ওটা আবার কুসংস্কার। অভিনয় একটা বড় ব্যাপার।
তা জানি। কিন্তু অধিকাংশই তো আসে পেটের টানে। শিল্প-টিল্প নয়। খানিকটা টাকা, খানিকটা হাততালি আর খ্যাতি, খানিকটা গ্ল্যামার। একটা গুজব আছে, সিনেমালাইনে অনেক পয়সা। কিন্তু পয়সার যে গুনেগার দিতে হয় তা বুঝছে কজন?
আহা, তুমি তো আর অত বোকা নও।
আমিও আমার মতো করে বোকাই।
সত্যি করে বলো তো, তুমি কি অভিনয় করে নাম কিনতে চাও না?
বীণাপাণি মৃদু হেসে বলল, তাও চাই। কিন্তু তার চেয়েও বেশি চাই, প্রাণভরে অভিনয় করতে।
বীণাকে বাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়ে এক কাপ চা খেয়ে চলে গেল সজল। কিন্তু দুদিন পর আবার বীণাপাণিকে এগিয়ে এল।
বীণা, তোমার একা লাগে না?
লাগে। মাঝে মাঝে লাগে। তবে স্বামীর জন্য নয়। এমনি।
আমি তোমার কথা খুব ভাবি, জানো?
কেন ভাবো?
তা কি করে বলবো? তোমার অভিনয়, হাঁটা-চলা, ফিগার, গলার স্বর, গান সব কিছুই এত ইমপ্রেসিভ।
বানিয়ে বানিয়ে আর মিথ্যে কথাগুলো বোলো না তো!
মিথ্যে? তাও কি হয়?
মিথ্যেই তো।
সজল খুব চিন্তান্বিত হয়ে বলে, আমার মনে হওয়াটা ভুল হতে পারে, হয়তো আমি তোমাকে যতটা মনে করছি, তুমি ততটা নও। কিন্তু তা বলে আমাকে মিথ্যেবাদী ভেবো না।
দুদিন পর আবার দুজনে একা হল। নির্জনতা ছিল, পথ অন্ধকার ছিল, সজল তার একখানা হাত ধরে বলল, বীণা, আমার মাথায় একটা পাগলামি এসেছে। প্রশ্ৰয় দেবে?
নাটক করছো?
আমি একদম বাজে অ্যাকটর। অভিনয় জানিই না।
হয়তো, স্টেজের অভিনয় জানো না। অনেকে স্টেজে পারে না, কিন্তু জীবনে পারে, বাস্তবে পারে।
সজল হাতটা ছেড়ে দিয়ে বলে, তা হলে থাক।
বীণা একটু মুচকি হাসল। কতদিনের জনা থাকল, তা কে জানে? সজল যে সহজে হাল ছাড়বে এমনটা তার মনে হল না। অখুশিও হল না সে। পুরুষহীন জীবন একটু আলুনি তো বটেই। এ পর্যন্ত বীণা নিজেকে অনেক আঁটবাঁধ দিয়ে ধরে রেখেছে। কিন্তু এই যৌবন জলতরঙ্গ রুধিবে কে? টাইফয়েডের পর তার শরীর সেরেছে। একটু কি মোটাও হয়েছে সে? পুরনো অম্বলের অসুখটা আর নেই। এখন তার খুব খিদে পায়। ভাল ঘুম হয়। শরীর এখন অনেক কিছু চায়। মনটা বড় দোল খায় দিনরাত।
কাঁচড়াপাড়ায় নিমাইয়ের দম ফেলার ফুরসন্ত নেই। তার দোকান বড় খদেরদের জন্য নয়। ব্যাপারী, মুটে-মজুর, ঠিকাদারদের লোক, ট্রাকওয়ালা এদেরই ভিড় বেশি। দামে সস্তা, খেতে ভাল এমন খাবারের দোকান হলে ভিড় হবেই।
দুপুরবেলাটায় দুটো-আড়াইটের পর একটু ফাঁকা যায়। সে সময়টায় নিমাই একটু খেয়ে জিরিয়ে নেয়। রাতের চৌকিদারি এখনও ছাড়েনি বলে দুপুরের তন্দ্রাটুকু দরকার।
সেই তন্দ্রার মধ্যেই দোকানের ছোকরা এসে ডাকল, একজন আপনাকে খুঁজছেন।
নিমাই বলে, কী চায়?
বনগাঁ থেকে এসেছেন।
বনগাঁ! নিমাই একটু চনমনে হল। উঠে বলল, যা, যাচ্ছি।
চোখে জল-টল দিয়ে এসে যাকে দেখল, তাকে সে চেনে না। ছেলেটা বসে বসে মাংস পরোটা খাচ্ছে।
কিছু বলবেন আমাকে?
ছেলেটা তার দিকে চেয়ে হাসল। বলল, আপনার দোকানের খুব নাম শুনেছি। বেশ রান্না তো এখানে!
ভগবানের দয়া। আপনি কি বনগাঁর লোক?
আজ্ঞে হ্যাঁ। একটু কথা ছিল।
নিমাই উল্টোদিকের চেয়ারে বসে বলল, খবর আছে কিছু?
আছে। আমি কাকার দলে অ্যাকটিং করি।
কাকার দল শুনে বুকটা একটু চলকে গেল নিমাইয়ের। তার মানে বীণাকেও চেনে। ছেলেটার চেহারা ভাল। শক্তসমর্থ আছে। মুখখানাও বেশ।
নিমাই বলল, ও।
সজল হাত-মুখ ধুয়ে রুমালে মুখ মুছতে মুছতে এসে ফের চেয়ারে বসল।
একটা কথা বলবেন?
বলুন না!
বীণার সঙ্গে কি আপনার আবার মিল হতে পারে?
এ কথার কি জবাব হয়? নিমাই তো হাত শুনতে জানে না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, বীণা চাইলে হয়তো হয়। কিন্তু, বীণা আর চাইবে না।
কেন, বলুন তো।
সে অনেক কথা। সব বলা যাবে না।
বীণা না চাইলে হয় না?
না।
আপনি কি চান?
নিমাই মাথা নেড়ে দুঃখিতভাবে বলল, আমার চাওয়ায় কি এসে যায় বলুন! আমি তার চোখে পোকামাকড় বই তো নয়!
ছেলেটা কিছুক্ষণ বাইরের দিকে আনমনে চেয়ে থাকে। তারপর বলে, ডিভোর্সের কথা ভাবছেন কি?
ডিভোর্স! না, সেসব ভাবব কেন? আমাদের মধ্যে একটা গণ্ডগোল আছে ঠিকই, কিন্তু ডিভোর্সের মতো নয়।
এভাবে আলাদা আলাদাই থাকবেন দুজনে?
উপায় কি?
উপায়! উপায় নিশ্চয়ই আছে। স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে বাস না করলে বিয়ে জিনিসটাই তো মিথ্যে হয়ে যায়!
নিমাই হাসল, স্বামী মরে গেলে স্ত্রী বিধবা হয়। বিয়ে মিথ্যে হবে কেন?
আপনি শাস্ত্রের কথা বলছেন, আমি আইনের কথা বলছি।
আইন! আমি তো আইন-টাইন জানি না। শাস্ত্রও জানি না। শুনে যা বুঝেছি। ভুলও বুঝে থাকতে পারি। আপনার নামটা কী আজ্ঞে?
সজল রায়। আমি নতুন এসেছি।
হ্যাঁ। পুরনোদের আমি চিনি।
ছেলেটা মাথা নিচু করে কি যেন ভাবল।
আপনি কিছু একটা বলতে এসেছেন। সেইটে বলুন।
সজল মুখ তুলে একটু হাসল। বলল, কি ভাবে বলব, তা ভেবে পাচ্ছি না।
সোজা বলে ফেলুন।
ছেলেটা মাথা নেড়ে বলে, আপনি রাগ করবেন।
নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, রাগ করব কেন? আমার তার ওপর কোনও রাগ নেই। সে যা ভাল বোঝে করতে পারে, আমার কিছু আপত্তির কারণ দেখি না।
ছেলেটা ফের অধোবদন হল। মুখ না তুলেই বলল, বীণারও কিছু সংস্কার আছে।
নিমাইয়ের বুকে কোনও তোলপাড় হল না। ছেলেটা কী বলতে চাইছে তা সে স্পষ্টই বুঝতে পারছে। তবু বুকে ঝড় উঠছে না। তার। শুধু যেন তার মনের মধ্যে সব আলো নিবে গেল। হঠাৎ সামান্য ধরাগলায় নিমাই বলল, ডিভোর্স চায় পাবে। কোনও বাধা নেই। তাকে বলবেন।
