একটু রাতে সে শুনতে পেল, নিচে অয়নের সঙ্গে অনিন্দিতার বাবার একটা কথা কাটাকাটি হচ্ছে যেন! সঙ্গে বউদির গলা। তবে অনিন্দিতা বাড়িতে নেই। তার ইভনিং ডিউটি, চয়ন জানে।
শরীরটা এত দুর্বল লাগল চয়নের যে, সে রাতে কিছু খেল না। দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ল।
অনিন্দিতা এল সকালে। খুব সকালেই।
কী হয়েছে তোমার বলো তো!
চয়ন মাথা নেড়ে বলল, বলার কিছু নেই।
আমি সব শুনেছি।
চয়ন একটা শ্বাস ফেলে বলল, সব ভুলে যাও।
তোমাকে কি অয়নদা মেরেছে?
চয়ন চুপ করে থাকে।
অনিন্দিতা শান্ত গলায় বলে, তোমাকে মারা তো সোজা। মারলেও তুমি কিছু করবে না, সবাই জানে।
ভুলে যাও অনিন্দিতা। আমার কিছু হয়নি।
তোমার হয়নি। আমার হয়েছে।
তোমার কী হয়েছে?
তোমার জন্য দুঃখ হয়েছে। আমার জন্যই তোমাকে এত অপমান সহ্য করতে হল তো!
আমার অভ্যাস আছে।
একটা কথা বলবে? দুর্বলকে সবাই কেন এমন করে মারে, অপমান করে। মানুষ এত নিষ্ঠুর হয় কি করে?
চয়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিছু বলল না।
অনিন্দিতা বলল, পাল্টে যেও না চয়ন। তুমি তোমার মতোই থেকো। তুমি খুব ভাল। আমি বলছি, তুমি খুব ভাল।
বলতে বলতে অনিন্দিতার ঠোঁট কাপল। গলা বুজে এল কান্নায়।
০৭৫. পনেরো দিন জ্বরে পড়েছিল বীণা
পনেরো দিন জ্বরে পড়েছিল বীণা। মনে হচ্ছিল জীবন থেকে একটা বিশাল কিছু হারিয়ে যাচ্ছে। চলে যাচ্ছে আয়ু, যৌবন, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রতিভা।
আগাগোড়া কুসুম তার কাছে থেকেছে। মাথা বোয়ানো, গা স্পঞ্জ করা, রান্না করে খাইয়ে দেওয়া। বেডপ্যানও দিতে চেয়েছিল। বীণা ওটা পারেনি, মরে মরেও উঠে উঠোনের ওধারে গেছে।
সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল একজন সঙ্গীর। সেই অভাব কুসুম খুব পুরণ করেছে।
জ্বরের শেষ দিকটায় বীণা একদিন সন্ধেবেলা বলল, হ্যাঁ রে কুসুম, আর জন্মে কি তুই আমার মা ছিলি? মাও তো এত করে না!
কী যে বলো বীণাদি! কী আর করলুম। এটুকু সবাই পারে।
বীণা মাথা নেড়ে বলে, না রে, পারে না। পারলেও করে না। আমি শুধু ভাবি, তোর যদি অসুখ করত। আমি কি যেতাম তোর সেবা করতে? নাকি পারতাম। এতটা? তুই বড্ড ভাল। এই যে এত সেবা করলি, আমার টাকা থাকলে তোকে একছড়া হার গড়িয়ে দিতাম।
কুসুম মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসল। বলল, হার দিলে তো শোধবোধ হয়ে যেত। তা হলে আর সেবাটার অন্য কোনও দাম থাকত না।
হ্যাঁ রে, জ্বরের ঘোরে তো মেলা ভুলভাল বকেছি। বেফাঁস কিছু বলে ফেলিনি তো!
কুসুম ভ্রূ কুঁচকে একটু ভেবে বলে, একটা জিনিস হল, নিমাইদাদাকে খুব গালমন্দ করেছো। প্রায় রোজ। আর একটা যেন ডলার। আর পাউন্ড নিয়ে কী একটা কথা।
বীণার মুখ শুকিয়ে গেল, ডলার। আর পাউন্ড! সে আবার কী রে?
কুসুম ঠোঁট উল্টে বলে, কী জানি কী! ডলার, পাউন্ড, খুন, পটু এইসব মাঝে মাঝে বলেছে।
বীণার বুক ধকধক করতে লাগল। চোখ বুজে নিজেকে শক্ত করে সে বলল, কত কী মাথায় আসে, কে জানে বাবা! যখন ভুলভাল বকেছি তখন বাইরের কেউ সামনে ছিল না তো!
না। তোমার লজ্জার কিছু নেই।
জ্বর হলেই আমি ভীষণ ভুলভাল বাকি। ছেলেবেলায় আমার তাড়কা হত।
কুসুম খুব হাসছিল। বলল, হ্যাঁ গো বীণাদি, নিমাইদাদার ওপর তোমার খুব রাগ, না?
কেন বল তো!
যখন ভুল বকেছো তখন বুঝতে পারতাম তোমার ভিতরটা খুব জ্বলছে।
বীণা একটু চুপ করে থেকে বলল, বাইরে থেকে তো কিছুতেই বুঝবি না, লোকটা আমার সঙ্গে কত প্ৰবঞ্চনা করছে!
কিন্তু নিমাইদাদাকে তুমি এখনও মন থেকে মুছে ফেলতে পারোনি।
মুছে ফেলবে কি করে? দাগ দিলে কি ভোলা যায়?
ভুলতে কি চাও?
খুব চাই।
কুসুম কি একটা কাজে উঠে গেল। ঘণ্টাখানেক বাদে যখন এল তখন বীণা বিছানায় বসে আছে।
বীণা বলল, দেখা কুসুম, জ্বরের মধ্যে আমি একটা অলক্ষুণে স্বপ্ন দেখেছি। একবার নয়, কয়েকবার। স্বপ্ন কি সত্যি হয়?
হতে পারে। অনেক সময়ে হয় বলেও তো শুনি। কী দেখেছে?
সে খুব খারাপ স্বপ্ন।
খারাপ স্বপ্ন বলে দিতে হয়। তা হলে আর ফলে না।
সত্যি?
সত্যি কি না কে জানে বাবা! মা খুড়িমার কাছে শুনেছি।
তা হলে তোকে বলে দিই। আমি দেখেছি, ও আবার বিয়ে করেছে। বউটা দেখতে বেশ সুন্দর।
কুসুম একটুও হাসল না। বলল, যাঃ, নিমাইদা সেরকম লোক নয়।
বীণা গম্ভীর হয়ে বলল, পুরুষমানুষকে তুই বিশ্বাস করতে পারিস, আমি একটুও করি না। ওরা সব পারে।
সব পুরুষ কি খারাপ হয়। বীণাদি? নিমাইদাদা তো কখনোই খারাপ লোক নয়। ওর ওপর তোমার রাগ বলে বলছো।
বীণা কাহিল গলায় বলে, একটা কাজ করবি কুসুম? কাউকে কাঁচড়াপাড়ায় পাঠিয়ে একটু খবরটা নিবি?
এবার কুসুম হেসে ফেলল। বলল, পারোও তুমি বটে। কাঁচড়াপাড়া তো আর বিলেত-বিদেশ নয়, হরবখত লোক ফ্ল্যাচ্ছে আসছে। খোঁজ নিলেই হবে। আমার দিদির শ্বশুরবাড়ি তো কাঁচড়াপাড়ায়। আমারই যাওয়ার কথা ছিল। তোমার অসুখের জন্য আটকে পড়লাম।
খবরটা আমাকে তাড়াতাড়ি আনিয়ে দিতে পারবি?
কবে চাই?
আজ পারলে আজই।
কুসুম হেসে ফেলে বলে, আজ যে রাত হয়ে গেছে সে খেয়াল আছে?
তা হলে কালই। পারবি না? আমার মনটা বড় অস্থির।
কুসুম বলে, নিমাইদাদাকে নিয়ে অত ভাবছো কেন? সে তোমাকে বড্ড ভালবাসত। হুট করে কিছুতেই বিয়ে করবে না। সে তেমন লোক নয়।
নিমাই একটা ছেড়ে দশটা বিয়ে করলেও আমার কিছু যায় আসে না। আমি শুধু ভাবি, আমার মতো আর কোনও মেয়ের যেন সর্বনাশ না হয়।
কুসুম তার মাথায় হাত রেখে বলে, এখন শুয়ে একটু চোখ বুজে থাকো। জানো তো, অসুখের মধ্যে মনের উত্তেজনা ভাল নয়, বেশি ভাবলে অসুখ বেড়ে যায়।
