সে বলল, আমি গুছিয়ে কথাটাও বলতে পারি না। ঠিক আছে, রবিবার কোথাও একটা যাওয়া যাবে।
অনিন্দিতা মাথা নাড়ল, তোমাকে কোথাও যেতে হবে না। আমি একটু মজা করছিলাম।
তার মানে?
মানে হল, তোমাকে আমার মতো কেউ জানেও না, বোঝেও না। তুমি যে একা একা আপনমনে নিজের ছোট গণ্ডির মধ্যে থাকতে ভালবাসো তা আমি বুঝি। দক্ষিণেশ্বরে যাওয়ার কথা বলে তোমাকে একটু চমকে দিলাম। কিছু মনে কোরো না।
চয়ন একটু হাসল।
কিন্তু ব্যাপারটা এখানেই শেষ হল না। সকালে, দুপুরে বা বিকেলে অনিন্দিতার সঙ্গে তার রোজই দেখা হয়। কথা হয়। আর এসবের ভিতর দিয়ে অনিন্দিতা তার খুব কাছাকাছি এসে পড়তে থাকে। যেন বন্ধ দরজায় ঘা দিচ্ছে এক আগন্তুক।
বাস্তবিকই ভয় পেয়ে যেতে থাকে চয়ন।
একদিন টিউশনি সেরে বেশ একটু রাতের দিকেই ফিরে সব স্টোভ ধরানোর চেষ্টা করছিল চয়ন। এমন সময় ছাদে উঠে এল তার দাদা অয়ন। দাদার সঙ্গে তার দেখাসাক্ষাৎ হয় না। দেখে একটু অবাক হল সে।
অয়ন বলল, তোর সঙ্গে একটু কথা আছে।
চয়ন সভয়ে দাঁড়িয়ে বলল, বলো।
অয়ন একটু রুক্ষ গলায় বলল, কী সব কাণ্ড হচ্ছে বল তো! ব্যাপারটা কী তোর?
চয়ন অবাক হয়ে বলল, কিসের ব্যাপার?
কী সব শুরু করেছিস ওই মেয়েটার সঙ্গে?
চয়ন হাঁ করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কোনও কথা খুঁজেই পেল না।
শুনছি নাকি প্রায়ই ছাদে আসে। খুব মাখামাখি তোর সঙ্গে।
চয়ন এত ভয় পেল যে কথা বলতে গিয়ে তার গলা কাঁপতে লাগল। কোনওরকম বলল, আসে তো, কিন্তু আমি কী করব?
বাড়িতে একটা নোংরা ব্যাপার হচ্ছে, এটা কি ভাল? আশপাশের বাড়ি থেকেও শোনা যাচ্ছে তোরা নাকি রীতিমতো মাখামাখি শুরু করেছিস!
চয়ন কঁপা গলাতেই বলে, না না, সেরকম তো কিছু নয়।
তাহলে কি বানিয়ে বলছি নাকি? তোর তো এসব দোষ আগে ছিল না। হঠাৎ পাখা গজাল নাকি?
চয়ন আত্মপক্ষ সমর্থনের মতো উপর্যুক্ত কথা খুঁজে না পেয়ে বলল, আমাকে কী করতে বলছ?
সে কথা পরে। আগে জানতে চাই, ব্যাপারটা কতদূর গড়িয়েছে?
চয়ন শুধু বোবার মতো মাথা নেড়ে জানাতে চেষ্টা করল যে ব্যাপারটা এগোয়নি।
অয়ন সেটা বিশ্বাস করল না। বলল, ওই ধুমসি মেয়েটাও তো কম নয়। অত্যন্ত ঝগড়াটে টাইপের, বারমুখো। তুই ওর পাল্লায় পড়লি কেন?
চয়ন তোতলাতে তোতলাতে বলল, আমি তো কিছু করিনি।
ও আসে কেন? ছাদে কাপড় শুকোতে আসে বা চুল শুকোতে আসে, ঠিক আছে। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে, তোর বউদি পর্যন্ত ছাদে আসতে গিয়ে কতদিন দরজা থেকে ফিরে গেছে! ঝি-মেয়েটা অবধি নালিশ করে যে তোরা ছাদে থাকলে ওর আসতে নাকি লজ্জা করে।
চয়নের মাথা চক্কর দিচ্ছিল। কিছুক্ষণ হাত মুঠো করে, দাঁতে দাঁত চেপে সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, দাদা, আমার কোনও দোষ নেই। তুমি বিশ্বাস করে।
দোষ নেই! বেশ কথা তো! দোষ নেই মানে? একটা বয়সের মেয়ের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করছিস আর বলছিস দোষ নেই? মেয়েটা তোর ঘরেটরে যায় না?
না তো!
মিথ্যে কথা। শুধু যায় তাই নয়, সেবা-টেও করে বলে শুনলাম। এসব নোংরামি তো এখানে চলবে না।
চয়ন বিমূঢ় হয়ে বলল, আমি কি করব?
বাড়ি ছেড়ে দে। দু মাস সময় দিচ্ছি, অন্য ঘর দেখে উঠে যা।
উঠে যাব?
আমরা ওদেরও উঠবার নোটস দিয়েছি। এসব এ বাড়িতে চলবে না। বুঝেছিস?
অয়নের দিকে চেয়ে ছিল চয়ন। এই দাদা তাকে চ্যাঙাব্যাঙা করে মেরেছে, মাকে সুষ্ঠু তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছে, এবং এ বাড়িতে তাকে আর মাকে একঘরে করে ফেলে রেখেছে। সত্যি কথা, বাড়িটা ওর। কিন্তু মানুষগুলোও কি ওর নয়? মা বা ভাই? একটা বাড়ির অধিকারের জন্য মা বা ভাইকে এতটা অবহেলা অনাদর করা যায়।
চয়ন হঠাৎ দাদার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বলল, আমাকে বাড়ি ছাড়ার নোটিস দিচ্ছ?
হ্যাঁ।
যে কারণে বাড়ি ছাড়তে বলছ সেটা সত্যি কিনা তা যাচাই করে দেখবে না?
যাচাই! যাচাই করার কী আছে? সবাই দেখছে, বলাবলি করছে।
অনিন্দিতাকেও কি কথাটা বলেছ?
অয়ন কখনও চয়নকে মুখে মুখে কথা বলতে দেখেনি। আজ বোধ হয় এইসব কথা শুনে অবাক এবং বিরক্ত হল। বলল, সেটা আমরা যা ভাল বুঝব করব। অনিন্দিতা পরের মেয়ে, তাকে এসব কথা বলা যায় না।
চয়ন হঠাৎ বলল, আর আমি?
তুই কী?
আমিও তো পরের ছেলে।
পরের ছেলে। তার মানে।
আমি তোমার কে?
তার মানে? এসব কথার অর্থ কী?
আমি কি তোমার ভাই? ভাই বলে মনে করো?
অয়ন এত রেগে গেল যে মুখখানা আচমকা রক্তাভ হয়ে গেল তার। কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না। তারপর একেবারেই আচমকা ঠাস করে একটা চড় কষাল চয়নের গালে, অসভ্য! ইতর! জানোয়ার! দুধকণা দিয়ে কালসাপ পুষেছি এতদিন।
এসব কথা অবশ্য চয়নের কানেই গেল না। চড়টা খেয়ে সে নিজের শরীরটা একটা বোয্যর মতো নিয়ে পড়ে গেল শানের ওপর। রিমঝিম করছে মাথা। কানে কোনও শব্দ আসছে না।
কিন্তু তবু অজ্ঞান হল না চয়ন। ঝিম ধরে পড়ে রইল।
অয়ন কিছুক্ষণ তার দিকে চেয়ে থেকে হঠাৎ চলে গেল।
সামলে নিয়ে উঠে বসতে অনেকটা সময় লাগল চয়নের। কিছুক্ষণ বোকা-মাথায় সে বসে রইল শানের ওপর। দুটো চোখ ঝাঁপসা হয়ে আসছে। চড়ের জায়গাটা জ্বালা করছে। ঘাড়টা যেন শক্ত হয়ে উঠছে ক্ৰমে।
আরও কিছুক্ষণ পর চয়ন উঠল। স্টোভটা নিবিয়ে দিয়ে ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ল বিছানায়।
এ বাড়ি ছেড়ে সে কোথায় যাবে? বুকের মধ্যে অচেনা ভয় যেন পাকিয়ে উঠছে তার। অচেনাকে তার বড় ভয়।
চোখের জলে বালিশ ভিজে গেল তার। অথচ সে কাঁদছে না তো! কাঁদছে না। আপনা থেকেই তার চোখ তবে কেঁদে যাচ্ছে কেন? এর কোনও মানেই যে হয় না।
