টাকা ছোবেও না। আজ য লোকটা বীণার সাহায্য ছাড়াই দাঁড়িয়ে গেল সেটাও বীণার ঠিক সহ্য হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না, তা বুঝতে পারছে না বীণা। তার ইচ্ছে করে একদিন গিয়ে দোকানটা ভাঙচুর করে দিয়ে আসে।
হ্যাঁ রে কুসুম, আমি খুব স্বার্থপর?
ওকথা কেন বলো বীণাদি?
তোর নিমাইদাদার জন্য কি আমার কিছু করা উচিত ছিল?
ও বাবা, ওসব আমি জানি না। তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার।
ওভাবে পাশ কাটাস কেন? তোর কাছে ভাল ভেবেই জানতে চাইছি। মানুষ তো সব সময়ে নিজেকে বুঝতে পারে না।
আমিও বুঝি না গো বীণাদি। শুধু এইটুকু বলতে পারি, নিমাইদাদা লোক খারাপ ছিল না।
সবাই তাই বলে।
বীণা চুপ করে ভাবতে লাগল। তার ভাবনা-চিন্তাগুলো কিছু নিমাইয়ের পক্ষে গেল, কিছু বিপক্ষে গেল। তারপর কাটাকুটি হয়ে গেল। শুধু রইল বীণার বুকের জ্বালাটা।
আরও দুদিন পর গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ল বীণা। সোজা হাজির হল রিহার্সালে।
কাকা অবাক হয়ে বলে, টাইফয়েড খারাপ রোগ বীণা। অনেক সময়ে রিলান্স করে। তুমি এখনও কমজোরি। আরও সাত দিন বিশ্রাম নাও। তারপর রিহার্সাল।
ও বাবা, তা হলে আমি মরেই যাবো। রিহার্সাল ছাড়া আর আমার বাঁচা অসম্ভব। দিম আটকে আসছে।
কাজটা ভাল করছে না। বীণা ।
খুব ভাল করছি। পার্ট করতে করতে যদি মরেও যাই তাতেও সুখ আছে।
তা হলে করে! অনেক সময়ে মানুষ যা ভালবাসে তা করতে করতে চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
শরীর দুর্বল, মাথা ঝিম ঝিম, তা সত্ত্বেও বীণা কাজে নেমে গেল। প্রাণ ঢেলে অভিনয় করতে লাগল।
রিহার্সাল করতে রাত হয়ে গেলে দলের কেউ বীণাকে এগিয়ে দিয়ে আসে। অনেক সময়ে রিকশাতেও ফেরে। আজ কাকা তার সঙ্গে সজলকে দিল। সজল নতুন এসেছে। ছিপছিপে, লম্বা, শ্যামলা চেহারা! মুখচোখ খুব সুন্দর। দারুণ গাইতেও পারে।
সজল পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলল, তুমি এত ভাল পার্ট করো কি করে বলো তো বীণা! তোমার কাছে অনেক কিছু শেখার আছে।
বীণা মৃদু একটু হাসল। কিছু বলল না।
এ দলে থেকে তোমার কী হবে? সিনেমায় নামার চেষ্টা করো না কেন?
কে চান্স দেবে? সিনেমাওলারা কি গুণের দাম দেয়? কাকা আমার জন্য অনেক করেছে। এখানেই ভাল আছি।
ওটা কোনও কথা হল না বীণা। পৃথিবীটা যে কত বড় তা এই বনগাঁয়ে পড়ে থেকে কোনও দিন বুঝতে পারবে না। তোমার অনেক ক্ষমতা, তা কি টের পাও?
আগে স্তোকবাক্য শুনলে, প্রশস্তি শুনলে বীণা যত খুশি হত, আজকাল আর তা হয় না। কিন্তু খুশি না হলেও, একটু যেন ভাল লাগে ভিতরটা।
সজল বলল, তোমার হাজব্যান্ডের সঙ্গে কি ডিভোর্স হয়ে গেছে?
বীণা গম্ভীর হয়ে বলল, না তো!
হবে নাকি?
না, ডিভোর্স হওয়ার মতো অবস্থা এখনও হয়নি। কেন বলো তো!
এমনিই। তোমার জীবনে একটা দুঃখ আছে বলেই বোধ হয় এত ভাল অভিনয় করতে পারো! নইলে এই নাটকটা তো পুরো বুল। এ নাটক যদি দাঁড়ায় তবে তোমার জোরেই দাঁড়াবে।
অত প্ৰশংসা করতে হবে না। যদি আমি অত গুণের মেয়েই হতাম, তা হলে এত দিনে বড় জায়গায় চান্স পেতাম। কলকাতার যাত্রাপাড়ায় ঘুরে এসেছি, কেউ পাত্তা দেয়নি।
আমি বলি কি, তোমার সিনেমায় একটু চেষ্টা করা উচিত। কখনও চেষ্টা করেছো?
না। সিনেমায় কে চান্স দেবে? আমার চেহারা মোটেই সিনেমায় নামার মতো নয়।
সজল অবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে বলে, সে কি? তুমি তো রীতিমতো সুন্দরী। খুব ফটোজেনিক ফেস! কে বলল সিনেমার মতো নাও?
আমি জানি।
ভুল জানো। সিনেমায় নামার খুব শখ ছিল আমারও। কিন্তু হল না।
ও মা! তোমার হল না কেন? বেশ তো চেহারাটি।
হল না। কারণ, সিনেমার লাইনে ছেলেদের ভিড় বেশি, তাই চাহিদা কম। একজন ডিরেক্টর আমাকে বলেছিল, ভাই, তোমাকে চান্স দিতে পারব না, কিন্তু বোন-টোন যদি থাকে, নিয়ে এসো, তাকে চান্স দেওয়ার চেষ্টা করতে পারি।
বীণা হেসে ফেলল। তারপর বলল, মেয়েরাই বা কম যাচ্ছে নাকি? সিনেমায় চান্স পেতে কত মেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে স্টুডিওপাড়ায়।
সেসব হেঁজিপোঁজি। তোমার মতো গুণী মেয়ে কজন বলো?
বীণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কি জানো, আমাদের এত পেটের টান যে, কাণ্ডজ্ঞান বলে কিছু থাকে না। এই আমার কথাই ধরো। যদি অভাব না থাকত তা হলে যাত্ৰাদলে আসার কথা কি ভাবতে পারতাম? আমাদের বংশে কখনও কেউ এসব করেনি।
