বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, না।
না কেন বাবা? যা বলবেন।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, আমি বিচক্ষণ মানুষ হলে তোক দিয়ে শপথ করিয়ে নিতাম। কিন্তু আমার ভরসা হয় না বাপ। কী করতে কী করে ফেলি! আমাকে মাপ কর।
বলছি তো, আপনি যেমন চান আমাকে তেমন হতে বলুন। প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিন।
তাই কি হয় বাপ? আমি যেমন চাই, তুই তেমনটাই বা হবি কেন? আমি চাইবার কে? দুনিয়ার সব ভালমন্দ কি আমি বুঝি? তুই নিজে বুঝে দেখ বাপ।
আমি যে বুঝতে পারি না বাবা।
আমিও পারি না। এই তো দেখি, বামা মদ-বিড়ি খায় না, অন্য দোষও কিছু নেই বোধহয়, তবু তাকে কি ভাল দেখি। আর এই যে তুই নেশাভাঙ করিস, গুণ্ডার দল নিয়ে বেড়াস, তুই কি ততটা খারাপ? মানুষের ভাল-মন্দর বিচারটাও তো গোলমেলে। আমার কাছে ভাল হলেই কি ভাল, খারাপ হলেই খারাপ। গান্ধীবাবার মধ্যেও তো লোকে খারাপ দেখেছে, নইলে মারে?
রামজীবন আর একটু কাছ ঘেঁষে বসল। বিষ্ণুপদর পা দুখানা কোলে তুলে নিয়ে বলল, আপনি ক্ষমা করলেই আমার সব পাপ মুছে যাবে বাবা।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, ওরকম বলিস না। আমি কি তোর মালিক, না সৃষ্টিকর্তা? ওরকম বলিনি, বাপ-মা তো ক্ষমা করার জন্য মুখিয়েই থাকে। তাদের ক্ষমায় কি ক্ষমা হয়? আরও বড় জজ আছে।
আমার কাছে আপনারা দুজনেই ভগবান।
বিষ্ণুপদ একটু হাসল। বলল, বামা যা চায় দিয়ে দিতে পারবি?
তা কেন পারব না। আপনি বললেই পারব।
দিতে বলিনি। দিতে পারবি কিনা জিজ্ঞেস করলাম।
পারব বাবা।
বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, ওতেই হবে।
আপনি আমাকে কখনও মদ ছাড়তে বলেননি বাবা। কেন বলেননি?
বলে কি লাভ?
পা দুখানা বুকের কাছে চেপে ধরে ঝুম হয়ে বসে থাকে রামজীবন। তারপর বিষ্ণুপদ টের পায়, রামজীবন কাঁদছে। ফুলে ফুলে কাঁদছে। সেই কান্না বিষ্ণুপদ নিঃশব্দে বসে শুনতে লাগল। নড়ল না। একটা কথাও বলল না। রামজীবনের কান্নাই যেন আকাশ থেকে অন্ধকার মুছে দিচ্ছে। বিষ্ণুপদর বুক থেকেও। বিষ্ণুপদ বহুকাল এত বুকভরা আনন্দকে টের পায়নি।
০৭৪. যারা টিউশনি করে
যারা টিউশনি করে তাদের কিন্তু টিউশনির একটা নেশা ধরে যায়, তা জানেন? তখন আর চাকরিবাকরি করতে চায় না। আমার মনে হয় আপনারও নেশা ধরে গেছে।
কথা হচ্ছিল ছাদে। দুপুরবেলা। আজ অনিন্দিতার ছুটি। চয়ন আরও পরে বিকেলের টিউশনিতে বেরবে। শীতের রোদ ছাদময় ছড়িয়ে রয়েছে। কিছু লেপ, কম্বল, বালিশ রোদে দিয়েছে অনিন্দিতা। এ সময়টায় নিজের দুর্বল শরীরটাকে রোদে একটু সেঁকে নেয় চয়ন। মুখখামুখি দুজন একটা তোশকের ওপর বসে আছে।
যে যা বলে চয়ন তা মোটামুটি মেনে নেয়। তর্ক করে না, তেমন আপত্তিকর কথা হলেও আপত্তি তোলে না। ফলে সকলের সঙ্গেই তার সম্পর্কটা বজায় থাকে। সে অনিন্দিতার কথায় সায় দিয়ে বলে, বোধ হয় ঠিকই বলেছেন। তবে টিউশনিতে ছোটাছুটির পরিশ্রম বেশি।
ছোটাছুটিই তো ভাল। ইন্টারেস্টিং। একঘেয়েমি থাকে না।
চয়ন একটু হাসল, তা হলে কি আপনি টিউশনির পক্ষে?
অনিন্দিতা মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, মোটেই তা নই। টিউশনি দু-একটা করা খারাপ নয়। কিন্তু সারাক্ষণ ছেলেমেয়ে পড়িয়ে বেড়ানো মোটেই ভাল নয়।
চয়ন কথাটায় সায় দিয়ে বলল, অনেকটা বাড়ির কাজের লোকের মতো, তাই না? প্রাইভেট টিউটরের তেমন সম্মান নেই।
অনিন্দিতা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, সে তো হল, কিন্তু টিউশনি করেই কি জীবনটা কাটিয়ে দেবেন ভেবেছেন? আচ্ছা কুঁড়ে লোক আপনি!
চয়ন একটু চুপ করে থেকে বলল, আমার কি কোনও ক্যারিয়ার থাকার কথা? মা কী বলত জানেন? বলত, শুধু বেঁচে থাক বাবা, তোর কাছে আমি আর কিছু চাই না। আমি ছেলেবেলা থেকেই তাই জেনে এসেছি, আমাকে শুধু কোনওরকমে বেঁচে থাকতে হবে।
এটা পুরুষমানুষের মতো কথা হল?
পুরুষমানুষ কথাটা একটা মস্ত কথা। সবাই তো সমান হয় না, হয় বলুন।
অনিন্দিতা তার দিকে স্পষ্ট চোখে চেয়ে বলল, নিজের সম্পর্কে আপনার ধারণা এত খারাপ কেন বলুন তো! আত্মবিশ্বাস নেই একটুও?
আজ্ঞে না।
কী যে করি আপনাকে নিয়ে! সবসময়ে যেন জুজুর ভয়ে জড়সড় হয়ে আছেন।
চয়ন একটু হাসল। তারপর মৃদু গলায় বলল, সত্যিই, আমার মতো ভীতু বোধ হয় দুটো নেই।
আমি রোজ আপনাকে একটু একটু করে ইনস্পিরেশন দেওয়ার চেষ্টা করি সেটা কি বুঝতে পারেন?
চয়ন লজ্জিত হয়ে বলল, আজ্ঞে, তা পারি।
কিন্তু আপনি একটুও ইনম্পায়ার্ড হন না। তাই না?
চয়ন মাথা নিচু করে হাসতে লাগল। তারপর বলল, কেউ আমার জন্য ভাবছে এটা জেনে আমার একটু উৎসাহ হয়।
আহা, কী কথা! একটু উৎসাহ হয়! কেন, গা ঝাড়া দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সব ওলটপালট করতে ইচ্ছে হয় না?
ও বাবা! কী ওলটপালট করব?
সব কিছু।
চয়ন হাসতে লাগল।
হাসছেন কেন? আমি কিন্তু সিরিয়াসলি বলছি।
আপনি অত সিরিয়াস হবেন না।
কেন হব না? আমি আপনার জন্য ভাবি, কষ্ট পাই, তা জানেন?
অপ্ৰতিভ হয়ে চয়ন বলল, কেন ভাবেন? ভেবে কিছু তো লাভ নেই। আমার ভিতরে কোনও ঘুমন্ত বীরপুরুষ নেই যে তাকে জাগিয়ে তোলা যাবে। এমন ছাইচাপা আগুনও নেই যাকে আবার খুঁচিয়ে গগনে করে তোলা যাবে।
নিজের সম্পর্কে কারোই পরিষ্কার ধারণা থাকে না। আপনারও নেই।
চয়ন লাজুক হেসে বলল, আপনার কথা খুব ঠিক। কিন্তু আমি অনেক দিন ধরে নিজেকে লক্ষ করছি। কখনও বন্ধুর মতো, কখনও শত্রুর মতো। কিন্তু নিজের মধ্যে আমি কিছু খুঁজে পাই না। মনে হয় ধ্বংসাবশেষে বৃথা গুপ্তধন খুঁজে লাভ নেই।
