আপনি আজকাল অঙ্ক ছেড়ে কবিতা ধরেছেন দেখছি। কথায় কথায় উপমা আসছে কেন?
চয়ন ভীষণ লজ্জা পায়। একটু হেসে বলে, তাই তো! আজ যেন কেন আমার খুব উপমা চলে আসছে মাথায়।
আপনার ভিতরে যে এত উপমা আছে, তা কি এতদিন জানতেন?
না। আজ কি সব হচ্ছে।
তেমনি আপনার ভিতরে আরও কি আছে তাও আপনি জানেন না।
ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মতো? হঠাৎ জেগে উঠব?
এবার অনিন্দিতা হেসে ফেলল, নাঃ, আপনি সত্যিই এর পর হয়তো কবিতা লিখতে শুরু করবেন।
একটু তটস্থ হয়ে চয়ন বলে, আর হবে না।
অনিন্দিতা স্মিত মুখে বলে, হচ্ছে হোক না। বোল ফুটছে, এ তো ভাল লক্ষণ। এমনিতে তো কথা বলতেই কাঁটা হয়ে থাকেন।
আমি এরকমভাবে কখনওই কথা বলি না। আজ একটু প্রগভতায় পেয়েছে আমাকে।
প্ৰগলভ? আপনি কি আজকাল গোপনে ডিকশনারি পড়েন নাকি?
চয়ন একটু ম্লান হাসল। বলল, না।
রাগ করলেন?
রাগ করার মতো কিছু তো হয়নি। আমার রাগই নেই।
একটু রাগ থাকা কিন্তু ভাল।
আমার কখনও রাগ হয় না।
শুধু ভয় আর লজ্জা?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
অনিন্দিতা চোখ বড় করে তার দিকে একদৃষ্টে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, আজ একটা সাহসের কাজ করবেন? নাটক দেখতে যাওয়া? না, আজ কিন্তু সত্যিই সময় নেই।
না, নাটক নয়।
আর কী সাহসের কাজ?
আমাকে আজ থেকে তুমি করে বলবেন!
চয়ন প্ৰায় আঁতকে উঠে বলে, আপনাকে?
কেন, আমি তো আর গুরুজন নই। বাধা কিসের?
তুমি করে?
হ্যাঁ। আমিও তোমাকে তুমি করে বলতে চাই। বলো চয়ন।
খুব অপ্রস্তুত হল। একটু লালও হয়ে গেল। তারপর বলল, আচ্ছা। চেষ্টা করব।
ওটা আবার কী হল? এখনই বলতে হবে। চেষ্টা করব বললে ছাড়ছি না। বলো শিগগির!
বলছি। তুমি।
অনিন্দিতা খিলখিল করে হাসল। তার শাখ-সাজা চমৎকার দাঁতের সারি ঝিকিয়ে উঠল রোদে। বলল, বাঃ, এই তো বেশ হয়েছে।
একটা মস্ত পরিশ্রমের কাজ করে যেমন অবসাদের মতো হয়, অনিন্দিতাকে এই তুমি বলার পরিশ্রমে তেমনই অবসাদ বোধ করল চয়ন। মুখে হাসি টেনে বলল, এটা খুব সাহসের কাজ বুঝি?
তোমার পক্ষে আমাকে তুমি বলতে গিয়ে তোমার মুখ-চোখের যা অবস্থা হল! উঃ কি একটা মানুষ তুমি! মধ্যযুগে বাস করছ এখনও?
চয়ন ধাতস্থ হতে একটু সময় নিল। তারপর বলল, মেয়েদের সঙ্গে আমার বেশি মেলামেশা হয়নি তো। তাই একটু দূরত্ব ছিল।
তোমার কবে ছুটি বলো তো! রবিবার, না?
মনে মনে উদ্বিগ্ন হয়ে চয়ন বলল, সব রবিবার দুটি নয়। মানিকতলায় একটি ছাত্র শুধু শনি আর রবিবারই পড়ে।
তোমাকে নিয়ে আর পারি না। রবিবারটা ফাঁকা রাখতে পার না? তোমার বোধ হয় ছুটি ভাল লাগে না, না?
চয়ন বলে, এ টিউশনিটা নতুন হল। আগে তো রবিবারটা ছুটিই থাকত।
টিউশনিটা কখন?
সন্ধেবেলায়।
সকালটা তো ফ্রি?
হ্যাঁ।
তা হলে সকালে যদি একটা প্রোগ্রাম করি?
কিসের প্রোগ্রাম?
দক্ষিণেশ্বর যাওয়ার?
দক্ষিণেশ্বর! বলে অকূলপাথারে পড়ে গেল যেন চয়ন। সে কেন দক্ষিণেশ্বর যাবে? তার তে ইচ্ছে করছে না! কেন অন্যেরাই তাকে সবসময়ে চালাবে? কেন সে কঠিনভাবে কাউকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না।
ও কি, একদম স্পিকটি নট হয়ে গেলে কেন? মাকে নিয়ে যাচ্ছি সঙ্গে। দক্ষিণেশ্বর তোমার ভাল লাগে না?
চয়ন মাথা নেড়ে বলে, ভালই। তবে ইচ্ছে করে না।
আচ্ছা, তা হলে থাক। তোমার মুখ দেখেই বুঝতে পারছি, এটা তোমার পছন্দ হচ্ছে না। যদি অন্য কোনও প্ল্যান করি।
কি রকম প্ল্যান?
ধরো, যদি একটা গানের অনুষ্ঠানে যাই? কিংবা একটা নৃত্যনাট্য?
চয়ন একটু হেসে বলে, ওসব আমি ভাল বুঝি না।
তবে তোমার কী ইচ্ছে?
ইচ্ছে? বলে চয়ন চুপ করে থাকে।
আবার চুপ করে আছ? এবার কিন্তু চিমটি দেব।
আমার যে কিছুই ইচ্ছে করে না।
কিছুই না?
কিছুই না।
ধীরে ধীরে অনিন্দিতা একটু গম্ভীর আর বিষণ্ণ হয়ে গেল। তারপর বলল, তোমাকে এসব বলাই আমার ভুল হয়েছে। তুমি আমাকে পাত্তাই দাও না।
না না। বলে চয়ন একটা অস্পষ্ট আপত্তি করল।
অনিন্দিতা বলল, তুমি আমাকে ভয় পাও না তো? না কি ঘেন্না?
হতভম্ব চয়ন বলে ওঠে, কী যে বলেন তার ঠিক নেই!
আবার আপনি?
ও, তুমি! কী সব বলছ ভয়! ঘেন্না! পাগল নাকি?
তা হলে অ্যাভয়েড করতে চাও কেন?
চয়ন কিছুতেই বলতে পারবে না একে যে, মানুষ যে তাকে উদ্বুদ্ধ করতে চায়, তাকে প্রেরণা দিতে চায়, তাকে টগবগে করে তুলতে চায়, সেটা চায় তাদের নিজেদের তাগিদেই। তারা তাকে ব্যবহার করে গিনিপিগের মতো। সে যে নিজের মতো করে একটা গুটিপোকার খোল বানিয়ে নিয়ে তার মধ্যে বাস করছে সেখানে এসবের কোনও দাম নেই। সে নিজের মতো করে বেঁচে আছে, অন্যের পছন্দমতো সে বাঁচতে যাবে কেন? তার তো দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডার হতে ইচ্ছে। করে না। মানুষকে এটা যদি সে বোঝনোর চেষ্টা করে তা হলে মানুষ অবধারিত অপমান বোধ করবে।
চয়ন বলল, অ্যাভয়েড করতে চাই না তো। তবে আমার কোথাও না যেতে যেতে এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে, কোথাও যাওয়ার কথা উঠলেই অস্বস্তি হয়।
তুমি কিন্তু সুন্দরবনেও গেছ। এবং একা।
ওঃ, হ্যাঁ।
সেটা কি করে পারলে?
দায়ে পড়ে।
মোটই নয়। একা যেতে তোমার অস্বস্তি হয় না, কিন্তু কারও সঙ্গে যেতে হয়। তাই না? যদি সেই কেউটা হয় অনিন্দিতা।
তুমি রাগ করছ?
না। তবে আমার একটু অভিমান হয়েছে। যদিও সেটার কোনও দাম নেই তোমার কাছে।
কথাবার্তার হওয়া কোন দিকে ঘুরছে তা বুঝতে পারছিল না চয়ন। কিন্তু তার বুক একটু কাঁপছিল। অস্বস্তি হচ্ছিল।
